দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর একের পর এক হামলা, নির্যাতন, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আমরা যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনই বিস্মিত। কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী হয়ে রংপুর- একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা ঘটেই চলেছে। আমাদের প্রশ্ন- জনপ্রতিনিধি, জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করছে? আমরা জানি, ঈদ বা দুর্গাপূজার মতো সার্বজনীন ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠানের আগে পুলিশ-প্রশাসনের বিশেষ প্রস্তুতি থাকে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও থাকে বিশেষ প্রতিবেদন।

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আগে কি এই চিরাচরিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে? কুমিল্লার অঘটনটিকে 'বিচ্ছিন্ন ঘটনা' এবং চাঁদপুরের অঘটনকে 'তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া' হিসেবে যদিও 'সন্দেহের সুবিধা' দেওয়া যায়; নোয়াখালী, ফেনী ও রংপুরে হামলার জবাব কী? গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই কি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এভাবে সংঘবদ্ধ সহিংসতা চলছে? স্বীকার করতে হবে, আক্রান্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ সব এলাকাতেই প্রশাসনের পক্ষে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই 'রোগী মরে যাওয়ার পর ডাক্তার এসেছে'। প্রত্যাশা ছিল, কুমিল্লায় সহিংসতার পরই দেশজুড়ে কড়া সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বস্তুত সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে হুঁশিয়ারি ও সতর্কতামূলক বক্তব্যও শোনা গেছে।

কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়নি। আমরা দেখতে চাইব, বিলম্বে হলেও ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতি ইঞ্চি এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। দেশের কোথাও আর একটি হামলার ঘটনাও যেন না ঘটে। পরিস্থিতির উত্তরণে এর বিকল্পও নেই। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয়তাও জরুরি। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কিংবা একপক্ষীয় হামলার সময় দল-মত নির্বিশেষে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে যেভাবে মাঠে নামতে দেখা গেছে, এবার তারও ঘাটতি স্পষ্ট। আমরা দেখতে চাইব, পারস্পরিক দোষারোপের বদলে রাজনৈতিক দলগুলো বিলম্বে হলেও মাঠে নেমেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, সামাজিক শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, গত কয়েক দিনের হামলায় এরই মধ্যে জাতীয় সংহতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মতো নৈরাজ্য প্রলম্বিত হলে এই ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়বে।

তবে মনে রাখতে হবে, বিষয়টি নিছক সংহতি ও ভাবমূর্তির নয়। এর সঙ্গে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন জড়িত। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল। সেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে যদি একজন নাগরিক কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আক্রান্ত হয়, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে? ধর্মীয়, নৃতাত্ত্বিক বা ভাষাগত- যে পরিচয়েই সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু হোক না কেন, এ দেশে একজন নাগরিকেরও আইনবহির্ভূত কারণে বিপন্ন বোধ করা চলবে না।

বিনা অপরাধে কারও স্থাপনায় গিয়ে হামলা, অগ্নিসংযোগ, এমনকি হত্যার মতো ঘটনার চেয়ে বিপন্ন পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? আমাদের মহান সংবিধানে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার, মর্যাদা, জীবন ও যাপনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। গুজব কিংবা কল্পিত অভিযোগে কেউই সংবিধানের এ নিশ্চয়তা নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে না। স্বস্তির বিষয়, আক্রান্ত প্রায় সব এলাকা থেকেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে। এখন তাদের ক্ষেত্রে আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সম্প্রদায়গত পরিচয় যাতে উপযুক্ত বিচারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রতি বাড়িয়ে দিতে হবে সহায়তার হাত। তারা যে মানসিক আঘাত পেয়েছেন, তার নিরাময় সহজ নয়। কিন্তু বৈষয়িক ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এই দুঃসময়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও আমরা নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই। তাদের এই অভয় দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের সবার- কিছু অশুভ শক্তির মোকাবিলায় শুভবোধসম্পন্ন শক্তিও কম নেই। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভ যেদিন প্রকাশ হবে, সেই মঙ্গলবার দেশব্যাপী 'সম্প্রীতি রক্ষা দিবস' পালনের ঘোষণা দিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন। আমরা তাদের সঙ্গে সংহতি জানাই।

মন্তব্য করুন