গাছে তুলে দিয়ে মই অপসারণ!

বাজেট ও জলবায়ু

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৪     আপডেট: ১০ জুন ২০১৪

শেখ রোকন


সমালোচনামূলক হলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটকে যে অনেকে 'স্বপ্নবিলাসী' আখ্যা দিচ্ছেন, তার কারণ অবকাঠামো ও উন্নয়ন খাতে বিপুল বরাদ্দ এবং তা আহরণে দেশি-বিদেশি নানা উৎসের ব্যাপারে ইতিবাচক পরিস্থিতির চিত্রায়ন। খোদ অর্থমন্ত্রীও সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পরদিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জোরের সঙ্গেই বলেছেন_ 'হ্যাঁ, এই বাজেট উচ্চাভিলাষী' (প্রথম আলো, ৭ জুন ২০১৪)। কিন্তু গোটা বাজেট প্রক্রিয়ার এই 'রাজকীয়' মেজাজ যেন মিইয়ে গেছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বরাদ্দের ক্ষেত্রে। বিশেষত বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর গঠিত জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো অর্থ বরাদ্দ তো নেই-ই, পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। আর বলেছেন নীতিগত উদ্যোগের কথা_ 'আমরা জাতীয় জলবায়ু সংক্রান্ত অভিযোজন পরিকল্পনার পথ নকশা ও জাতীয় জলবায়ু বিপর্যয় পরিকল্পনার পথ নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছি। জলবায়ু বিষয়ক সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা একটি সমন্বিত ক্লাইমেট ফিসক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করেছি।'

অর্থমন্ত্রীর এই বক্তৃতাংশে স্পষ্ট, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় আগামী অর্থবছরে মাঠ পর্যায়ে কাজ নয়, রোডম্যাপ প্রণয়নের মতো নীতিগত তৎপরতাই মুখ্য হবে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত যখন ক্রমশ স্পষ্ট ও প্রকট হয়ে উঠছে, তখন বৈশ্বিক এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রথম সারিতে, এমনকি কোনো কোনো সূচকে শীর্ষে থাকা বাংলাদেশের জন্য এখন থেকে সামনের দিনগুলোতে মাঠ পর্যায়ের তৎপরতাই জরুরি ছিল। জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে আমরা ইতিমধ্যে নীতিগত যেসব প্রস্তুতি নিয়েছি, তা এক কথায় যথেষ্ট। তৃতীয় বিশ্বের তুলনায় তো বটেই, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায়ও আমরা এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে আছি।

এ পর্যন্ত নীতিগত যেসব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে, তার তালিকা কম দীর্ঘ নয়। দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তন সূচিত হওয়ার বিষয়টি ২০০৭ সালে প্রকাশিত আইপিসিসির চতুর্থ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হলেও বাংলাদেশে 'নাপা' বা ন্যাশনাল এডাপ্টেশন প্ল্যান অব অ্যাকশন প্রণীত হয়েছিল ২০০৫ সালেই। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে চূড়ান্ত হয় বাংলাদেশে ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান, বিসিসিএসএপি। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে ১৮.ক অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিষয়টি যুক্ত করে প্রকারান্তরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ। ২০১২ সালে চূড়ান্ত হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের সংজ্ঞা, অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিধান রয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রণীত সরকার পরিচালনার 'রূপকল্প ২০২১' বা ভিশন টোয়েন্টি টোয়েন্টি ওয়ান এবং এর অধীনে গৃহীত সরকারি পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপের কথা রয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে গৃহীত ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও জলবায়ু পরিবর্তন পেয়েছে বিশেষ মনোযোগ।

বাংলাদেশের মতো দেশের নীতিগত প্রস্তুতির পর যে বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, তা হচ্ছে অর্থায়ন। সে ক্ষেত্রেও আমরা বিস্ময়করভাবে উতরে গিয়েছিলাম। মহাজোট সরকারে প্রথম বাজেটে যখন জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডে ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তখন অনেকেরই চোখ কপালে উঠেছিল। এসব ক্ষেত্রে বিদেশি অর্থায়ন ও অনুদানের জন্য বসে থাকাই আন্তর্জাতিক রেওয়াজ। কিন্তু বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নের সাহস দেখিয়েছিল। গত পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে এই তহবিলে বরাদ্দ আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে এখন জরুরি ছিল জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় গত কয়েক বছরে বরাদ্দ অর্থ মাঠ পর্যায়ে কার্যকরভাবে খরচ হচ্ছে কি-না, গৃহীত নীতির সুষ্ঠু প্রতিফলন ঘটছে কি-না, এসব দেখা। পাশাপাশি নতুন অর্থ বরাদ্দ দেওয়া। বাস্তবে তার উল্টোটিই ঘটল।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় অবশ্য বলেছেন_ 'ভবিষ্যতে এ বরাদ্দ (দেশীয় অর্থায়ন) কমতে থাকবে এবং পরিবর্তে উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর অর্থায়নে গঠিত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিলিয়েন্স ফান্ড বৃদ্ধির উদ্যোগ জোরদার করা হবে। উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলো এ ফান্ডে ১৮৬.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করেছে।' উন্নয়ন সহযোগীরা দ্বিপক্ষীয় এই তহবিলে যে অর্থায়ন বাড়াবে, তার নিশ্চয়তা কী? বহুপক্ষীয় জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল বা গ্রিন ফান্ড তো এখনও দূরের বাদ্য।

দেখা যাচ্ছে, কোপেনহেগেনে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত কপ-ফিফটিন থেকেই প্রতিবার শীর্ষ সম্মেলনেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক থেকে যাচ্ছে। বৈশ্বিক এই দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় তহবিল, প্রযুক্তি এবং সর্বোপরি সদিচ্ছা নিয়ে উন্নত বিশ্বের যেভাবে এগিয়ে আসা উচিত, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত শীর্ষ সম্মেলনগুলোতে তা ঘটছে না। আমরা বরং দেখছি, কথার মারপ্যাঁচ, ঘোষণার শব্দজট ও কারিগরি বিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রায় প্রত্যেকবারই শেষ রাত্রিতে যেনতেনভাবে সম্মেলন সমাপ্ত হচ্ছে। এই অবস্থায় অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নযুক্ত খাতটি থেকে বাজেট বরাদ্দ প্রত্যাহার গাছে কাঁঠাল রেখে গোঁফে তেল দেওয়া ছাড়া কী? নতুন বরাদ্দ না থাকলে অভিঘাত মোকাবেলার জন্য ইতিমধ্যে সূচিত প্রকল্পগুলোর অবস্থাও হবে, কাউকে গাছে উঠিয়ে দিয়ে মই সরালে যা হয়, তাই-ই।

সাংবাদিক ও গবেষক

skrokon@gmail.com