করোনার নতুন ধরন বিশ্বকে শঙ্কিত করে তুলেছে। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফ্রিকায় করোনার নতুন ধরন 'ওমিক্রন' শনাক্তের পর দেশে এসেছেন ২৮ জন। ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত চার দিনে তারা দেশে আসেন। এ ছাড়া এক মাসে বিভিন্ন সময়ে আরও ২১২ জন প্রবাসী দেশে এসেছেন। আমরা জানি, ২৪ নভেম্বর আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানায় প্রথম 'ওমিক্রন' রোগী শনাক্ত হয়। সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ সৌদি আরবে শনাক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে ২২ দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই নতুন ধরনের ভাইরাস। যেসব দেশে 'ওমিক্রন'-এর সন্ধান মিলেছে, এর প্রায় প্রতিটি দেশেই কমবেশি বাংলাদেশি রয়েছেন।

আমরা জানি, প্রথম দফায় ইতালি প্রত্যাগতদের পর্যবেক্ষণ ও নিয়মকানুনের মধ্যে না রাখতে পারা ও তাদের লুকিয়ে এক স্থান থেকে অন্যত্র যাওয়ার কারণে করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিস্তার ঘটেছিল। তখন বিমানবন্দরসহ অন্যান্য প্রবেশপথে ব্যবস্থাপনাগত নানা ত্রুটি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। সমন্বয়হীনতা ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির মাশুল ইতোপূর্বে দেশের মানুষকে দিতে হয়েছে। আমাদের তিক্ত ও ভীতিকর অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও দায়িত্বশীল মহলের নিজ নিজ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠার অভাব ঝুঁকির ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তবে বুধবার স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বিদেশ থেকে সদ্য প্রত্যাগতদের মধ্যে শতাধিক ব্যক্তির সন্ধান মেলার খবরও সমকালের ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাদের বাসাবাড়িতে লাল পতাকা টাঙানোর পাশাপাশি 'হোম কোয়ারেন্টাইন' করা হয়েছে।

আমরা মনে করি, যত দ্রুত সম্ভব সদ্য আসা সব প্রবাসীকে খুঁজে বের করার পাশাপাশি তাদের সংস্পর্শে যাওয়া ব্যক্তিদেরও অনুসন্ধানক্রমে পরীক্ষার আওতায় আনার বিকল্প নেই। পাশাপাশি কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো জরুরি। তা না হলে তাদের মধ্যে কেউ সংক্রমিত হলে এর মাধ্যমে নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। আফ্রিকাফেরতদের বিষয়ে আগেই কড়াকড়ির বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। আমরা জানি, যে কোনো সংক্রামক ব্যাধির প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। গত প্রায় ২০ মাসে করোনা-দুর্যোগের মধ্য দিয়ে আমাদের অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই সচেতনতা-সতর্কতায় ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। আমরা চাইব এর যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে। এ ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিক সব ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিকেও তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন-সতর্ক থাকা। নিজে সুরক্ষিত না থাকলে অন্যও থাকবে অরক্ষিত।

আমরা দেখছি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে টিকা বৈষম্য এখনও জিইয়ে আছে। যেসব দেশে বেশিরভাগ মানুষ টিকা পেয়েছে এমন দেশে এই নতুন ধরন সৃষ্টি হয়নি। বস্তুত সেসব দেশ থেকে নতুন ধরন ছড়িয়েছে, যারা টিকা বৈষম্যের শিকার। তা ছাড়া এই নতুন ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা টিকা গ্রহীতাদের মধ্যে কার্যকর নাও হতে পারে। এমতাবস্থায় প্রাথমিক রক্ষাকবচ স্বাস্থ্যবিধির যথাযথ অনুসরণ ও সামাজিকভাবে কোনো ক্ষেত্রেই যাতে প্রতিরোধী নিয়মগুলোর ব্যত্যয় না ঘটে তা নিশ্চিত করা। আমাদের ফিরে যেতে হবে পুরোনো অভ্যাসে। একই সঙ্গে পরীক্ষাসহ চিকিৎসা ব্যবস্থার সব অসংগতি-ঘাটতি দূর করা দরকার। পাশাপাশি দেশের বাইরে থেকে প্রবেশপথে নজরদারি কঠোর করা।

আমরা দেখেছি, ভারতে যখন ডেলটা ধরন বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছিল, তখন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা যথাযথভাবে করতে সক্ষম হওয়ায় দেশে ধরনটি আছড়ে পড়েনি। একই সঙ্গে নজর রাখতে হবে বিশ্বের অন্য দেশগুলো নতুন প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী কৌশল অবলম্বন করছে। পরীক্ষা ও চিকিৎসা সহজলভ্য ও স্বচ্ছ করাও জরুরি। করোনার গত ঢেউগুলোতে স্বাস্থ্য বিভাগের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি-গাফিলতির পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়েও এ দুর্যোগকে পুঁজি করে অসাধুদের নানা অপতৎপরতা অকল্যাণের ছায়া বিস্তৃত করেছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, 'ওমিক্রন' এতটাই শক্তিশালী; টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকেও ডেলটা ধরনের চেয়ে বেশি হারে আক্রমণ করতে পারে। তাই সর্বাবস্থায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা সর্বাগ্রে জোরদার করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

মন্তব্য করুন