মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের কানিহাটি গ্রামের দুই বিঘা জমিতে ধান গবেষণায় যে ফল পাওয়া গেছে, তা গোটা বিশ্বের জন্যই বিস্ময়কর। সাধারণত এক ফসলি উদ্ভিদ ধানগাছে 'কুশি পদ্ধতি' ব্যবহার করে দুই ফসল তোলার নজিরও আমরা দেখেছি। কিন্তু একবার রোপণ করে সেখানে একবার বোরো এবং দুইবার করে আউশ ও আমন ধান পাকানোর উদাহরণ আক্ষরিক অর্থেই অভূতপূর্ব। শনিবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনের এই ভাষ্য কৃষি গবেষণায় নিঃসন্দেহে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

এ গবেষণার মূল ব্যক্তি জিনবিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরীকে আমরা অভিনন্দন জানাই। পাঁচবার শুধু নয়, এই গবেষণায় ছয়বার ধান তোলার যে প্রত্যয় তিনি ব্যক্ত করেছেন, তাও যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের গবেষণা, সংকরায়ণ ও জিনপ্রযুক্তিগত উন্নয়ন বিশ্বজুড়েই কীভাবে বহুজাতিক ও বাণিজ্যিক কোম্পানির কবজায় চলে গেছে, আমরা জানি।

সেখানে বাংলাদেশি জিনবিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী তার উদ্ভাবন সাধারণ কৃষকের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার যে অঙ্গীকার সমকালের কাছে ব্যক্ত করেছেন, তাও আমাদের গর্বিত করে। অস্বীকার করা যাবে না, এই ধানের ক্ষেত্রে প্রথমে যত ফলন হয়েছে, পরের চারবার তার চেয়ে খানিকটা কম। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রশ্নও সমকালে প্রকাশিত আলোচ্য প্রতিবেদনে এসেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, একবার রোপণ করেই যেহেতু পাঁচবার ধান কাটা যাচ্ছে- এর উৎপাদন খরচও অনেক কম। আর পাঁচবারের ফলন মিলিয়েও এক ফসলি ধানগাছের তুলনায় এর উৎপাদন প্রায় পাঁচ গুণ। বিষয়টি নিছক উৎপাদন খরচ ও কৃষকের পরিশ্রম সাশ্রয়েরও নয়। ধানটির গবেষক এর পরিবেশগত যে দিক তুলে ধরেছেন, তা আরও গুরুত্বপূর্ণ।

সমকালকে তিনি যথার্থই বলেছেন- একটি জমি যতবার চাষ দেওয়া হয়, ততবার মিথেন গ্যাস ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। ফলে একবার চাষ দিয়ে একাধিকবার ফসল উৎপাদনকারী এই ধানগাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে। বিশেষত বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে জোর দিচ্ছে, তখন এই ধান বাংলাদেশসহ সব দেশকে পথ দেখাতে পারে। আমরা এখন দেখতে চাইব, ধানটি গবেষণা পর্যায় থেকে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারিত হবে। সে ক্ষেত্রে কৃষিবিষয়ক সরকারি সংস্থাগুলোর এগিয়ে আসার বিকল্প নেই। এই ধান কৃষকের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে পারে কৃষি ও পরিবেশ বিষয়ে তৎপর বেসরকারি সংস্থাগুলোও। একই সঙ্গে জিনবিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি ও সম্মাননা প্রদানের দাবিও অসংগত হতে পারে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন তার গবেষণা সাদরে গ্রহণ করছে, তখন তার স্বদেশ পিছিয়ে থাকবে কেন?

আমাদের মনে আছে, এক দশক আগেও তিনি বাংলাদেশের ধানসম্পদের মেধাস্বত্ব রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সিলেট অঞ্চলেরই সুপরিচিত 'কাঁচালতা' ধান যখন বহুজাতিক বাণিজ্য ও সংকরায়ণের ফেরে পড়ে 'কাসালাথ' নাম ধারণ করে কোনো এক 'ভারতীয় বুনো ধান' হিসেবে পরিচিত হতে যাচ্ছিল, তিনি তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিহত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ইরি (ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট) ধানটির উৎস দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এক ধানগাছে পাঁচবার ফলনের নজির স্থাপন করে এই গবেষক ও বিজ্ঞানী দেশপ্রেম ও দায়িত্বশীলতার নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করলেন। একই সঙ্গে ধানবৈচিত্র্যে বাংলাদেশের হূতগৌরব ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই আমরা।

অস্বীকার করা যাবে না, অতীতের প্রজাতিগুলোর কোনো কোনোটির উৎপাদন বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মেটানোর উপযোগী নয়। কিন্তু কিছু ধান রয়েছে যেগুলো সংকরায়িত বিদেশি প্রজাতির সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দিতে সক্ষম। সেগুলো মাঠ পর্যায়ে গবেষণা ও সম্প্রসারণে নজর দেওয়া হোক। ভুলে যাওয়া চলবে না, দেশীয় পর্যায়ে এ ধরনের ধান গবেষণা ও সম্প্রসারণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তার প্রশ্নটিও জড়িত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শর্ত মেনে গোটা বিশ্বই যখন নিজেদের মেধা ও প্রাকৃতিক সম্পদ পেটেন্টে জোর দিয়েছে, তখন আমাদেরও দৃষ্টি ফেরাতে হবে দেশের দিকে।

মন্তব্য করুন