সন্ত্রাসের জনপদে প্রধানমন্ত্রী

সহিংসতা দমন করতেই হবে

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০১৪

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার সাতক্ষীরা সদরে বিশাল জনসভায় অপশক্তি রুখে দাঁড়ানোর জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গত প্রায় এক বছর ধরে সীমান্তবর্তী এ জেলাটি সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত হয়েছে। শহর-গ্রাম সর্বত্র জনগণ ভীত-সন্ত্রস্ত। ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির সবকিছুকে নির্বিচারে টার্গেট করা হয়েছে। প্রকাশ্যে খুন করা হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক নেতা এবং এমনকি নিরীহ জনগণকে। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নৃশংসতার শিকার ভুক্তভোগীদের অনেকেই মনে করছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার ভণ্ডুল নিয়ে তারা ১৯৭১ সালের মতোই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন ও পুলিশ-র‌্যাবের মতো নিয়মিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কার্যকরভাবে মোকাবেলায় ব্যর্থ হওয়ায় যৌথ বাহিনী গঠন করে সেখানে অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে কিছু সফলতাও এসেছে। এমন প্রেক্ষাপটেই সেখানে প্রধানমন্ত্রীর সফর অনুষ্ঠিত হতো। তিনি ওই এলাকায় জঙ্গি নির্মূল ও আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে যতদিন প্রয়োজন যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালনার কথা বলেছেন। যৌথ বাহিনী নিরীহ কাউকে হয়রানি-ভোগান্তিতে ফেলুক, এটা কাম্য নয়। রাজনৈতিক কারণেও কেউ গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার যেন না হয়, সেটা নিশ্চিত করা চাই। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের নামে সাতক্ষীরা, গাইবান্ধা ও সীতাকুণ্ড, দিনাজপুর, নীলফামারী ও মেহেরপুরসহ কতিপয় এলাকায় গত কয়েক মাসে যে ধরনের নাশকতা পরিচালনা করা হয়েছে, সেটা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। অনেক স্থানে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া হয়েছে এবং সংখ্যালঘুদের বিপুলসংখ্যক ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে পরিকল্পিত হামলা পরিচালনা করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। সর্বাগ্রে এ দায়িত্ব ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। এ প্রশ্ন বিভিন্ন মহল থেকেই উঠছে যে, এ দলটির তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন বিস্তৃত থাকার পরও তারা বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার শিকার জনগণের পাশে সময়মতো দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি কোথাও কোথাও অভিযোগ, তাদের দলীয় অন্তর্কলহের সুযোগ নিয়েছে জঙ্গি অপশক্তি। আমরা আশা করব, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করবে এবং 'অপরাধী যেই হোক রেহাই নেই'_ এই মনোভাব দ্বারা পরিচালিত হবে। সরকারকে সাতক্ষীরাসহ প্রতিটি এলাকায় নাশকতা ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রতিটি লোকের অপরাধের বিচার করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে কোথাও কোথাও সংখ্যালঘুদের মধ্যে দেশত্যাগের শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে বলে শোনা যায়। এখন পর্যন্ত তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি বলেই আমরা মনে করি। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, জানমালের নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে যদি একটি পরিবারও দেশত্যাগ করে, সেটা হবে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্যের। লাখ লাখ মানুষের রক্তে অর্জিত এ দেশে সাম্প্রদায়িকতার স্থান হতে পারে না। বিএনপি নেতৃত্বকেও উপলব্ধি করতে হবে যে, আন্দোলনে জনগণকে যুক্ত করা না গেলে যত নাশকতাই পরিচালনা করা হোক না কেন, তা সফল হতে পারে না। তারা এটাও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, জঙ্গি অপশক্তির সঙ্গে আঁতাতও চূড়ান্ত বিচারে লাভ নয়, বরং দল ও দেশের জন্য চরম ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজকে দুর্বল করে। বিশ্বসমাজের কাছে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। কোনোভাবেই একে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া চলে না। ক্ষমতার রাজনীতিতে সাফল্য-ব্যর্থতা থাকেই। কিন্তু দেশ ও জনগণের স্বার্থ সবার ঊধর্ে্ব। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ নিয়েও কোনো আপস চলে না।