মৃত্যুতে থামে না জীবন!

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০১৪      

শরিফুজ্জামান শরিফ

শওকত ভাই_ শওকত মোমেন শাহজাহান সংসদ সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা, কৃষিবিদ ও শিক্ষক। কৃষি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি। ৬৫ বছর বয়সে গত ২০ জানুয়ারি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। রেখে গেলেন কিছু উদাহরণ_ রাজনীতিবিদরা আসেন মানুষকে জয় করতে, তিনি সেটা করতে পেরেছেন বলেই মনে করি। অহঙ্কার তাকে স্পর্শ করেনি। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী উত্তাল সময়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ছাত্রলীগের মধ্যে প্রগতিশীল চিন্তা যারা ধারণ করতেন, তিনি ছিলেন তাদের একজন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, কাদের সিদ্দিকীর কাদেরিয়া বাহিনীর দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিলেন। স্থানীয় কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। প্রথম সাংসদ হয়েছিলেন '৮৬ সালে। তারপর আরও তিনবার। নিজের পেশাজীবীদের একজন দক্ষ সংগঠক। ১৯৯৯ সালের কৃষিনীতির সংস্কার করে যে নতুন নীতি প্রণীত হতে চলেছে তাতে তার বিরাট ভূমিকা ছিল। কৃষি জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধে একটা আইন প্রণয়নে তার চেষ্টা ছিল এবং অনেক দূর সেটা এগিয়ে এনেছিলেন। রাজনৈতিক চিন্তায় ছিলেন খুবই প্রগতিশীল ও প্রাগ্রসর। তিনি বিশ্বাস করতেন, গত চার দশকে কৃষির ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। এক সময় খাদ্য ঘাটতির দেশ বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে, জাতিকে স্বস্তি দিয়েছে, এর জন্য একমাত্র অবদান এ দেশের কৃষকের। তাদের অবহেলায় রেখে আমরা স্বস্তি পাব না। তিনি মনে করতেন, অর্থনীতি-গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৃষিই প্রধান খাত। তাই কৃষির টেকসই উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামগ্রিক কৃষি সংস্কার প্রয়োজন। শুধু বিশ্বাস নয় নিজে সে কাজে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করতেন। কৃষকের সেচ খরচ বাঁচাতে সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা প্রচলনে কয়েকটা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে মিলে কাজ শুরু করেছিলেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে কৃষির উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখে সফলতা দেখালেও তৃতীয় বছরে সেখান থেকে সরে এলে তিনি নাখোশ হয়েছিলেন_ প্রকাশ্যে তার সমালোচনাও করতেন। তিনি মনে করতেন, রাজনীতিবিদদের অনেক সামাজিক দায়িত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে তিনি চমৎকার সম্পর্ক রাখতেন। দুটি ঘটনা উলেল্গখ করতে হয়, একবার তার এলাকায় জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন বলে পত্রিকায় খবর বের হলে সেটা নিয়ে তার দলের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। পরে শুনেছিলাম, বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তার এলাকায় গেলে তিনি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। পরে বলেছিলেন, তারা অন্য দল করেন কিন্তু তারা তো আমার এলাকার অতিথি, আমি সৌজন্যতা প্রদর্শন করতে গিয়েছিলাম। কারণ এটা তো আমাদের সংস্কৃতির অংশ। একদিন সন্ধ্যায় তার অফিসে বসে কথা বলছি, হঠাৎ একটা ফোন এলো। তিনি ফোনে কথা শেষ করেই বললেন, আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে। কাদের সিদ্দিকীর স্ত্রী অসুস্থ, তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। কারণ, সিদ্দিকী সাহেব দেশে নেই। আমি অবাক, কাদের সিদ্দিকী তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী সবাই জানি। তিনি বললেন, হ্যাঁ আপনারা যেটা জানেন সত্যি, কিন্তু তিনি আমার বড় ভাইয়ের মতো সেটা হয়তো জানেন না। এই ঘটনার পর তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বহুগুণে বেড়েছিল। অমায়িক ব্যবহার, ব্যক্তিত্ব ও মানুষকে সম্মান করা ছিল তার প্রধান গুণ। তিনি মানুষকে কখনও বয়সের গণ্ডিতে বিচার করতেন না। ছোটবেলায় আমরা অনেকে শিখেছি, মানুষকে সম্মান করতে হবে। কিন্তু বড় হয়ে তা অনেকেই পরে ভুলে গেলেও দেখে মনে হতো, তিনি সেই বাল্যশিক্ষা মনে রেখেছেন। আমার দেখা আপাদমস্তক একজন জনদরদি, রুচিবান, অমায়িক ব্যবহারের দেশপ্রেমিক-প্রগতিশীল মানুষ চলে গেলেন। মৃত্যুতে থামে না জীবন। শওকত ভাই বেঁচে থাকবেন কর্ম-চিন্তা আর সেই কৃষকের মাঝে। যাদের তিনি ভালোবাসতেন। তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
স সাবেক ছাত্রনেতা