আম আদমি পার্টির গেম প্ল্যান

ভারত

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০১৪      

রাজীব দেশপাণ্ডে

পুলিশের বিরুদ্ধে একজন মুখ্যমন্ত্রীর রাজপথের আন্দোলনকে উদ্ভট মনে হতে পারে; কিন্তু অরবিন্দ কেজরিওয়াল বেশ অবলীলায় এমনটিই করছেন। তিনি দুর্নীতিবাজ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছেন, বিজেপির নানা অপকর্মের সমালোচনা করছেন আবার কংগ্রেসকে বলছেন বাগাড়ম্বরকারী। তার ওপর আবার এমন সব দাবি করছেন তা যে পূরণ করা সম্ভব নয়, সে ব্যাপারে তিনি নিজেই জানেন।
আম আদমি পার্টি যে পদ্ধতিতে কাজের চিন্তা করছে তা নিঃসন্দেহে অনেক চ্যালেঞ্জের। তবে কাজ করার বর্তমান কৌশল বেশ কিছু প্রশ্ন হাজির করেছে। মূলধারার রাজনীতি এবং জনপ্রিয় বিপ্লব রোধের কায়েমি স্বার্থকে অভিযুক্ত করে নিজের অফিস থেকে প্রস্থানের কৌশল মহিমান্বিত কিছু কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
অবহেলিতদের জন্য সত্যিকারের আশ্রয়স্থল হওয়ার দাবি করে, আপস ও অশুভ আঁতাতের সিস্টেমকে ছুড়ে ফেলে দিতে দৃঢ়সংকল্প আম আদমি পার্টি দিলি্লর বস্তি ও অনুমোদিত কলোনি এলাকার লোকজনের সমর্থন বেশি মাত্রায় পেতে পারেন। কিন্তু পাশাপাশি এটিও মনে রাখতে হবে যে, এর মাধ্যমে মধ্যবিত্ত সমর্থকদের দূরে ঠেলে দেওয়া যাবে না। মধ্যবিত্ত সমর্থকরা কোনো আন্দোলনকে নৈরাজ্যকর মনে করলে তা থেকে সমর্থন সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতার মধ্যে থাকেন। এ ক্ষেত্রে নিম্নশ্রেণী বনাম মধ্যবিত্তশ্রেণীর মেরুকরণ ঘটতে পারে। এটি হয়তো আম আদমি পার্টিকে সুবিধা দেবে না। কারণ মধ্যবিত্তের সমর্থনের কারণেই সম্ভবত আম আদমি পার্টি ভারতপন্থি আবেদন তৈরি করতে পেরেছে।
একটি গোলযোগের নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে কেজলিওয়ালকে খুব কম ক্ষেত্রেই কৈফিয়তমূলক অবস্থানে দেখা গেছে। তিনি বলেছেন, কিছু লোক বলছে আমি একজন নৈরাজ্যবাদী। আমি গোলযোগ ছড়াচ্ছি। আমি মেনে নিচ্ছি, আমি একজন নৈরাজ্যবাদী। এখন আমি সুশীল কুমার সিন্ধের জন্যই নৈরাজ্য করব। অফিসের পার্টি হয়ে থাকার চেয়ে আন্দোলনকারী হয়ে থাকার প্রবণতা রয়েছে আম আদমির মধ্যে। দলের দর্শন অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী প্রধান নির্বাহীর চেয়ে বড় কিছু হবেন। পাশাপাশি সরকার ও বিরোধীপক্ষের সমন্বয়ের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়ার চিন্তা নিঃসন্দেহে দুঃসাহসী। তবে এসবই হয়তো আম আদমি পার্টিকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে সত্যিকারের ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতির জন্য বিকল্প হিসেবে দেখিয়েছে। আম আদমি পার্টির সফলতার কিছুটা এসেছে কংগ্রেস ও বিজেপিকে সমভাবে পচে যাওয়া হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যমে। পাশাপাশি এই যুক্তিও রয়েছে যে, সব দলের রাজনীতিবিদই দুর্নীতিবাজ। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বিজেপিকে ভোট দিতে পারে বলে মনে করা হয়েছিল, এমন অনেক মধ্যবিত্তশ্রেণীর ভোট পেয়ে যায় আম আদমি পার্টি।
আম আদমি পার্টির প্রতি মধ্যবিত্তশ্রেণীর আবেদন আরও শক্তিশালী করেছে সাবেক খ্যাতিমান আমলা, ব্যবসায়িক কর্মকর্তা ও অ্যাক্টিভিস্টদের পার্টিতে যোগদানের মাধ্যমে। এসবের জন্যই দিলি্লর মতো একটি রাজ্যে যেখাবে সর্বভারতীয় এক ধরনের ব্যাপার হয়েছে, সেখানে আম আদমি পার্টি ২৮টি সিট পেয়েছে। গণতন্ত্রের অন্যান্য বিষয়-আশয়ের সঙ্গে তুলনা করে বললে এটিও বলতে হয়, সেসব ক্ষেত্রেও আম আদমি সফল হতে পেরেছে। প্রবাসী ভারতীয়দের কাছে দলটি ব্যাপকমাত্রায় জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এর কারণ ভারতের দুর্নীতির স্ক্যান্ডালগুলো প্রবাসীদের মন বিষিয়ে তুলেছিল। এদের অনেকেই আম আদমির ফান্ডে নিদ্বর্িধায় সহযোগিতা করেছে। আম আদমি পার্টির পাওয়া নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী ও বস্তি এলাকার ভোটগুলো মূলত কংগ্রেসের ভোট, যা দলটি হারিয়েছে। এই বিষয়টি রাজনীতির ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। খিড়কি অঞ্চলের একটি অনুমোদিত কলোনি এলাকার ব্যাপারে আইনমন্ত্রী সোমনাথ ভারতীর সতর্ক অবস্থান স্থানীয় জনসমর্থনকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সোমনাথ ভারতী খিড়কি এলাকায় বেশ কিছু বাড়িতে তল্লাশি চালাতে পুলিশকে নির্দেশ নিয়েছেন। অভিযোগ, সেই এলাকায় আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশের লোকজন মাদক ও দেহ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা কাদের আচরণে অতিষ্ঠ। কিন্তু পুলিশ তল্লাশি অভিযান চালাতে অস্বীকার করে। ক্ষুব্ধ হয়ে মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেন। এই পরিস্থিতিতেই দিলি্লর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিপরিষদ রাজপথের আন্দোলন শুরু করেন। তবে এখন কেউ কেউ বলছেন, ভারতী কেসে স্থানীয় অসন্তোষকে বাড়িয়ে দিয়ে সহজে শনাক্তযোগ্য আফ্রিকানদের টার্গেট করা হয়েছে। ফলে এ ক্ষেত্রে আম আদমির অবস্থান অঞ্চল, সংস্কৃতি কিংবা ভাষাগত ব্যাপারে উগ্র স্বদেশভক্তদের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়; যারা বহিরাগতদের ওপর চোট নিতে চায় এবং ভালোবাসা দিবসে জুটিদের টার্গেট করে।
আম আদমি পার্টি অঙ্গীকার করেছে, দুর্নীতির ঘটনায় সাবেক কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু পরিচালনা করবে। এটি এবং বিনামূল্যে পানি ও স্বল্পমূল্যে বিদ্যুৎসেবা পেঁৗছে দেওয়ার অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু মধ্যবিত্তশ্রেণীর সমর্থকদের আশ্বস্ত করতে আরও বেশি কিছু করার প্রয়োজন, যাতে করে তারা উপলব্ধি করতে পারে, সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আম আদমি পার্টির এমন কিছু বিশ্বাসযোগ্য বিষয়সূচি রয়েছে তা দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আনতে পারে।
দিলি্লতে ভোটারদের বড় একটি অংশ কংগ্রেসের কর্মপন্থার প্রতি রাগ ও হতাশা থেকে আম আদমি পার্টির দিকে ঝুঁকেছে। কংগ্রেসের নীতি ক্রমান্বয়ে রাজধানী শহরটিকে একটি শহুরে বস্তি বানিয়ে ফেলছিল। তার পাশাপাশি সঠিক নিষ্কাশন, দক্ষ আবর্জনা অপসারণ এবং নিয়মিত পানি সরবরাহের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধাগুলো নষ্ট করে দিচ্ছিল। অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তার মন্ত্রীদের রাজপথের সাম্প্রতিক আন্দোলন দেখে এই ভোটাররা মনে করতে পারে, আম আদমি পার্টিকে সমর্থন করা মানেই চিরস্থায়ী আন্দোলনরত অবস্থার মধ্যে পড়ে যাওয়া, পুলিশ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক শত্রুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ক্রমাগত বিপ্লব করে যাওয়া। এমনটি মনে করা শুরু করলে ভোটাররা হয়তো ভিন্ন অবস্থানে যেতে পারে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে ভাষান্তরিত

ভারতীয় সাংবাদিক