সমকালীন প্রসঙ্গ

সাম্রাজ্যবাদী সাহায্য ও আন্তর্জাতিক নীরবতার কারণেই গাজায় ইসরায়েলি হামলা

বদরুদ্দীন উমর

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪     আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০১৪      

সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল




হিটলারের ইহুদি নিধন যজ্ঞের (holocaust) হাত থেকে রক্ষা পাওয়া জীবিত ৪০ জন এবং সেই আক্রমণে নিহত অন্যদের ২৮৭ জন বংশধর গাজায় ইসরায়েলি হামলায় দুই হাজারের বেশি প্যালেস্টাইনের মৃত্যুকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে বক্তব্য দিয়েছেন। International Jewish Anti-Zionist network ইসরায়েলবিরোধী এই ইহুদিদের একটি চিঠি নিউইয়র্ক টাইমস একটি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে (ডেইলি স্টার, ২৫.৮.২০১৪)। সংবাদের পরিবর্তে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই বিবৃতিটি প্রচারের কারণ যে সংবাদ হিসেবে এটি প্রকাশে নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার আপত্তি এতে সন্দেহ নেই। যে বিষয়টি অতিগুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও উপরোক্ত পত্রিকাটি সংবাদ হিসেবে না ছেপে বিজ্ঞাপন হিসেবে ছাপার থেকেই তা বোঝা যায়। এর থেকে আরও বোঝা যায় এই ধরনের পত্রিকার চরিত্র। রাজনৈতিক স্বার্থে এ ধরনের সংবাদ ছাপতে রাজি না হলেও অর্থের বিনিময়ে তা ছাপতে এদের আপত্তি নেই! এই হলো পুঁজিবাদী সংবাদমাধ্যমের নৈতিক চরিত্র!

ইসরায়েলবিরোধী ইহুদিদের এই চিঠিতে বলা হয়েছে, 'বিশ্বের নীরবতার থেকেই গণহত্যার শুরু হয়। প্যালেস্টাইনি জনগণের চলমান গণহত্যা থেকে নিয়ে সব ধরনের জাতিবিদ্বেষের অবসান ঘটানোর জন্য আমাদের সম্মিলিতভাবে আওয়াজ তুলতে হবে এবং আমাদের সম্মিলিত শক্তি ব্যবহার করতে হবে।' ইসরায়েলি সমাজে যেভাবে প্যালেস্টাইনিদের অমানবিকীকরণ ঘটানো হয়েছে তার বিরুদ্ধে শঙ্কা প্রকাশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইসরায়েলে অর্থ এবং কূটনৈতিক সাহায্য প্রদানেরও সমালোচনা এই চিঠিতে করা হয়েছে। মার্কিন অর্থনীতিতে ইহুদিবাদী ইসরায়েল সমর্থক পুঁজি মালিকদের কব্জা শক্ত থাকার কারণে তারা শুধু সরকারের ওপরই প্রভাব বিস্তার করে থাকে, তাই নয়। সংবাদপত্রসহ সব সংবাদমাধ্যমের ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণও তারা কায়েম রাখে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেখানে ইহুদিদের একটা অংশ যে এখন ইসরায়েলের চরম জাতিবিদ্বেষ ও প্যালেস্টাইনি জনগণের বিরুদ্ধে বেপরোয়া সামরিক হামলা ও গণহত্যার বিরোধী এটা কিছুদিন আগেও দেখা গেছে নিউইয়র্কে ইসরায়েলবিরোধী ইহুদিদের বিক্ষোভ মিছিলের মধ্যে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ৩২৭ জন ইসরায়েলবিরোধী ইহুদির বিবৃতিতে বিশ্বে এই ইসরায়েলি সামরিক হামলা এবং প্যালেস্টাইনিদের গণহত্যা সম্পর্কে বিশ্বের যে নীরবতার কথা বলা হয়েছে সেটা এখন এক অতি লক্ষণীয় ব্যাপার।

নিকৃষ্ট সাম্রাজ্যবাদী দেশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার স্বার্থে ইসরায়েলকে পুলিশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম থেকেই ব্যবহার করে আসছে এবং এখনও পর্যন্ত সেদিক দিয়ে তাদের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। অন্য দেশের ওপর হামলার সময় তাদের মুখে সবসময় গণতন্ত্র, মানবতাবাদ ইত্যাদির বুলি শোনা গেলেও তারা হলো বিশ্বের সব থেকে বিপজ্জনক গণতন্ত্র ও মানবতাবিরোধী শক্তি। সাম্প্রতিককালে তারা এটা আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, মিসর থেকে নিয়ে বিশ্বের বহু দেশে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হামলার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে। তারা এটা প্রমাণ করেছে, দেশে দেশে বিভিন্ন ফ্যাসিস্ট সরকারকে অর্থ, অস্ত্রসহ সব রকম সাহায্য প্রদান করে। এদিক দিয়ে ইসরায়েলই হলো তাদের সব থেকে আদরের রাষ্ট্র। তাদের এই আদরের রাষ্ট্র এখন তাদের থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ, অস্ত্র এবং কূটনৈতিক সাহায্য পেয়ে সম্পূর্ণ বেপরোয়াভাবে গাজার ওপর তাদের সামরিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে তারা তাদের আক্রমণ নতুন উদ্যমে শুরু করছে। গত ৮ জুলাই থেকে Operation protection edge নামে যে সামরিক হামলা তারা আরম্ভ করেছে সেটা তাদের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে_ এই মর্মে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এক ঘোষণা প্রদান করেছেন। এই সঙ্গে তিনি গাজার অধিবাসীদের জন্য এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ হুকুম জারি করে বলেছেন, তারা যেন তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। কারণ হামাসের যোদ্ধারা তাদের মধ্যে থেকেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে 'সন্ত্রাসী' হামলা পরিচালনা করেছে। বিশ্বের সব থেকে নিকৃষ্ট সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর এই ঘোষণা এবং হুকুম যে কতখানি ঔদ্ধত্যপূর্ণ সেটা বোঝার অসুবিধা নেই। তবে এই ঔদ্ধত্যের শক্তি তারা কোথা থেকে পাচ্ছে, এটা এক গুরুত্বপূর্ণ দেখার বিষয়। এই শক্তির জোগানদার যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তাদের ইউরোপীয় মিত্রবর্গ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সৌদি আরব, মিসর, জর্ডান ইত্যাদি মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশ এবং ভারতসহ অন্য দেশগুলোও ইসরায়েলের পরোক্ষ মিত্র হিসেবে কাজ করছে। সৌদি আরব হলো এ ক্ষেত্রে মার্কিনের অনুগত রাষ্ট্র। তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কিছু বক্তব্য দিলেও কার্যত এখন প্যালেস্টাইনকে কোনো সাহায্য দিচ্ছে না ও গাজায় বর্তমান ইসরায়েলি আক্রমণের ক্ষেত্রে এক ধরনের নীরবতাই পালন করছে। ইসরায়েল হলো ভারতে দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক সরঞ্জাম এবং অস্ত্রশস্ত্র রফতানিকারক। এসব দেশে সংবাদমাধ্যম নীরবতা পালন করে এবং যে ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হয় না, সেখানে তথ্যে বিকৃতি ঘটিয়ে এমনভাবে সংবাদ পরিবেশন করে, যাতে তার দ্বারা ইসরায়েলের কোনো ক্ষতি হয় না। এর দ্বারা ইসরায়েল কোনো প্রতিরোধ বা প্রতিবাদের সম্মুখীন হয় না। বেপরোয়া হওয়ার ক্ষেত্রে এর থেকে সহায়ক ব্যাপার আর কী হতে পারে?

মার্কিন এবং ইসরায়েলীয় সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যক্ষ সাহায্য-সহযোগিতা এবং অন্যান্য দেশের নীরবতা ও পরোক্ষ সহযোগিতার বলে বলীয়ান হয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, যতদিন প্রয়োজন ততদিন তারা গাজায় সামরিক হামলা চালিয়ে যাবেন। তাদের এই 'প্রয়োজন' হলো গাজার সব অবকাঠামো পরিপূর্ণভাবে ধ্বংস করা। শুধু অবকাঠামো নয়, বেসামরিক বাড়িঘর ও নানা স্থাপনা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা। এই উদ্দেশ্যে তারা ২৪ আগস্ট গাজায় একটি ১৩ তলা আবাসিক ভবন ধ্বংস করেছে। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য করার বিষয় যে, গাজায় প্যালেস্টাইনিদের ওপর এই ব্যাপক এবং অমানবিক হামলা ৮ জুলাই থেকে অব্যাহত থাকলেও প্যালেস্টাইনের প্রেসিডেন্ট মাহমুুদ আব্বাসও প্রায় নীরব আছেন! তার অবস্থানও যে মার্কিন সরকারের সঙ্গে গাঁটছড়ায় বাঁধা আছে তার প্রমাণ তিনি নিজের এই ভূমিকার মাধ্যমে প্রমাণ করছেন। কুয়েতে গিয়ে তিনি হামাস নেতা খালেদ মেশালের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু সেখানে প্যালেস্টাইন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধী কোর্টে যোগদানের জন্য আবেদন করার সিদ্ধান্ত ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কোনো কার্যকর সিদ্ধান্ত হয়নি। মাহমুদ আব্বাসও গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণের বিষয়ে নিজের মতো করে নীরবতা পালন করছেন!

এই অবস্থা যে শুধু গাজা, প্যালেস্টাইন, মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই বিপজ্জনক তাই নয়। বিশ্বজুড়ে মানবতা ও মানবিক অধিকার কতখানি বিপদগ্রস্ত তার পরিচয়ও এসব ঘটনার মধ্যে স্পষ্টভাবেই পাওয়া যাচ্ছে।

২৫.৮.১৪