প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন যেখানে জরুরি, সেখানে বৈষম্য বাড়ার চিত্র অনাকাঙ্ক্ষিত। বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগকৃত সরকারের ২৬টি ক্যাডারের সবাই একই পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রবেশ করলেও ধীরে ধীরে ক্যাডারভেদে বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে। রোববার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকাশ, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত থাকলেও অন্যান্য ক্যাডার এ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রশাসন ক্যাডারের পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা সুদমুক্ত গাড়ির ঋণ সুবিধাসহ প্রতি মাসে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ পেলেও অন্যদের এ সুযোগ নেই।

শুধু তাই নয়, আমরা দেখছি পদোন্নতির ক্ষেত্রেও এ বৈষম্য প্রকট। বিষয়টি নিয়ে বিসিএস কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশাও স্পষ্ট। সমকালের প্রতিবেদনমতে, সম্প্রতি প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিৎসক সংগঠনের নেতারা জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে লিখিতভাবে তাদের দাবি তুলে ধরেন। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কর্মকর্তারা আন্দোলনেও নেমেছেন। বস্তুত অনেক বছর ধরেই বঞ্চিতদের এ আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। আমাদের মনে আছে, ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসনের উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের মতো সব ক্যাডারে সুপারনিউমারারি পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে নির্দেশনা দেন। এমনকি ২০১৭ সালেও সচিব সভায় আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করে সবার জন্য ন্যায়সংগত পদোন্নতি ও পদায়ন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এর পর কোনো অগ্রগতি আমরা দেখিনি। প্রশ্ন হচ্ছে- আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বলাবাহুল্য, এটি জাতীয় সংসদে অনুমোদিত সার্ভিস অ্যাক্ট ১৯৭৫-এরও লঙ্ঘন। এমন বৈষম্য চলতে থাকলে অন্য ক্যাডার কর্মকর্তারা কাজের গতি হারিয়ে ফেলবেন। এটা স্পষ্ট, সরকারি চাকরিতে আগের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা অনেক বেড়েছে। পদোন্নতি ব্যবস্থা ও সুযোগ-সুবিধা অধিকতর হওয়ার কারণেই মেধাবীরা সরকারি চাকরির মধ্যে ক্যাডার সার্ভিসের চাকরিতে আগের চেয়ে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন।

আমরা বিশ্বাস করি, বৈষম্য দূর হলে প্রশাসনে যেমন গতি আসবে, তেমনি মানুষও যথাযথ সেবা পাবে। প্রশাসনের প্রতি যে ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতেও আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন হওয়া চাই। বৈষম্যের কারণে ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তারা আন্দোলনে নামলে একদিকে যেমন তা প্রার্থীদের খারাপ বার্তা দেবে, তেমনি সরকারি কাজেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই- পদোন্নতি এবং সুযোগ-সুবিধা প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তারা বেশি ভোগ করছেন। সে তুলনায় শিক্ষা ক্যাডার সবচেয়ে পিছিয়ে। এখানে সর্বোচ্চ পদোন্নতি পদ চতুর্থ গ্রেড হওয়ায় অনেকে সহযোগী অধ্যাপক থেকেই অবসরে চলে যান। সরকারি প্রকৌশলী, কৃষিবিদ ও চিকিৎসকদের পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। বিশেষত ক্যাডার সার্ভিসের মধ্যে সাধারণ ও কারিগরি বা পেশাগত ক্যাডারের মধ্যে তুলনামূলক সাধারণ ক্যাডারের কর্মকর্তারা বেশি সুবিধা ভোগ করেন। স্বাভাবিকভাবেই এতে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে ক্যাডারের ভিন্নতার কারণে এ বৈষম্যের অবসান হওয়া জরুরি।

আমরা দেখছি, আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের ফলে নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরাও টেকনিক্যাল ক্যাডার বাদ দিয়ে জেনারেল ক্যাডারে যাচ্ছেন। এ অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। আমরা মনে করি, বৈষম্য নিরসনে একদিকে যেমন সরকারি সিদ্ধান্ত জরুরি, অন্যদিকে কোন কোন ক্ষেত্রে কোন ক্যাডার পিছিয়ে, তারও বিস্তারিত খতিয়ে দেখা জরুরি। সব ক্যাডারের মধ্যে পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে আন্তঃক্যাডার সমন্বয়ের বিকল্প নেই। এ সংক্রান্ত উদ্যোগ যেন আমলাতান্ত্রিক বেড়াজালে আটকে না যায়, সেটিও নিশ্চিত করা চাই।

মন্তব্য করুন