নির্বাচন পরবর্তী প্রেক্ষাপট

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০১৪     আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০১৪

সুভাষ সিংহ রায়




আমরা যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বসবাস করছি, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ত্রুটিহীন নয় এবং আচরণও যথাযথ নয়। কিন্তু ভাবতে হবে, আমরা কতটুকু নিয়মতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের দিকে যাচ্ছি। বোধ করি বলার অবকাশ রাখে, ৫ জানুয়ারির আগের বাংলাদেশ আর এখনকার বাংলাদেশের পরিস্থিতি এক নয়। বিশিষ্ট প্রবন্ধকার সোহরাব হাসান তার লেখার শিরোনাম করেছিলেন 'হেরে গেলেন খালেদা জিয়া'। খালেদা জিয়া স্পষ্টতই রাজনৈতিক খেলায় দারুণভাবে পরাজিত হয়েছেন। ফারুক ওয়াসিফ লিখেছেন, 'বিএনপির নাজুক গোড়ালি'। সবাই বলছেন, বিএনপির নীতিহীন রাজনীতি খুব প্রকটভাবে সামনে এসেছে। বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে, যেই প্রশ্নের উত্তর খালেদা জিয়ার কাছ থেকে পান না। বিএনপি কেন মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে বেকায়দায় থাকে? কোন রহস্যজনক কারণে খালেদা জিয়া পাকিস্তান প্রশ্নে আপসহীন থাকেন? কাদের মোল্লাবিষয়ক পাকিস্তানের অবস্থানের বিরুদ্ধে নিজের ও নিজের দলের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেন না কেন?

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, আওয়ামী লীগসহ প্রগতিশীল দলগুলো যতই বিএনপির জামায়াতে বিলীন হওয়ার অভিযোগ তোলে, ততই বিএনপি জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ যেন আরেক জ্বালা_ পাগলকে সাঁকো নাড়াতে নিষেধ করার মতো। যেভাবেই বলি না কেন, বিষয়টা বিএনপির সাংগঠনিক ব্যর্থতা যতটা নয়; তার চেয়ে বেশি আদর্শিক দুর্বলতা। নানা কারণে অনেক মানুষ আওয়ামী লীগকে অপছন্দ করে। তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধশক্তি হিসেবে বিএনপিকে বেছে নেন_ মূলত এটাই বিএনপির মূল পুঁজি। তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বিএনপিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল হিসেবে দেখতে চান। তারা গত পাঁচ বছরে বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এই প্রশ্ন করা যেতেই পারে_ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি কীভাবে বিএনপিকে সমর্থন করেন? আদর্শগত বাছবিচার অনেক সময় এদেশে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। অনেকে বলেন, এটা আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা। তারা নানা সময়ে নানা কারণে নানা মানুষকে বিরোধী শিবিরে ঠেলে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার পক্ষের মানুষদেরও কষ্ট দেয়। আবার আওয়ামী লীগ বিষধর সাপের লেজে আঘাত করে; মাথায় আঘাত করতে পারে না। এভাবে আওয়ামী লীগের শত্রুপক্ষ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে । কবিগুরু 'গান্ধারীর আবেদন' কবিতায় বলেছেন_ ' সক্ষমে দিয়ো না ছাড়ি দিয়ে স্বল্প পীড়া, করহ দলন।' আওয়ামী লীগ তার ঘোরতর শত্রু জামায়াত-শিবিরকে স্বল্প পীড়া দিয়ে বারবার ছেড়ে দিয়েছে। যার কারণে তারা আজ এত বড় দানবে পরিণত হয়েছে। কোন দল বা গোষ্ঠী বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন করে, তা সবারই জানা। এ দেশে বিএনপি নামক দলটির গঠন প্রণালিও প্রায় সবার জানা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সিংহভাগ আওয়ামী লীগের বাক্সে যায়। বিষয়টা চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ও না। খুব স্বাভাবিকভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা অসাম্প্রদায়িক শক্তিকেই সমর্থন দেবে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগই একমাত্র দল। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে_ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় কেন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হবে? মনুসংহিতায় বলা হয়েছে_ 'যদি রাজা নিরলসভাবে দণ্ডনীয়ের প্রতি দণ্ড প্রয়োগ না করেন, তাহলে অপেক্ষাকৃত অধিক বলশালী ব্যক্তিগণ দুর্বল লোকদের শূলে মৎস্যপাকের ন্যায় কষ্ট দিতে পারে।'

বিগত ৬ মাসে জঙ্গিবাদী শক্তি বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলায় নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছে। সেই স্থানগুলোতে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকটভাবে দৃশ্যমান। দু'একটি জায়গায় সংগঠনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাম্প্রদায়িক লোভী মানুষদের সংশ্লিষ্টতা প্রচারমাধ্যমে এসেছে। সরকারকে এগুলোকেও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে হবে। সাতক্ষীরার জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথার্থ বলেছেন_ সন্ত্রাসী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তাদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার যদি এ কাজটি করতে পারে, দেশের মানুষের ব্যাপক সমর্থন পাবে। পুরনো অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি তারা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে। আবার বলতে হচ্ছে_ জামায়াতি চেতনার কোনো মানুষ যেন আওয়ামী লীগে স্থান না পায়।



স সুভাষ সিংহ রায় :রাজনৈতিক বিশ্লেষক

suvassingho@gmail.com