উদ্যোক্তা সৃষ্টি

'আমরা চাকরিপ্রার্থী নই, আমরা চাকরিদাতা'

ড. মুহাম্মদ ইউনূস

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৪

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ

চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে ১৯৭৬ সালে একটি ছোট্ট উদ্যোগ নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৮৩ সালে এটি একটি ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের ৮৫ লাখ ঋণগ্রহীতা রয়েছে। শুরু থেকে আমরা যে দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে এসেছি, তা হলো_ ১. ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে সাপ্তাহিক সঞ্চয় করার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং তারা যেন এ অভ্যাস কোনো প্রকারেই পরিত্যাগ না করে সে ব্যাপারে উৎসাহিত করা এবং ২. ঋণগ্রহীতাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহিত করা। আমরা ঋণগ্রহীতাদের পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করেছিলাম। গ্রামীণ ব্যাংকের যাত্রার শুরুতেই আমরা আমাদের ঋণগ্রহীতাদের উৎসাহিত করেছিলাম, যাতে তাদের সাপ্তাহিক সভার স্থানটিকেই তারা যেন তাদের সন্তানদের স্কুল হিসেবে ব্যবহার করেন। গ্রামের একজন মহিলাকে স্বল্প বেতনে (৫০০ টাকা) এই কেন্দ্র স্কুলে অক্ষর ও সংখ্যাজ্ঞান দেওয়ার জন্য শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নিয়ম করে দেওয়া হয়েছিল। গ্রামীণ ব্যাংকের এই নতুন ধারার স্কুল ওদের সন্তানদের জন্য ছিল লেখাপড়া জগতের প্রথম অভিজ্ঞতা। স্কুলে যাওয়ার ভয়কে অতিক্রম করে প্রতিদিন সবার সঙ্গে মজা করা বাচ্চাদের কাছে আকর্ষণীয় বিষয়ে পরিণত হলো। সদস্যরা প্রত্যেকে নিজ নিজ সন্তানদের স্কুলে পাঠাবে, এই শপথটিকে আমরা ঋণগ্রহীতাদের মূল অঙ্গীকারনামার সনদে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। এই সনদটি 'ষোল সিদ্ধান্ত' নামে সবার কাছে পরিচিত হয়ে পড়েছিল। যে সময়ে গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর অধিকাংশ শিশুই স্কুলে যেত না, সে রকম সময়ে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা ছিল দুঃসাহসিক কাজ। গ্রামীণ ব্যাংক প্রত্যেক শিশুকে স্কুলে যেতে উৎসাহিত করেছে। যারা স্কুলে ভালো রেজাল্ট করত তাদের জন্য বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। আমাদের প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল। আমরা সব শিশুর স্কুলে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পেরেছিলাম। তাদের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হলে আমরা তাদেরকে হাই স্কুলে যেতে উৎসাহিত করেছি। তাদের অধিকাংশই আমাদের কথা শুনেছে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় শেষ হলে আমরা তাদের ডিগ্রি কলেজে যেতে উৎসাহিত করেছি। কিন্তু এ পর্যায়ে এসে অতিরিক্ত খরচ বহনের সমস্যা দেখা দেয়। আমরা তারও একটা সমাধান খুঁজে বের করি। গ্রামীণ ব্যাংক উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে দরিদ্র শিক্ষার্থীর জন্য 'শিক্ষা ঋণে'র ব্যবস্থা করল।
নবীন উদ্যোক্তা : সে সময় থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ডাক্তার, প্রকৌশলী, স্নাতক বা পেশাজীবী হওয়ার উদ্দেশ্যে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে শিক্ষাঋণ গ্রহণ করেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, তাদের অধিকাংশের জন্য দেশে কোনো চাকরি ছিল না। আমরা তাদের মনটাকে চাকরি খোঁজার দিক থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে চিন্তা করার দিকে জোর দিলাম। তাদের বিশ্বাস করতে আহ্বান জানালাম যে, 'আমরা চাকরিপ্রার্থী নই, আমরা চাকরিদাতা।' আমরা তাদের চাকরির সন্ধানে না ঘুরে, গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে ব্যবসা শুরু করার জন্য উৎসাহিত করতে থাকি। উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য যারা গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ গ্রহণ করেছিল, আমরা তাদের 'নবীন উদ্যোক্তা' হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলাম। কিন্তু এই উদ্যোগটির কাজ তেমন গতি পায়নি। কারণ, যেখানে শিক্ষার্থীদের আগের নেওয়া শিক্ষাঋণ পরিশোধ করার ব্যবস্থা হয়নি, সেখানে অভিভাবকরা তাদের ছেলে বা মেয়েদের নতুন করে ব্যবসার জন্য ঋণ নিতে উৎসাহিত করেননি। তাছাড়া ব্যাংক কর্মকর্তারাও নতুন করে তাদের ঋণ দিতে স্বস্তিবোধ করছিলেন না। ফলে নবীন উদ্যোক্তা সৃষ্টির কাজ কোনো গতি পায়নি।
ডিজাইন ল্যাব :সামাজিক ব্যবসা সৃষ্টির কাজে নিয়োজিত আছি অনেক দিন থেকে। ২০১৩ সালের মধ্যে বিভিন্ন আলোচনা সভা, লেখালেখি ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সামাজিক ব্যবসার ধারণাটির সঙ্গে মানুষ পরিচিত হয়ে উঠেছে। নিয়মিতভাবে সামাজিক ব্যবসা সৃষ্টির জন্য ইউনূস সেন্টারের মাধ্যমে 'ডিজাইন ল্যাব' শুরু করলাম ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে। উদ্যোগটির প্রতি উৎসাহ দেখে আমরা প্রতি মাসে ডিজাইন ল্যাব আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিই। যেহেতু ডিজাইন ল্যাবে উপস্থাপিত নতুন নতুন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা মানুষকে আকর্ষণ করছিল, তখন ভাবলাম নবীন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করার জন্য একটি নতুন ভঙ্গিতে কাজ শুরু করলে কেমন হয়।
২০১৪-এর এপ্রিল মাসের শেষাবধি ৬৮ জন নবীন উদ্যোক্তা ডিজাইন ল্যাবে তাদের ব্যবসার পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। তার মধ্যে ৬৪টি প্রকল্প অর্থায়নের জন্য অনুমোদিত হয়। আমার ধারণা, এই ল্যাবের মাধ্যমে ২০১৪ সালের শেষাবধি কমপক্ষে ২০০ জন নবীন উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিনিয়োগের টাকা অনুমোদন পেয়ে যাবে।
ঋণ থেকে অংশীদারিত্বে রূপান্তর :সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে নবীন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ঋণের ব্যবস্থা করার চেয়ে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে অংশীদারিত্ব সৃষ্টি করাটাই বিশেষভাবে ফলপ্রসূ হবে বলে আমার বিশ্বাস। ঋণ থেকে অংশীদারিত্বে রূপান্তরের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। এটি টেকসই ও অনুকরণীয়ভাবে যুব সম্প্রদায়ের বেকারত্ব সমস্যা সমাধানের পথে নতুন সম্ভাবনার পথ সৃষ্টি করবে। অধিক মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ বা সরকার কর্তৃক বিশাল কোনো অবকাঠামোগত নির্মাণ প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে গতানুগতিক চাকরির ক্ষেত্র তৈরির ধারা থেকে বের হয়ে এসে সামাজিক ব্যবসার পদ্ধতিতে বেকার ব্যক্তি নিজেই সহজ, টেকসই এবং সরাসরি ক্ষুদ্র অংশীদারিত্বের কাঠামোতে বিনিয়োগ করে বিষয়টির মোড় ঘুরিয়ে দেবে। এখানে সরাসরি যে কোনো একজন নির্দিষ্ট বেকার ব্যক্তির সমস্যার সমাধান করা যায়। যার সমস্যা তাকে দিয়েই সমাধান। শুধু দরকার প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন। এটা মুনাফা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে উৎপাদিত কোনো অনিশ্চিত পণ্য নয়। সামাজিক ব্যবসায় একজন বিনিয়োগকারী উদ্যোক্তার মাধ্যমে নতুন ব্যবসা সৃষ্টি করে তার সমস্যার সমাধান করে দেয়। নবীন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী তরুণদের বেকারত্ব সমস্যার সমাধান করে (বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এটা যে কোনো বয়সের মানুষের বেকারত্ব সমাধানে কাজে লাগতে পারে, তা যুবকদের হোক বা বয়স্কদেরই হোক)। সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগকারী তার বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে আনা ব্যতীত তা থেকে কোনো লভ্যাংশ গ্রহণ করে না। কাজেই একজন নবীন উদ্যোক্তা তার বিনিয়োগকারী থেকে যে অর্থ গ্রহণ করেছিল তা ফেরত দিতে পারলে নিজেই ব্যবসার মালিক হয়ে যেতে পারে। এটি যে কোনো উদ্যোক্তার জন্য একটি চমকপ্রদ সুযোগ। কল্পনা করুন, একজন তরুণ উদ্যোক্তার জন্য এ বিষয়টি কতটা আকর্ষণীয়। সে তার নতুন ব্যবসার জগতে প্রথমবারের মতো প্রবেশ করতে যাচ্ছে, আর নিজের কোনো টাকা বিনিয়োগ না করেই ব্যবসার মালিক হয়ে যেতে পারছে।
বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তার মধ্যে সম্পর্ক :ব্যবসায় উদ্যোক্তার অংশীদারিত্ব থাকতে পারে আবার না-ও থাকতে পারে। বিনিয়োগকারীর মালিকানাধীন ব্যবসায় উদ্যোক্তা একজন বেতনভুক ব্যবস্থাপকের ভূমিকা পালন করে মাত্র। বিনিয়োগকারী তার ব্যবসার দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে না। ব্যবসায়ে লাভ হলে বিনিয়োগকারী তার লভ্যাংশ গ্রহণ করবে। বিনিয়োগকৃত অর্থের সমান লভ্যাংশ গ্রহণ করার পর বিনিয়োগকারী আর কোনো লভ্যাংশ গ্রহণ করবে না। যে অর্থ সে ফেরত পেয়েছে তা আবার নতুন কোনো সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করবে। কিন্তু তার উদ্দেশ্য ততক্ষণ পর্যন্ত অর্জিত হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে উদ্যোক্তাকে একজন মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। কারণ তার উদ্দেশ্যই ছিল একজন চাকরিপ্রার্থীকে একজন চাকরিদাতায় পরিণত করা। যদি তার উদ্দেশ্য থাকত নিছকই একজন বেকারের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা, তবে তার উদ্দেশ্য কাজের সূচনাতেই অর্জিত হয়ে যেত। এমনকি যদি সে ব্যবসার মালিকানা না-ও ছাড়ে তবু তার ব্যবসা সফল সামাজিক ব্যবসা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু নবীন উদ্যোক্তাদের ব্যাপারে বিনিয়োগকারীর উদ্দেশ্য বেকারদের জন্য নিছক চাকরির ব্যবস্থা করার চেয়েও আরও বড় ছিল। উদ্দেশ্য ছিল, একজন চাকরিপ্রার্থীকে একজন চাকরিদাতায় পরিণত করা। একজন উদ্যোক্তার সৃষ্টি করা। এ লক্ষ্য সে বাস্তবায়ন করে তার শেয়ার উদ্যোক্তার কাছে বিক্রির মাধ্যমে।
প্রশ্ন হলো, বিনিয়োগকারী তার শেয়ার বিক্রির সময় কী মূল্যে বিক্রি করবে? সে শুধু তার শেয়ারের বুক ভেল্যু বা হিসাবমতো মূল্য বা বাজারমূল্য চাওয়ার অধিকার রাখে। এ ক্ষেত্রে উভয় মূল্যই ফেস ভেল্যুর চেয়ে বেশি থাকবে। কারণ তার ব্যবসাটি একটি সফল ব্যবসা। ইতিমধ্যে মূলধনের সমপরিমাণ অর্থ সে অর্জন করে ফেলেছে। সামাজিক ব্যবসার নিয়ম অনুযায়ী, বিনিয়োগকারী তার শেয়ারবাজার মূল্যে বিক্রি করতে পারে। কিন্তু সে তার ফেসভেল্যুর বাইরে যে অর্থ পাবে, তাকে পুনরায় তা অন্য কোনো সামাজিক ব্যবসায়ে বা একাধিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে হবে। সে তার নিজের বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর অর্জন করা বাড়তি মূল্য ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করতে পারবে না। আমরা আমাদের নবীন উদ্যোক্তা প্রোগ্রামে একটা সহজ নিয়ম করেছি। নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচির ব্যাপারে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের কথা মাথায় রেখে নিয়মটি চালু করেছি। আলোচনার সুবিধার জন্য আমরা এই প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীকে 'ফান্ড' নামে অভিহিত করব। ব্যবসায় শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে (বিনিয়োগকারী) ফান্ড মূল বিনিয়োগকৃত অর্থের সমান পরিমাণ অর্থ এবং তার ওপর ২০ শতাংশ অতিরিক্ত গ্রহণ করবে। এই বাড়তি অর্থকে আমরা 'শেয়ার ট্রান্সফার ফি' নাম দিয়েছি।
নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচিতে 'শেয়ার ট্রান্সফার ফি' ধার্যের ব্যাপারে দু'ধরনের যৌক্তিকতা আছে_ এক. সামাজিক ব্যবসায় শেয়ার বদল হয় মার্কেট ভেল্যুতে। আমরা নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচির জন্য এটা নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যে, এটা ফেসভ্যালুতে হস্তান্তর হবে; দুই. নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচিতে ফান্ড নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় থাকে না, খুবই সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। সে উদ্যোক্তার জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, উদ্যোক্তার কর্মকাণ্ডকে সরাসরিভাবে তদারক করে, নানারকম সহায়তা সেবা প্রদান করে, ব্যবসায়িক ঝুঁকি গ্রহণ করে, নানারকমভাবে তাকে সাহায্য করে, জরুরি অবস্থায় ফান্ড নিজে দায়দায়িত্ব নেয়, উদ্যোক্তাকে দক্ষ করে তৈরি করার জন্য ফান্ড কার্যকর ভূমিকা পালন করে। কয়েক বছর ধরে এসব সেবা দেওয়ার জন্য সর্বসাকল্যে মাত্র ২০ শতাংশ অতিরিক্ত দেওয়া খুবই যুক্তিসম্মত হিসেবে সবাই গ্রহণ করবে।
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে আমরা নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচির মৌলিক নিয়মনীতিগুলো চূড়ান্ত করে ফেলেছি। এ সময়ের মধ্যে আমরা মূল পদ্ধতি নির্ধারণের সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্টিংয়ের ফরম্যাটগুলো তৈরি করছি, উদ্যোক্তা নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থির করে নিয়েছি। প্রাথমিকভাবে গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্ট ছিল এর ফান্ড বা বিনিয়োগকারী। তারা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রকল্প বাছাই করে। এরপর নবীন উদ্যোক্তার প্রকল্পগুলো ডিজাইন ল্যাবে উপস্থাপনের জন্য উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। সাধারণত ডিজাইন ল্যাবে ১৫০ জন আলোচনাকারী উপস্থিত থাকে। তাছাড়া এ প্রোগ্রামে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি অংশগ্রহণ করা যায়। ৭০ থেকে ৮০টি দেশের অংশগ্রহণকারী সরাসরি নেটের মাধ্যমে ডিজাইন ল্যাবে যোগ দেয়। অনেকগুলো গ্রামীণ কোম্পানি (গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্ট, গ্রামীণ কল্যাণ, গ্রামীণ ট্রাস্ট, গ্রামীণ ব্যবসা বিকাশ, গ্রামীণ শক্তি) এতে সম্পৃক্ত হয়ে তাদের নিজস্ব প্রোগ্রাম হিসেবে একে গড়ে তুলছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি সাধারণ বা কমন সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রকল্প মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়ন :নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচির প্রথম বড় কাজটি হলো নবীন উদ্যোক্তা খুঁজে বের করা। বিনিয়োগকারী বা ফান্ড এ জন্য গ্রাম পর্যায়ে লোক নিয়োগ করছে। এ কর্মীরা স্থানীয়ভাবে সবার সঙ্গে সরাসরি আলাপ-আলোচনা করে নবীন উদ্যেক্তাকে প্রকল্প তৈরির কাজে উদ্বুদ্ধ করবে। গ্রাম পর্যায়ের কর্মীরাই প্রকল্প তৈরির কঠিন কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করার জন্য উদ্যোক্তাকে তৈরি করবে।
উদ্যোক্তাকে চেনা-জানা প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যাদের ক্যাম্প প্রধানের দৃষ্টিতে অগ্রগামী বলে মনে হবে তিনি তাদের একটি তালিকা তৈরি করবেন। যাদের নাম তালিকায় স্থান পাবে না তাদের জানিয়ে দেওয়া হবে যে তাদেরকে পরবর্তী ক্যাম্পে ডাকা হবে। তারা নিজেদের পরবর্তী ক্যাম্পে ভালো ফলাফল করার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকবে। বাছাইকৃতদের তালিকায় যারা স্থান পাবে তাদের একটি কর্মশালায় ডাকা হবে। এবার প্রত্যেকে নিজ নিজ প্রকল্পকে সুন্দর করে গড়ে তোলার কাজে হাত দেবে। এই কর্মশালা থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে উদ্যোক্তাদের চূড়ান্ত বাছাই করা হবে। এরপরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তাদের ঢাকায় ডাকা হবে। ঢাকায় এসে তারা ফান্ডের প্রশিক্ষিত কর্মীদের সহযোগিতায় ডিজাইন ল্যাবে প্রকল্প উপস্থাপনার জন্য প্রকল্প তৈরি করবে এবং উপস্থাপনার জন্য প্রস্তুতি নেবে। ডিজাইন ল্যাবে বড় কোনো দুর্বলতা ধরা না পড়লে প্রকল্পটি বিনিয়োগের জন্য অনুমোদিত হয়ে যায়। দুর্বলতা চিহ্নিত হলে উদ্যোক্তাকে পরবর্তী ল্যাবে প্রকল্পটি উপস্থাপনের জন্য আহ্বান জানানো হয়।
একবার প্রকল্প পাস হয়ে গেলে তা বাস্তবায়নের জন্য হাতে-কলমে কাজ শুরু হয়। ফান্ড এবং উদ্যোক্তা এবার একটি যৌথ টিম হিসেবে প্রকল্পকে সফল করার কাজে নেমে পড়ে। হাতে পুঁজি পাওয়ার পর নবীন উদ্যোক্তা এবার দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যায়।
সামাজিক ব্যবসার গ্রাম : নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচির পরবর্তী ধাপ হবে একে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া এবং তার চেয়ে বড় কাজ হবে একে ঘিরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন গড়ে তোলা। এই উদ্দেশ্যে পরবর্তী ধাপ হিসেবে 'সামাজিক ব্যবসার গ্রাম' গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। একটি গ্রাম নিজেদের উদ্যোগ নিয়ে নিজেদের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে যাবে এটাই হবে তার দর্শন। এই লক্ষ্য অর্জনের স্ট্র্যাটেজি হবে সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক ব্যাপক উদ্যোগ গড়ে তোলা।
ফান্ডের সহায়ক শক্তি হিসেবে আরও একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। সেটা হবে সামাজিক ব্যবসা ইনকিউবেশন প্রতিষ্ঠান। তার কাজ হবে নানাক্ষেত্রে সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগ সৃষ্টি করার জন্য সব রকম সহায়ক কর্মসূচি গ্রহণ করা। দেশের ও বিদেশের অন্যান্য জায়গায় কী কী ধরনের সামাজিক ব্যবসা চালু হয়েছে, সেটা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কাছে তুলে ধরা, তাদের নিয়ে কর্মশালা করা। যে রকমভাবে নবীন উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য ক্যাম্প করার আয়োজন করা হচ্ছে সে রকম অন্য সব উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে চালু করা, উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য ও দক্ষতা অর্জনের জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করা, যৌথভাবে সামাজিক ব্যবসা সৃষ্টির জন্য গ্রামের বাইরের কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করিয়ে দেওয়া ইত্যাদি।
গ্রামের লোক যারা গ্রামের বাইরে বসবাস করে, এমনকি দেশের বাইরে কাজ করে তাদের গ্রামের সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা। গ্রামের মানুষ কাজ উপলক্ষে যে যেখানেই থাকুক না কেন সবসময় তার মধ্যে একটা বাসনা সুপ্ত থাকে। আমি আমার গ্রামের জন্য কিছু করতে চাই, আমি আমার সেই ছোটবেলার প্রথম স্কুলটার জন্য কিছু করতে চাই ইত্যাদি। ইনকিউবেশন কোম্পানির কাজ হবে এদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গ্রামের সামাজিক ব্যবসা ফান্ডে আরও তহবিল বাড়ানোর জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
বাংলাদেশের প্রত্যেক ইউনিয়নের জন্য এ রকম সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করা যায়। যেসব ইউনিয়ন সামাজিক ব্যবসার গ্রাম প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হবেন তাদের আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। এই ফান্ড পরিচালনার জন্য আমরা চুক্তিবদ্ধ হতে প্রস্তুত আছি। এ রকম তিনটি ইউনিয়নে সামাজিক ব্যবসা ফান্ড গঠন করার জন্য ইউনিয়নের পক্ষ থেকে যত টাকার তহবিল সংগ্রহ করে তহবিলে জমা দেবে গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টে সমপরিমাণ অর্থ ওই তহবিলে জমা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবে। এই তহবিলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবে গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্ট। আগ্রহী সব ইউনিয়নের মধ্য থেকে বাছাই করে গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্ট তিনটি ইউনিয়ন বাছাই করে নেবে, যেখানে তারা সংগৃহীত অর্থের সমপরিমাণ অর্থ নিজেরা বিনিয়োগ করবে। টাকা সংগ্রহে উৎসাহ দেওয়ার জন্য গ্রামীণ টেলিকম ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের আকর্ষণীয় প্রস্তাবটি দিয়ে রাখলাম। এর মাধ্যমে যৌথ বিনিয়োগে সামাজিক ব্যবসার গ্রাম প্রতিষ্ঠার একটা আনন্দময় অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে।
বহু পুরনো সমস্যার নতুন সমাধান : গ্রামীণ ব্যাংকের প্রাথমিক বছরগুলোতে যখন গরিব মহিলাদের আমি বিনা জামানতে ঋণ দেওয়া শুরু করলাম, তখন বহু অর্থনীতিবিদ জোর গলায় বলেছিলেন যে এটা চলবে না। আমি গরিব ও গরিব মহিলাদের এই ভুল বিশ্বাস ভাঙার কাজে নামলাম। ক্ষুদ্রঋণ হলো সেই হাতুড়ি, যেটা পিটিয়ে আমি এই বিশ্বাস ভেঙে দিয়ে চলেছি।
সামাজিক ব্যবসা এসেছে এবার দ্বিতীয় পর্যায়ের আরও শক্তিশালী হাতুড়ি হিসেবে। এবার সবাইকে বিশ্বাস করতে বলছি যে, 'আমি চাকরিপ্রার্থী নই, আমি চাকরিদাতা।'
সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে ব্যবসায় বিনিয়োগকারী এবং শরিক হিসেবে এগিয়ে এসে যে কোনো মানুষকে তার উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষমতা আবিষ্কার করার সুযোগ করে দেওয়াই হলো এই দ্বিতীয় পর্বের কাজ।
বেকারত্বের চরম হতাশা, বিষণ্নতা এবং মানবতার অবমাননা থেকে মানুষ অবশেষে মুক্ত হবে। সেদিন 'বেকার' শব্দটির আর কোনো প্রয়োগ থাকবে না। তখন মানুষ বুঝতে অক্ষম হবে বেকারত্ব মানে কী, এটা কোন ধরনের পরিস্থিতি। কেন একজন মানুষ বাধ্য হবে নিজের সৃজনশীলতার বর্ণিল প্রকাশকে অবরুদ্ধ রাখতে?
যেদিন বেকারত্ব বলে কিছু থাকবে না সেদিন মানুষের নবজন্ম লাভ হবে। নতুন আশা, নতুন সীমাহীন সম্ভাবনার জগতে প্রবেশ করবে মানুষ। এই নতুন মানুষকে ঘিরে নতুন অর্থনীতির জন্ম হবে। প্রত্যেক মানুষের সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ দ্রুতলয়ে ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকবে। নিজের জীবনধারণের জন্য রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মানুষ নিজেকে মুক্ত করে নিজের কৃতিত্বে নিজেকে গৌরবান্বিত বোধ করবে।
সামাজিক ব্যবসা আমাদের এই সম্ভাবনার জগতে প্রবেশ করার অধিকার দিল। সাহস দিল। নবীন উদ্যোক্তা কর্মসূচি এবং সামাজিক ব্যবসার গ্রাম রচনা করে আমরা এর দ্বার উন্মোচন করতে চাই।