চট্টগ্রামের নাগিন পাহাড় কেটে সেখানে যেভাবে হাউজিং ও নানা ধরনের স্থাপনা গড়ে উঠেছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন হলেও বিস্মিত নই। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে নির্বিচারে পাহাড় কাটার ঘটনা ঘটছে। শুক্রবার সমকালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের পূর্ব নাসিরাবাদের নাগিন পাহাড় এখন ৩৪ ওঝার কবলে। সেখানে দখল পাকাপোক্ত করতে চারদিকে ঘেরা দিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরাও বসিয়েছে দখলদাররা। সেখানে রয়েছে প্রভাবশালীদের নামও। অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রামের উল্লেখযোগ্য পাহাড়ই জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ অনেকেই পাহাড় দখল করে বসতি গড়ছেন। এমনকি তারা পাহাড়ের দখলস্বত্ব বিক্রিও করছেন! পরিবেশ অধিদপ্তর জরিমানা করছে বটে, কিন্তু তাতে বন্ধ হচ্ছে না পাহাড় কাটা। জরিমানা দিয়ে অনেকে পুনরায় পাহাড় কাটছেন- এমন দৃষ্টান্তও রয়েছে। যেন জরিমানা দেওয়া মানে পাহাড় কাটার বৈধতা পাওয়া। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, নাগিন পাহাড় কাটতেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক প্রভাবশালীরাই। তারাই সেখানে হাউজিং ব্যবসা খুলেছেন। একাধিক ভবনের মালিক সমকালের প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, পাহাড় কাটায় সাধারণ ভবন মালিকদের সম্পৃক্ততা নেই। প্রভাবশালীরাই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা সম্প্রসারণ এবং প্লট বেচাকেনা করছেন। চট্টগ্রামের নাগিন পাহাড় কাটার সত্যতা পেয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরও। সম্প্রতি নাগিন পাহাড়ের দখলদারদের ডাকাও হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এত পরে এসে কেন বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরে পড়ল? কেবল পরিবেশ অধিদপ্তরই নয়, স্থানীয় প্রশাসনের দায়ও কম নয়। তাছাড়া দাবি অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর যদি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে থাকে, তবে পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না কেন? আমরা জানি, পাহাড় প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। পাহাড়ই মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের যেমন খাদ্য ও খনিজসম্পদের আধার, তেমনি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড়ের বিকল্প নেই। পাহাড় ধ্বংস হওয়ার ফলে কীভাবে পাহাড়ধস দুর্যোগ আকারে হাজির হয়, তা আমরা দেখেছি। এ দুর্যোগে প্রাণ ও সম্পদহানি ঘটে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক দশকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধসে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আমাদের পাহাড়ের অধিকাংশ অংশই মানুষের লোভের বলি হয়েছে। অথচ পৃথিবীর অনেক দেশে উঁচু উঁচু পাহাড় অক্ষত রেখে ঢালু জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে অনিন্দ্যসুন্দর জনপদ। নির্বিচারে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন এবং বনজঙ্গল ও গাছপালা উজাড় করার কারণেই চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঘন ঘন দুর্যোগ আমরা দেখছি। কিছু মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডের দরুন প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। পাহাড় কাটার ফলে চট্টগ্রাম একদিকে যেমন এর সৌন্দর্য হারাচ্ছে, অন্যদিকে জলাবদ্ধতার সমস্যাও কাটছে না। সেখানে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালিতে নগরীর নালা-নর্দমা ভরাট হওয়ায় জলাবদ্ধতার সংকট তৈরি হচ্ছে। অথচ জলাবদ্ধতার জন্য সেখানে প্রতি বছরই বরাদ্দ হয়। নানা প্রকল্প নিয়েও এ সংকট থেকে বাণিজ্যিক নগরীর উত্তরণ ঘটছে না। ২০০৭ সালের চট্টগ্রামে মর্মান্তিক পাহাড়ধসের ঘটনা আমাদের মনে আছে। ওই দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি পাহাড়ধসের কারণ নির্ণয় করে ৩৬ দফা সুপারিশ প্রণয়ন করলেও সেগুলো বাস্তবায়ন আমরা দেখছি না। চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা রোধে শক্তিশালী পদক্ষেপ জরুরি। একদিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অন্যদিকে প্রশাসনকেও কঠোর হতে হবে। কোনো জরিমানা করে নয়, বরং পাহাড় কাটার সঙ্গে যারাই জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। চট্টগ্রামের নাগিন পাহাড় কাটায় জড়িত ৩৪ জনের পরিচিতি যেমন সমকালে এসেছে, প্রশাসনও তাদের ব্যাপারে বেখবর নয়। আমরা প্রত্যাশা করি, প্রশাসন তাদের ব্যাপারে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। প্রশাসন যদি নাগিন পাহাড়খেকোদের আইন অনুযায়ী যথাযথ শাস্তির মুখোমুখি করে তা অন্যদের জন্যও অনুকরণীয় হবে। বস্তুত কঠোর হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

মন্তব্য করুন