রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার প্রায় সর্বব্যাপ্ত হওয়ার আগে আমাদের দেশে যে জৈবসারভিত্তিক চাষাবাদ ব্যবস্থা ছিল; সেখানে মিশ্র ফসল পদ্ধতিতে জোর দেওয়া হতো। এতে একদিকে যেমন বালাই দমন সহজ হতো, তেমনই বাড়ত ফলন। ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপিসহ বিভিন্ন রাসায়নিক সারের কৃত্রিম সংকট নিয়ে শনিবার সমকালে যে শীর্ষ প্রতিবেদন ও বিশেষ আয়োজন প্রকাশ হয়েছে, তার ভাষ্য আমাদের যেন সেই 'মিশ্র চাষাবাদ' পদ্ধতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। ফসলে মিশ্র চাষাবাদ যদিও ইতিবাচক; সার বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনিয়মের মিশ্র চাষ নেতির ফলনই বাড়িয়ে তুলছে।

প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে- কর্তৃপক্ষ যদিও সারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার কথা বলছে, বাস্তবে কৃষক যথাসময় ও যথামূল্যে তা পাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে 'ত্রিমাত্রিক' অনিয়ম। এর শুরুতে রয়েছে সার আমদানির অব্যবস্থাপনা। প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, দেশে রাসায়নিক সারের বার্ষিক চাহিদা কমবেশি ২৪ লাখ টনের দুই-তৃতীয়াংশ তথা ১৬ লাখ টনই আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে কাগজে-কলমে অনেক আমদানিকারক থাকলেও কার্যত হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানি করে থাকে।

ফলে সার আমদানিতে বহুপক্ষীয় যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল, তা পূরণ হয়নি। বরং আমদানি সারের বাজার ওই কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই নিয়ন্ত্রণ করছে। সারের সরবরাহ যেহেতু বহুলাংশে আমদানিনির্ভর; এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বাজারে। ওদিকে যে এক-তৃতীয়াংশ সার দেশের কারখানায় উৎপাদিত হয়, তার পরিবহন ব্যবস্থা ঘিরেও গড়ে উঠেছে একটি চক্র।

সমকালের আলোচ্য প্রতিবেদনগুচ্ছে বলা হচ্ছে- সার পরিবহনে ইচ্ছাকৃত বিলম্বের মধ্য দিয়ে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। আর সারের মতো পণ্য যেহেতু সময়ঘন, এতে দাম বেড়ে যায়। আমরা আশঙ্কা করি, এর সঙ্গে সার আমদানিকারকদেরও যোগসূত্র থাকা বিচিত্র নয়। বাজারে সরকারি কারখানার সারের সরবরাহ ব্যবস্থায় বিলম্ব বা বিঘ্ন ঘটলে লাভ তো তাদেরই! পাশাপাশি কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি চক্র সরকারি গুদাম থেকেই সার 'হাওয়া' করে দেয় বলে যে অভিযোগ সমকালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। বস্তুত জামালপুরের সরিষাবাড়ী সার কারখানা থেকে ২০ হাজার টন ইউরিয়া সার 'গায়েব' হওয়ার তথ্য সম্প্রতি ধরা পড়েছে। এর জের ধরে গত বৃহস্পতিবার ওই সার কারখানার তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে।

মনে রাখতে হবে, এটি একটি সার কারখানার 'বিচ্ছিন্ন ঘটনা' নয়। এমন আরও অনিয়ম অধরা থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক হতে পারে না। সারাদেশেই সারের কালোবাজারি সচল রয়েছে। আমরা মনে করি, সারের কৃত্রিম সংকটের নেপথ্যের তিন চক্র নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে না। কিন্তু সে জন্য চাই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সদিচ্ছা ও সক্রিয়তা। বিভিন্ন সার কারখানা, গুদাম এবং মাঠ পর্যায়ে বিতরণ ও বিক্রয় স্তরে যেসব অনিয়ম উঠে এসেছে, সেগুলোকে আমলে নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ভুলে যাওয়া চলবে না- ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকারের আমলে সারের দাবিতে অন্তত ১৮জন কৃষক প্রাণ দিয়েছিল। বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে ওই দিনটিকে এখনও 'কৃষক' হত্যা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। তাদের শাসনামলে সার সংকট কাম্য হতে পারে না। এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে নতুন নয়। কিন্তু সারের মতো 'স্পর্শকাতার' পণ্যের ক্ষেত্রে তার পুনরাবৃত্তি হবে আত্মঘাতীর নামান্তর।

আমরা স্বীকার করি, কৃষিমন্ত্রীসহ সার ব্যবস্থাপনার নীতিনির্ধারকরা সারের মজুদ ঠিক রাখার ক্ষেত্রে আন্তরিক। কিন্তু সমকালের এ প্রতিবেদনগুচ্ছ প্রমাণ করে- কেবল মজুদের দিকে নজর রেখে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার অবকাশ নেই। আমরা জানি, রাসায়নিক সারের সবচেয়ে বেশি চাহিদা দেখা দেয় বোরো মৌসুমে। রবি মৌসুমে দেশজুড়েই সারের 'হাহাকার' বিবেচনায় নিয়ে সক্রিয় হলে আসন্ন বোরো মৌসুমে সংকট এড়ানো সহজ হবে। দেশে ক্রমবর্ধমান রাসায়নিক সারের ব্যবহার উর্বরতার কী ক্ষতি করছে কিংবা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও এ খাতের দুই-তৃতীয়াংশ আমদানিনির্ভর থাকবে কিনা, তা ভিন্ন আলোচনার বিষয়। স্বল্পমেয়াদে সৃষ্ট সারের কৃত্রিম সংকট সামাল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবতেই হবে।

মন্তব্য করুন