সাইবার ক্রাইমের নতুন ধারা

ড. রাগিব হাসান

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০১৪     আপডেট: ২৬ জানুয়ারি ২০১৪      




বাংলাদেশে সাইবার ক্রাইমের নতুন ধারা শুরু হওয়ার আশঙ্কা বহুদিন ধরেই করছিলাম। সাইবার ক্রাইম সম্পর্কে বাংলাদেশে একটা ভুল ধারণা আছে- প্রচলিত ধারণায় সাইবার ক্রাইমকে ফেসবুক/ই-মেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক কিংবা ওয়েবসাইট হ্যাক করা হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু আসল ক্রিমিনালরা কি মোটিভেশন বা প্রেরণায় সাইবার ক্রাইমে যোগ দেবে? জবাব একটাই- টাকা! গত কয়েক দিনের খবর অনুসারে ব্র্যাক ব্যাংকের অনলাইন সিস্টেমে হামলা চলেছে, আর তার মাধ্যমে ২০ লাখের ওপর টাকা নানাজনের অ্যাকাউন্ট থেকে গায়েব হয়ে গেছে। বিস্তারিত টেকনিক্যাল বর্ণনা এখনও আসেনি, আর এটা কি ব্র্যাকের বিকাশের সিস্টেমিক দুর্বলতার আগের ঘটনাটাই নাকি, তা নিশ্চিত নয়। তবে এটা অবধারিত। টাকার অঙ্কটা এখানে বেশ কম, হয়তোবা এটা ছিল একটা টেস্ট অ্যাটাক। পরে বড় মাপের অ্যাটাকের আগে সিস্টেমটাকে যাচাই করে নেওয়া মাত্র।

ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যাংকিং বা পেমেন্ট সিস্টেমে হামলা আসবে তা অবধারিত। আর কোনো পিস্তল-বন্দুক ব্যবহার না করে ঘরে বসে কোটি টাকা চুরির সুযোগ পেলে অপরাধীরা সেটা অবশ্যই করবে। নিজেদের মেধা না থাকলেও মেধাবী কিন্তু বিপথগামী কাউকে ব্যবহার করে করবে। বাংলাদেশে সাইবার ক্রাইমের এই নতুন ধারা সম্পর্কে সবাইকে হতে হবে সচেতন। অনলাইনে এর ওর বদনাম বা সম্মানহানি ঠেকানোর পেছনে সরকারের মূল সাইবার ক্রাইম আইনের মনোযোগ চলে গেছে। এই সুযোগে আস্তে আস্তে আর্থিক সাইবার ক্রাইম আস্তানা গাড়ছে বাংলাদেশে। সারাবিশ্বে আর্থিক সাইবার ক্রাইম একটা বড় সমস্যা অনেক দিন ধরেই, তা ঠেকানোর জন্য সর্বত্র প্রশিক্ষিত সাইবার ক্রাইম ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে।

বাংলাদেশের এই আসন্ন আর্থিক সাইবার ক্রাইমের দুর্যোগ এড়াতে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। ৩টি উপায়ে সেটা করতে হবে ১. প্রশিক্ষণ, ২. প্রতিরোধ ও ৩. প্রতিকার। শুরুতেই আসছে সিকিউরিটি সম্পর্কে সচেতন হওয়া। ব্যক্তিগত পর্যায়ে, যেমন পাসওয়ার্ড কিংবা অন্যান্য গোপন তথ্য নিয়ে থাকতে হবে সতর্ক, তেমনি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও সেটা করতে হবে। প্রতিরোধ করার জন্য ফিন্যান্সিয়াল সব সিস্টেমকে যথাযথভাবে সিকিউরিটি অ্যানালাইসিসের মধ্য দিয়ে পার করতে হবে। ব্যাংকিং থেকে শুরু করে ফ্লেক্সিলোডের মতো সিস্টেমের চুলচেরা সিকিউরিটি অ্যানালাইসিস করতে হবে।

আর অপরাধ ঘটার পরে সেটার যথাযথ তদন্ত করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। ডিজিটাল ফরেনসিক অ্যানালাইসিস, অনলাইন সাইবার ক্রাইম এসব নিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। না হলে কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোটি কোটি টাকা চলে যাবে সাইবার ক্রিমিনালদের খপ্পরে। আমি একাডেমিক পর্যায়ে এসব বিষয় নিয়ে কাজ করি প্রতিদিন- যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ব্যাপারে কোর্স বা ডিগ্রি আছে। কিন্তু আমার জানা মতে বাংলাদেশের কোথাও সিকিউরিটি কিংবা ডিজিটাল ফরেনসিক নিয়ে পড়ানো হয় না। এ ব্যাপারটা উদ্বেগজনক। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়, তাদের কারিকুলামজনিত সব রকমের সাহায্যে আমি বা অন্য বিশেষজ্ঞরা অবশ্যই এগিয়ে আসবেন। সময় থাকতে সবাই সচেতন হোন। নইলে সমস্যাটা বেড়ে যাবে, হবে অনেক জটিল আর বড় মাপের।



 সহকারী অধ্যাপক, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহাম যুক্তরাষ্ট্র