আবাসিকের উল্লেখযোগ্য এলাকা ও শিল্পকারখানাসহ প্রায় সব খাতে গ্যাস সংকটের যে চিত্র বুধবার সমকালের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা নতুন নয়। বস্তুত চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় কয়েক মাস ধরেই বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের জন্য 'হাহাকার' দেখছি আমরা। বিশেষ করে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের অনেক এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস না থাকায় বিকল্প হিসেবে মানুষ সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন, আবার কেউ রাত জেগে পরদিনের রান্না সারছেন। সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাস রেশনিং করার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া হতাশাজনক। আমরা দেখছি, কেবল আবাসিকেই নয় বরং শিল্পকারখানায়ও গ্যাসের প্রভাব পড়েছে ব্যাপকভাবে। গ্যাস সংকটে বিদ্যুতের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এর আগে আমরা শিল্পোৎপাদন সচল রাখার স্বার্থে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছিলাম। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হয়ে বরং কোথাও কোথাও অবনতি ঘটেছে।

আমরা দেখছি, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে গ্যাস সংকটের অন্যতম কারণ জুন মাস থেকে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি কম হওয়া এবং একই সঙ্গে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া। জ্বালানি বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় সরাসরি এলএনজি কেনা বন্ধ রয়েছে। প্রশ্ন হলো, গ্যাসের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এলএনজি কম আমদানি করার যৌক্তিকতা কী? এটা সমস্যার কোনো সমাধান হতে পারে না। বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বাড়লে বা কমলে দেশেও গ্যাসের দামে প্রয়োজনে তারতম্য ঘটবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত করা যাবে না। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এলএনজিকে গ্যাসে পরিণত করার টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটির প্রভাবও পড়ছে সরবরাহে। এ ত্রুটি মেরামতে বিলম্ব প্রত্যাশিত নয়।

বলাবাহুল্য, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে বলে সামনে এলএনজির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। তাই এলএনজি কেনার ক্ষেত্রেও সরকারের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি দেশে গ্যাসের উৎপাদন যেহেতু কমছে, দীর্ঘমেয়াদে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। সম্প্রতি সাগরের গভীরে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস হাইড্রেট পাওয়ার খবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে আমরা জানি। কিন্তু প্রযুক্তিজনিত কারণে ওই গ্যাস আমাদের এখনই উপকারে আসবে না বলে বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন। তবে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান না করলে অদূরভবিষ্যতে দেশ গ্যাস সংকটে পড়তে পারে, আমদানি করেও সে সংকটের সমাধান সম্ভব হবে না।

গৃহস্থালি রান্নার কাজ হতে শুরু করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহনে গ্যাসের ওপর আমাদের নির্ভরতা যেভাবে বাড়ছে, সে চাহিদা মেটাতে গ্যাসের মজুদ কিংবা উৎপাদন কোনোটাই যথেষ্ট নয়। এ অবস্থায় সব ক্ষেত্রেই বিকল্প খোঁজা জরুরি। গৃহস্থালি কাজে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি এখন অনেকেই বাসাবাড়িতে ব্যবহার করেন। অথচ এলপিজির দাম নির্ধারণে এক ধরনের নৈরাজ্য আমরা দেখেছি। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি অর্থ দিয়ে ভোক্তার এলপিজি কেনার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এলপিজির দাম কিছুটা হলেও কমানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি সাধুবাদযোগ্য। গ্রাহক পর্যায়ে তার সুফল নিশ্চিত করা চাই।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের চলমান সংকট আরও মাসখানেক থাকতে পারে। আমরা মনে করি, যত দ্রুত সম্ভব গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এলএনজি আমদানি ও টার্মিনাল সংস্কারসহ স্বল্পমেয়াদি সব পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে এ সংকটের সমাধানেও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে গ্যাস ব্যবহারে গ্রাহক পর্যায়ে সচেতনতাও প্রয়োজন। বাসাবাড়িতে গ্যাস ব্যবহারে অপচয়ের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। মনে রাখতে হবে, গ্যাস প্রাকৃতিক সম্পদ এবং এটা অসীম নয়। প্রত্যেকে গ্যাস ব্যবহারে দায়িত্বশীল হলে সংকট কিছুটা হলেও কাটবে। একই সঙ্গে গ্যাস ব্যবস্থাপনায় যে অনিয়ম রয়েছে, সেখানেও দৃষ্টি দেওয়া চাই। গ্যাসের সঙ্গে সংশ্নিষ্টদেরও অব্যবস্থাপনা দূর করে গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহারে দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন