চট্টগ্রামে এম এ মান্নান উড়াল সেতুতে ফাটল ধরা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। সোমবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে ফ্লাইওভারের একটি র‌্যাম্পে ফাটলের চিত্র স্পষ্ট হলেও বুধবার পরিদর্শন শেষে ফাটল পাননি নকশা প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা। তারা যে মত দিয়েছেন, তাতে আশ্বস্ত না হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বুধবার সমকালের প্রতিবেদনে প্রকাশ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং প্রধান প্রকৌশলী পরিদর্শনে গিয়ে বলেছেন, নির্মাণ ত্রুটির কারণেই ফ্লাইওভারে ফাটল ধরেছে। যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি র‌্যাম্পটির নকশা প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা প্রাথমিকভাবে ফাটল পাননি বললেও ভারী যান চলাচল করতে নিষেধ করেছেন। তারা এও বলেছেন, যেহেতু একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, তাই আরও গভীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। এরপর পর্যবেক্ষণসহ প্রতিবেদন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হবে। প্রশ্ন হলো, ফাটল যদি নাই থাকে, তাহলে কেন আবার তদন্ত করতে হবে।

আমরা জানি না, এটা শাক দিয়ে মাছ ঢাকা কিনা। আমাদের মনে আছে, নির্মাণকাজ শেষে চার বছর আগে এই র‌্যাম্প যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং এই উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ চলাকালে ২০১২ সালে গার্ডার ধসে ১৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। এরপর নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পেলেও র‌্যাম্প নির্মাণের কাজ করেছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ তথা সিডিএ। আমরা দেখেছি, সিডিএ এই ঘটনার প্রথম থেকেই দাবি করেছে, এটি ফাটল নয়; পিলারের জোড়া। কীভাবে তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই শুরু থেকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে? তাহলে সিডিএর বক্তব্য ধরেই কি নকশা প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান এ বক্তব্য দিয়েছে? তারা যেভাবে বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাটলের মতোন যেসব ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, তা মূলত জোড়া; যেখান থেকে ফোম বের হয়ে গেছে।

আমরা মনে করি, তাদের বক্তব্য ধরে তদন্তে অবহেলা করা উচিত হবে না; বরং বিষয়টি হালকাভাবে না নিয়ে তৃতীয় পক্ষীয় কোনো বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরীক্ষা করানো উচিত। বিস্ময়কর হলেও সত্য, চট্টগ্রামে ফাটলের এ ঘটনায়ও আমরা সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে পরস্পর বিপরীত মন্তব্য দেখছি। জলাবদ্ধতাসহ নানা নাগরিক দুর্ভোগের শহর এখন দেশের প্রধানতম বাণিজ্যিক শহর চট্টগ্রাম। এ মাসের শুরুতেই আমরা সেখানকার মরণফাঁদ উন্মুক্ত খাল ও নালা নিয়ে এ সম্পাদকীয় স্তম্ভে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। সেখানে নালা-নর্দমায় পড়ে একের পর এক হতাহতের ঘটনায়ও দুই কর্তৃপক্ষ পরস্পরকে দোষারোপ করেছে।

এমনকি গত মাসে সমকালের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, চট্টগ্রামের দুঃখ জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া জনগুরুত্বপূর্ণ চারটি প্রকল্পেই যে ত্রুটি দেখা দেয়, সেটাও মহানগরীর বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ, যেমন- চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অন্যতম কারণ। একটি নগরীর কর্তৃপক্ষের মধ্যে যদি কোনো ধরনের সমন্বয় না থাকে, উপরন্তু তারা যদি পরস্পরকে দোষারোপে ব্যস্ত থাকেন, তবে নাগরিক দুর্ভোগ বাড়বে বৈ কমবে না। চট্টগ্রামে এম এ মান্নান ফ্লাইওভারে ফাটলের বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যস্ত ফ্লাইওভার দিয়ে প্রতিনিয়ত উল্লেখযোগ্য যানবাহন চলাচল করে। মানুষ যেন কোনোভাবেই কর্তৃপক্ষের দ্বন্দ্বের বলি না হয়। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, ফ্লাইওভারটিতে র‌্যাম্প তার নকশা অনুযায়ী তৈরি হয়নি। শুরুতে র‌্যাম্প না থাকলেও পরে ফ্লাইওভারটি কার্যকর করতে নির্মাণের চার বছর পর তা যুক্ত করা হলেও ভারী যানবাহন চলাচলের সুযোগ রাখা হয়নি। এমনকি র‌্যাম্পের প্রবেশমুখে ভারী যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা দেওয়া হলেও কে বা কারা তা খুলে দেয়ে। সেখানে ভারী যানবাহন চলা মানে এটাও স্পষ্ট, গলদটা আসলে গোড়াতেই হয়েছে। সহন ক্ষমতার অতিরিক্ত যানবাহন চললে সেখানে ফাটল ধরবে- এটাই স্বাভাবিক। এত দিন কীভাবে ওই র‌্যাম্প দিয়ে ভারী যান চলাচল করেছে! চট্টগ্রামে এত কর্তৃপক্ষ থাকতে কারও নজরেই বিষয়টি আসেনি কেন?

মন্তব্য করুন