কাজী আরেফ আহমেদ :কিছু স্মৃতি কিছু কথা

স্মরণ

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪      

শরীফ নুরুল আম্বিয়া

কাজী আরেফ আহমেদ, আমাদের সবার আরিফ ভাই। আরিফ নামেই জানতাম জাসদের সভাপতি (কার্যকরী) হওয়ার আগ পর্যন্ত। ধীরস্থির একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ, সাধারণ অর্থে একজন স্বল্পভাষী মানুষ। জীবনে কোনো জৌলুস ছিল না। রাজনৈতিক লক্ষ্যে অবিচল থেকে কঠোর পরিশ্রম করতেন। বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য নিরলস কাজ করেছেন বঙ্গবন্ধুর ওপর আস্থা রেখে, স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ গঠন করেছেন প্রথমে, পরে যার নাম হয় বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) বা মুজিব বাহিনী। স্বাধীনতার পর জাসদ গঠনে অংশগ্রহণ করেন এবং পরে মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করেন, গোলাম আযমের বিচারের জন্য গণআদালত দিয়ে যার শুরু।
কাজী আরিফকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ কুষ্টিয়ায় জাসদ আয়োজিত জনসভায় নির্মমভাবে হত্যা করে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। লোকমান আহমদ, অ্যাডভোকেট ইয়াকুব আলী, সমসের মণ্ডল, তফসের ও ইসরাফিলকেও একই সঙ্গে হত্যা করা হয়। জাসদ উচ্চ আদালতের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
১৯৬৯ সালের ছাত্র গণআন্দোলনের পর কোনো একদিনে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়, সিরাজ ভাই (সিরাজুল আলম খান) পরিচয় করিয়ে দেন এবং তার সঙ্গে আমাদের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতে বলেন। ১৯৬৯-এর আন্দোলনের পর জেনারেল আইয়ুবের পতন এবং সামরিক আইন নিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়ার আগমনে কর্মীদের মনে ৬ দফার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। পাকিস্তানিরা ওটা মানবে না, একদফা তথা স্বাধীনতা ছাড়া উপায় নেই এবং সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়, সে জন্য নেতারা কী করছেন, কী প্রস্তুতি_ এসব প্রশ্ন নেতাদের জর্জরিত করত। অনেক আলাপ-আলোচনার পর স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের যোগ দেওয়ার কথা বললেন এবং কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার কথা জানালেন, যা অনেকটা অগি্নযুগের অনুশীলন, যুগান্তর সংগঠনের মতো। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ঢাকা শহর উত্তর ছাত্রলীগে কাজ করতে বললেন অনুরূপভাবে, সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দেওয়ার উপযুক্ত কর্মী সংগ্রহ ও তৈরি করতে। আর আমাকে এরপর থেকে সিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বললেন। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদ ছিল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের নিয়ন্ত্রণে। আরিফ ভাইয়ের মুখ্য ভূমিকা ছিল এই বিষয়ে। তার দক্ষতার ওপর সবার আস্থা ছিল।
স্বাধীনতা-পূর্ব মুক্তিসংগ্রামে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অংশীদার ছিলেন। সবটা আমি জানি তা নয়, তবে সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই আর তিনি মিলে যা ছিল নিউক্লিয়াস, কর্মী-জনগণ-নেতাদের মতামত নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতেন।
যেসব সিদ্ধান্ত আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে_
১. সার্জেন্ট জহুরুল হক, আগরতলা মামলার আসামি, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্যাতনে মারা যান। তাকে স্বাধীনতার প্রথম শহীদ হিসেবে ঘোষণা এবং তার নামে সার্জেন্ট জহুর ব্রিগেড গঠন;
২. সুসজ্জিত জয় বাংলা বাহিনী গঠন। ৭ জুন ১৯৭০ পল্টনে জয় বাংলা বাহিনীর কুচকাওয়াজ এবং বঙ্গবন্ধু ভবন পর্যন্ত গমন;
৩. জয় বাংলা ধ্বনির ব্যাপক প্রসার;
৪. স্বাধীন বাংলা তথা মুক্তিযুদ্ধের পতাকা, সবুজ জমিনে লাল সূর্যের মাঝে সোনালি বাংলাদেশের মানচিত্র সংবলিত পতাকা, যা প্রথমে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় উড়ানো হয় অনানুষ্ঠানিকভাবে। ৩ মার্চ ইশতেহারে লিপিবদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে উপস্থাপন, ২৩ মার্চ '৭১ আনুষ্ঠানিকভাবে সারাদেশে উড্ডয়ন করা;
৫. মার্চ মাসে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্মুক্ত পরিবেশে সামরিক প্রশিক্ষণ;
৬. '৭১-এর মার্চজুড়েই বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ ও প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি।
যতদূর মনে পড়ে, ২৫ মার্চের কয়েকদিন পর আমরা অর্থাৎ আমি, হাসানুল হক ইনু, সেলিম ভূঁইয়া আরিফ ভাইয়ের নেতৃত্বে নবাবগঞ্জের পাড়াগ্রামে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ইয়াহিয়া খান পিন্টুর বাড়িতে আস্তানা স্থাপন করি। কিছুদিন ঢাকা জেলা ও ঢাকা শহরের সাংগঠনিক কাজ শেষে কলকাতার পথে আমরা রওনা হই। আরিফ ভাই থেকে গেলেন সিরাজ ভাই সাপ্লাই পাঠাবেন বলে। কিন্তু ওপারের পরিস্থিতি অন্য রকম ছিল, আরিফ ভাইও খুব সম্ভব ২১ দিন পর কলকাতার চলে আসেন।
যুদ্ধকালীন গঠিত মুজিব বাহিনীর দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ড যা তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ছিল সেই কমান্ড হেডকোয়ার্টারে নুরে আলম জিকুর সঙ্গে যৌথভাবে সহঅধিনায়ক হিসেবে কাজ করতেন।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক মতভেদ হয়। মুজিব বাহিনীর অধিকাংশ কর্মী ও মুক্তিযোদ্ধা জাসদে যোগ দেয়। জাসদ গঠন নিয়ে অনেক বিতর্ক হয় এখনও। জাসদের সবাই একমত হয়ে ওই সময় জাসদ করেছেন এমন নয়। বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করেই আমরা '৭২-এর ছাত্রলীগ সম্মেলন করি, আমাদের স্লোগান ছিল, বঙ্গবন্ধুর মন্ত্র বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। কিন্তু আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের আক্রমণে এক জায়গায় থাকা সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে ভুল পরামর্শ দিয়ে অন্য অংশের ক্ষুদ্র সম্মেলনে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশ গড়ার কাজে জাতীয় সরকার গঠনে অস্বীকৃতি, পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। ভিন্নমতের সমাজতন্ত্রী, মুজিব বাহিনী, যারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য থেকে গড়ে উঠেছিল তাদের সামনে নতুন দল গঠন ছাড়া আর কোনো পথ ছিল না, জাসদ গঠিত হলো। আরিফ ভাই ধৈর্যের সঙ্গে একটা সমন্বয় করার চেষ্টা করেছিলেন যা কার্যকর হয়নি।
এরশাদের স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের সময় ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে বামঐক্যের বদলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন, তবে দল ৫ দলীয় বামঐক্যের লাইন অনুসরণ করে।
মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতি আরিফ ভাইয়ের প্রতিশ্রুতি ছিল দৃঢ়। ১৯৯১ সালে গোলাম আযমকে জামায়াতের আমির করার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তির ভেতর গভীর ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম হয়। আরিফ ভাই আরও অনেকের সহযোগিতা নিয়ে ৯ জানুয়ারি সব রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন, সামাজিক সংগঠন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। একই সময়ে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে কর্নেল কাজী নুরুজ্জামানের উদ্যোগে '৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। ১১ জানুয়ারি তাহের মিলনায়তনে উভয় কমিটি ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করে। জাহানারা ইমাম আহ্বায়ক এবং অধ্যাপক মান্নান চৌধুরীকে সদস্য সচিব করে ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালতে গোলাম আযমের বিচার অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক গণআদালতে গোলাম আযমের বিচারের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে গতি সঞ্চারিত হয় তা নবম সংসদে সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে পরিণতি লাভ করে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আজ যে জাতীয় ঐক্যের জন্ম হয়েছে সেটাই বর্তমান সরকার ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যতম শক্তি। এই শক্তিকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে নৈতিক ও সামর্থ্যের বিচারে, তাহলেই বিপক্ষ শক্তিকে দুর্বল করা সম্ভব হবে।
কাজী আরেফ কখনোই বিশ্বাস করতেন না, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও বিপক্ষের শক্তির কোনো মিল হতে পারে। তিনি তা প্রমাণ করেছেন নিজের কর্মকাণ্ড দিয়ে। অনেকে যখন দোদুল্যমান ছিল, তিনি তখন অনড় ছিলেন। আজ আরিফ ভাই নেই আমাদের মাঝে, কিন্তু তার প্রভাব রয়েছে সমকালীন রাজনীতিতে। এভাবেই তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের মাঝে। জয় বাংলা। জয় বাংলাদেশ।
সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ

পরবর্তী খবর পড়ুন : রিট আবেদন

মির্জা ফখরুলের গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ

মির্জা ফখরুলের গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ

ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ ...

কাঙ্গালিনী সুফিয়ার পাশে প্রধানমন্ত্রী

কাঙ্গালিনী সুফিয়ার পাশে প্রধানমন্ত্রী

গুরুতর অসুস্থ প্রখ্যাত ফোক সঙ্গীতশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া। গেল সপ্তাহে অসুস্থাবস্থায় ...

সাতক্ষীরায় ধানের শীষের পোস্টারে আগুন, বসতবাড়ি ভাংচুর

সাতক্ষীরায় ধানের শীষের পোস্টারে আগুন, বসতবাড়ি ভাংচুর

সাতক্ষীরার সদর আসনের বৈকারি ইউনিয়নে ধানের শীষ প্রতীকের বিপুল সংখ্যক ...

যেভাবে ওজন কমাতে ভূমিকা রাখে ফুলকপি

যেভাবে ওজন কমাতে ভূমিকা রাখে ফুলকপি

শীতকালীন সবজি ফুলকপি সবারই পছন্দের। রান্না, সিদ্ধ, ভাজি, ভাজা-সবরকম ভাবেই ...

ভারতের ছবিতে সব্যসাচীর সঙ্গে তিশা

ভারতের ছবিতে সব্যসাচীর সঙ্গে তিশা

প্রথমবারের মতো ভারতীয় একটি ছবিতে অভিনয় করতে যাচ্ছেন নুসরাত ইমরোজ ...

চীনে আইফোন বিক্রি ও আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা

চীনে আইফোন বিক্রি ও আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা

চীনে আইফোন বিক্রি ও আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশটির আদালত। ...

প্রার্থী হতে পারছেন না বিএনপির আলী আজগর

প্রার্থী হতে পারছেন না বিএনপির আলী আজগর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনের বিএনপির প্রার্থী আলী ...

খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা নিয়ে বিভক্ত আদেশ হাইকোর্টের

খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা নিয়ে বিভক্ত আদেশ হাইকোর্টের

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তিনটি আসনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা ...