স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বাধ্যতামূলক হয়ে যাচ্ছে?

চাকরি

প্রকাশ: ১২ মে ২০১৪     আপডেট: ১১ মে ২০১৪

ড. আবদুল্লাহ ইকবাল


বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় সবগুলোতেই শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি চাওয়া হয়ে থাকে। কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় প্রকৌশল বা চিকিৎসকদের বেলায়। কিন্তু কেন? সব ধরনের চাকরির বেলায়ই কি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি জরুরি? স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা MasterÕs Degree (MS/MSc (গঝ/গঝপ ইত্যাদি) পাস মানেই হলো বিশেষায়িত জ্ঞান বা ডিগ্রির অধিকারী। এই বিশেষায়িত জ্ঞানটি হচ্ছে শিক্ষার্থী-চাকরি প্রার্থীর বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের বর্ধিত কলেবর বা বিস্তৃতি। একজন শিক্ষার্থীর সাধারণত স্নাতক পর্যায়ের কোর্স সফলতার সঙ্গে শেষ করার পর কোনো একটি বিশেষ বিষয়ে অধিকতর দক্ষতা অর্জনের নিমিত্তেই মূলত স্নাতকোত্তর ডিগ্রির প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে এটি যেন 'বাধ্যতামূলক' একটি ডিগ্রিতে পরিণত হয়েছে! স্নাতক পাস করার পর সবাইকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য ভর্তি হতেই হবে। আবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এটি 'অনিবার্য' যোগ্যতায় পরিণত হয়ে গেছে। এটি ছাড়া যেন কেউই কোনো ভালো চাকরির আশাই করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় চাকরির আবেদন করার জন্যই এটি অপরিহার্য! কিন্তু বাস্তবে এর যৌক্তিকতা বা প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা কি একটু ভেবে দেখা উচিত নয়?

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় কিছু ডিগ্রি আছে, যেগুলোকে সহজ কথায় বলা হয়ে থাকে 'পেশাগত ডিগ্রি' বা 'চৎড়ভবংংরড়হধষ ফবমৎবব'. সাধারণত পেশাগত ডিগ্রি অর্জনের বিদ্যাপীঠগুলো পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতা বা ঘাটতি থাকলেও আধুনিক কোর্স কারিকুলামের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের তাত্তি্বক ও প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক মেধাকে শানিত করে তুলতে চেষ্টা করছে। যাতে পাস করার পর দেশ ও জাতির কল্যাণে সেগুলো কাজে লাগাতে পারে_ উদাহরণস্বরূপ প্রকৌশল শিক্ষা, কৃষি শিক্ষা, চিকিৎসা শিক্ষা ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবতা পুরোটাই ভিন্ন!

আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি যেখানে ছয়টি অনুষদের অধীনে সাতটি ভিন্ন ডিগ্রি প্রদান করা হয়ে থাকে। যারা সবাই পাস করার পর 'কৃষিবিদ' হিসেবে পরিচিতি পায়। কৃষি শিক্ষার জন্য আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে সেগুলোও অনেক সফল 'কৃষিবিদ' তৈরিতে ভূমিকা রেখে চলেছে। কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা কেবল স্নাতক ডিগ্রিধারীদের খুব কমই (যা একেবারেই নগণ্য) ভালো কোনো চাকরি পাচ্ছে বা চাকরিতে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাচ্ছে! ভালো কোনো চাকরি পেতে গেলে বা আবেদন করতে গেলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি যেন অবধারিত! কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবেদন করার সুযোগ থাকলেও নির্বাচনী পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকারের সুযোগ হয় না। অথচ এমনটি তো মোটেও প্রত্যাশিত ছিল না। সবারই তো আশা ছিল স্নাতক পাস করার সঙ্গে সঙ্গেই অর্জিত জ্ঞান দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজে লাগাবে। কেন তাদের এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে তাদের আরও অধিকতর শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বাধ্য করা হচ্ছে? অনেক সময় দেখা যায় পরিবারের কর্তাব্যক্তিদের বা অভিভাবকদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক কষ্ট করে তার ছেলে বা মেয়েটির স্নাতকোত্তর ডিগ্রির আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে বা জোগাতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা একান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত। রাষ্ট্রের বা সরকারের উচিত ছিল তার/তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। অথচ সেটি না করে তাকে বা তাদের অভিভাবকদের বাড়তি পীড়া দেওয়া হচ্ছে।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য এক থেকে দুই বছর সময় লাগে। এর মানে হলো, একজন শিক্ষার্থীকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করতে বলা মানেই তাকে এক থেকে দুই বছর পিছিয়ে দেওয়া, দুই বছর পর কাজের সুযোগ খুঁজতে বাধ্য করা! কয়েকদিন আগে আমার কয়েকজন শিক্ষার্থী এসেছে আগামী সেমিস্টারে এমএস কোর্সে ভর্তি হতে এবং আমাকে তাদের সুপারভাইজার (তত্ত্বাবধায়ক) করতে চায়। আমি তাদের এমএস করতে নিরুৎসাহিত করতে চেষ্টা করলাম এই বলে যে, চাকরি খোঁজ, ভালো একটা চাকরির জন্য পড়ালেখা করে প্রস্তুতি নাও ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছু উদাহরণ দিতেও চেষ্টা করলাম এমএস ছাড়াও ভালো চাকরি পেতে পার, অনেকেই পেয়েছে। কিন্তু তাদের কথা পরিষ্কার_ স্যার এমএস করতেই হবে। নইলে কোনো চাকরির আবেদনই করতে পারব না! কারণ সব চাকরিতেই এমএস অনেকটা বাধ্যতামূলক! এমএস প্রার্থী পেলে আমাদের নেবে না ইত্যাদি আরও কত কথা! একে একে বলতে শুরু করল কোন কোন চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, কী যোগ্যতা চেয়েছে ইত্যাদি। সব শুনে মনে হলো, ওরা আসলে চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য এমএস করতে চাইছে, বিশেষ জ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে নয় বা বিশেষ জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে নয়! অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করা ছাত্রছাত্রীদের বেলায়ও একই কাহিনী বা পরিণতি। অনেকেই বিষয়টি অন্যভাবে নিলেও বাস্তবতা কিন্তু তাই। এ বিষয়টি দেখার দায়িত্ব কিন্তু চাকরি প্রার্থীদের নয়, এটি দেখার দায়িত্ব আমাদের সরকার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের।

অতীতে ভিন্নতা থাকলেও বর্তমানে দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়েই চালু হয়েছে চার বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্স। সরকার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যদি নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে পারতেন/বাধ্য করতে পারতেন যে, স্নাতক ডিগ্রিধারীরাই তাদের উদ্দেশ্য পূরণে সক্ষম হবেন, তাহলে হয়তো এমনটি হতো না। কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দিলে তাদের উচ্চতর বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। তাহলে হয়তো এই সমস্যাটি এড়ানো যেত। আবার বিষয়টি যে নিতান্তই নতুন সেটিও কিন্তু নয়। আমাদের দেশের প্রকৌশল বা চিকিৎসা শিক্ষায় শিক্ষিতদের বেলায় কিন্তু তাই হচ্ছে। তারা স্নাতক শেষ করেই চাকরিতে ঢুকছে/ঢোকার সুযোগ পাচ্ছে, পরে নিয়োগদানকারী প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন অনুযায়ী স্নাতকোত্তর কোর্স সম্পন্ন করছে। আসলেও সেটি হওয়াই বাঞ্ছনীয়। চাকরিতে ঢোকার পর প্রয়োজন অনুযায়ী যে বিষয়ে তার বিশেষ জ্ঞান দরকার সেই বিষয়েই তিনি উচ্চতর ডিগ্রি নেবেন। এতে ঢালাওভাবে সবার এমএস করার প্রবণতা যেমন কমবে, সেই সঙ্গে রাষ্ট্র বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর চাপও কমবে। আর যে বা যারা গবেষণা বা শিক্ষকতায় আসতে আন্তরিক হবেন তাদের জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রির বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি আর্থিক সুযোগ-সুবিধাও বাড়ানোর ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমলে তাদের ওপর আনুপাতিক বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি গুণগত মানও বাড়ানো যাবে। তাই সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

iqbal21155@bau.edu.bd



সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ