মাথাব্যথা সারাতে মাথা কেটে ফেলার ভাবনা যে অসার- তা ব্যাখ্যার দাবি রাখে না। দেশে দফায় দফায় জ্বালানির দাম বাড়িয়েও লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না। তাই লোকসান কমাতে আবারও তেল-গ্যাসের দাম বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার- মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। আমরা জানি, সম্প্রতি বিশ্ববাজারে জ্বালানির তেলের দাম বাড়লেও গত প্রায় এক দশক তা স্থিতিশীলই ছিল। এমনকি কখনও কখনও দাম হ্রাসের রেকর্ড সৃষ্টি হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হয়নি। এমতাবস্থায়ও দাম না কমিয়ে আগের দামই বহাল রাখায় এর মাশুল গুনতে হয়েছে ভোক্তাদের। করোনা দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে আসার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরি শুরু হলেও মানুষের জীবন-জীবিকায় যে টান পড়েছিল, তা এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। একদিকে নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী, অন্যদিকে লাখ লাখ মানুষের আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি কর্মহীন মানুষের ভিড়ও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে নিত্যপণ্য ও জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রাখতে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেখানে আরও বিশেষ উদ্যোগ জরুরি, সেখানে ফের জ্বালানির দাম বাড়ানোর চিন্তা 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' ছাড়া আর কী? জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা যে কোনো রাষ্ট্রেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম মূল অনুষঙ্গ। আমরা জানি, দেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর। প্রশ্ন হচ্ছে- যখন জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তখনই আমাদের অভ্যন্তরীণ মজুদ বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি কেন? বিগত এক দশকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও কয়লা খাতের উন্নয়নে দৃষ্টান্তযোগ্য উন্নয়ন ঘটেনি- এ অভিযোগ নতুন নয়। তেল-গ্যাসের দাম বাড়ালে বিদ্যুতের দামও বাড়বে। আমরা জানি, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যাপারে অনেক বিশেষজ্ঞের আপত্তি সত্ত্বেও এসব কেন্দ্র থেকে অতি উচ্চ দামে বিদ্যুৎ কিনে লোকসানি মূল্যে সরবরাহ করার কারণে সরকারের অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক খনিজসম্পদ তথা তেল-গ্যাস উত্তোলনসহ নানামুখী সম্ভাবনা দেখা দিলেও তা আজও কাজে লাগানো যায়নি। আমরা এও জানি, প্রায় সাত বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমাতে ও দেশীয় গ্যাস কোম্পানির সক্ষমতা বাড়াতে কয়েকটি 'অয়েল কম্প্রেসর' স্থাপনের নির্দেশ দিলেও তা রয়ে গেছে অবাস্তবায়িত। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো ও বাজার তদারকির ওপর জোর দেওয়ার কথা বারবার বলা হলেও কার্যত এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। বরং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি আমদানির প্রতি আগ্রহ বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অভিযোগ আছে, এ ক্ষেত্রে করপোরেট মুনাফাবাজসহ সংশ্নিষ্ট অসাধুদের কারসাজি রয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বিষয়ে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিদ্যুতের অপচয় কমাতে ওই কমিটি প্রিপেইড মিটার প্রতিস্থাপন কার্যক্রম জোরদারের যে সুপারিশ করেছে, এর সঙ্গে আমরা সহমত পোষণ করি। সরকার জ্বালানি খাতে যে বিপুল অঙ্কের অর্থ ভর্তুকি দিচ্ছে, সেটাকে অদূরদর্শিতা বলে অনেক বিশেষজ্ঞ যে অভিমত দিচ্ছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। তারা মনে করেন, তেল-গ্যাসের মূল্যের বড় অংশ যায় ট্যাক্স-ভ্যাটে। সরকার তাতে ছাড় দিলেই সংস্থাগুলোর লোকসান কমবে। আমরা মনে করি, বিশেষজ্ঞদের অভিমত আমলে নেওয়া দরকার। জানা গেছে, বিপিসি গত কয়েক বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার ওপর লাভ করেছে, যার পুরোটাই গেছে সরকারি কোষাগারে। যদি তাই হয়, তাহলে আমদানি ব্যয়ের চাপ সরকার তা দিয়েই তো সামাল দিতে পারে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যাপারেও সরকারকে ভাবতে হবে। জোর দিতে হবে দেশীয় গ্যাস-কয়লা উৎপাদন-উত্তোলনেও। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের গতি ত্বরিত করাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পার্শ্ববর্তী দেশে তেল পাচারের আশঙ্কায় এর দাম বাড়ানো কোনো সমাধান নয়। বরং তা সাধারণ ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। পাচার ঠেকাতে ব্যবস্থা কঠোর না করে দাম বাড়ানোর চিন্তা গোড়া কেটে আগায় জল ঢালার শামিল। অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ঠেকাতে হবে। দূরদর্শিতার প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রাধান্য দিতে হবে ভোক্তার স্বার্থ।

মন্তব্য করুন