মাওয়ার ভাঙন নিছক ফেরিঘাটের ইস্যু?

পদ্মা সেতু প্রকল্প

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪     আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০১৪      

শেখ রোকন


মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে চলাচলকারী পিনাক-৬ ডুবে যাওয়া, বিপুলসংখ্যক মৃত্যু এবং পরবর্তী এক সপ্তাহ ধরে লঞ্চটি উদ্ধারে ব্যর্থ তৎপরতা নিয়ে সংবাদমাধ্যম যখন সরগরম, তখন অনেকটা নিভৃতেই ভাঙন সূচিত হয়েছিল মাওয়া ফেরিঘাট এলাকায়। হতে পারে ডুবে যাওয়া যাত্রীদের অন্তত লাশ উদ্ধারের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু এবং স্বজনের আহাজারি, ক্ষতিপূরণ, দায়ীদের শাস্তি, সর্বোপরি ওই ফেরি রুটে চলাচলকারী বিপুলসংখ্যক ভবিষ্যৎ যাত্রীর নিরাপত্তার মতো বড় বড় বিষয়ের তলায় পদ্মার ভাঙনের শিকার ছোট ছোট মাটির চাঙ্গড় কোনো কোলাহল সৃষ্টি ছাড়াই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। ওই পরিস্থিতিতে সেটা স্বাভাবিকও বটে। কিন্তু ভাঙন হঠাৎই স্পষ্ট হয়েছিল ১৯ আগস্ট মঙ্গলবার রাতে। তখন পদ্মা আরও 'আগ্রাসী' হয়ে ওঠে এবং মাওয়ার তিন নম্বর ফেরিঘাটটি নদীতে বিলীন হয়ে যায়।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে যা জানা যাচ্ছে, তা হলো_ মঙ্গলবার রাতে ফেরিঘাটটি নদীতে বিলীন হওয়ার পর বুধবার সকাল ৯টার দিকে ঘাট এলাকা পরিদর্শন করে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘাটটি মেরামত করে সচল করার ঘোষণা দেন। অবশ্য সেই সময় পেরিয়ে গেলেও তা সচল করা সম্ভব হয়নি। পরে হুমকির মুখে থাকা দুই নম্বর ফেরিঘাটের আশপাশে বালুর বস্তা ফেলে 'প্রতিরোধ' গড়ে তোলা হতে থাকে। আসলে মন্ত্রী মহোদয় তিন নম্বর ঘাটটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মেরামতের ঘোষণা দিলেও খোদ নদীর প্রমত্ত পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব ছিল না। কথাটি বিআইডবিল্গউটিসির একজন কর্মকর্তা স্বীকার করে সহযোগী এক সংবাদপত্রের প্রতিবেদকের কাছে বলেন, 'নদীর যে অবস্থা, তাতে স্বাভাবিক হতে আরও বেশ কিছুদিন সময় লাগবে'।

মাওয়ার এই ভাঙনে বিস্মিত হওয়ার উপাদান কম। কারণ নদীমাতৃক বাংলাদেশ নদীভাঙনপ্রবণও বটে। নিজের বুকের পলি তিল তিল করে জমিয়ে গড়ে তোলা ভূখণ্ডই নদী নিজ হাতে ভেঙে ফেলে। প্রতিবছর বর্ষাকাল এলে সংবাদপত্রের পাতা ও টেলিভিশনের পর্দায় ভাঙনের চিত্রের ঘনত্ব বাড়ে। সব মিলিয়ে পলল সমতলে নদী ভাঙন সত্যিই স্বাভাবিক। যে কারণে বর্ষাকালের সূচনা ও সমাপ্তিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদ কবি আল মাহমুদের ভাষায় 'উদ্দাম নদীর আক্রোশের ক্রমাগত ভাঙনের রেখা'য় পরিণত হয়। বস্তুত পার্বত্যাঞ্চলে চাপের মধ্যে থাকা স্রোতস্বিনী পলল সমভূমিতে এসে আড়মোড়া ভাঙতে চায়। অবশ্য বাংলাদেশের বিভিন্ন জনপদ এখন যে ভাঙনের মুখে পড়ে, তা নিছক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া নয়। দীর্ঘ অবহেলা ও পরিকল্পনাহীনতা কিংবা উন্নয়নের ভ্রান্ত মডেলই আমাদের গ্রাম ও শহরগুলোকে নদীর করাল গ্রাসের কাছে বিপন্ন করে তুলেছে। পলল নদীকে বশে রাখতে হলে একদিকে যেমন পাড় বাঁধতে হয়, অন্যদিকে প্রয়োজন হয় নিয়মিত ড্রেজিং। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে নদীশাসনের কাজ বরাবরই 'একচোখা'। পাড় বাঁধার দিকে যতটা মনোযোগ দেওয়া হয়, ড্রেজিংয়ে তার সিকিভাগও নয়।

অবশ্য মাওয়া পয়েন্টে ভাঙনের সঙ্গে দেশের সামগ্রিক চিত্রের তুলনা চলে না। দেশের অন্যতম প্রধান ফেরি যোগাযোগ ব্যবস্থাটি সচল রাখার স্বার্থেই সেখানে নিয়মিত ড্রেজিং যেমন হয়, তেমনই চলে পাড় সুরক্ষা কার্যক্রম। তারপরও ভাঙন শুরু হয়েছে। কেবল এবার নয়, আমরা দেখেছি গত বছর সেপ্টেম্বরেও একই পয়েন্টে আরও তীব্রতর ভাঙনের সূচনা হয়েছিল। কেবল মাওয়ায় নয়, তার বেশ খানিকটা উজানে পদ্মা ও যমুনার মিলনস্থলের কাছে প্রবল স্রোতের কারণে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি চলাচল ব্যাহত হয়েছিল। তখন অনেকে বলছিলেন, পদ্মা ও যমুনার মিলনস্থল স্থানান্তরের কারণেই এই স্রোতধারা পরিবর্তন ও ভাঙন। বিষয়টি নিয়ে সিইজিআইএসের (সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস) উপ-নির্বাহী পরিচালক মমিনুল হক সরকারের কাছে তখন জানতে চেয়েছিলাম এ সম্পর্কে। তিনি বলেছিলেন_ '২০০৯-১১ পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পের ডিটেল ডিজাইনিং স্টাডির যে কাজ হয়েছে, সেটা সিইজিআইএসের পক্ষে আমরা সম্পন্ন করেছি। সেই আলোকে বলতে পারি, পদ্মা-যমুনার মিলনস্থলের সঙ্গে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রত্যক্ষ কোনো যোগসূত্র নেই। মাওয়া এলাকায় আঠালো মাটি ছিল প্রাচীনকাল থেকে, যে কারণে প্রতিবছর ভাঙন দেখা দেয় না। কিন্তু নদী ভাঙনের ২০-২৫ বছরের একটি সার্কেল আছে। তখন নদীর বহিঃবাঁক বদল হয়। এটি ভাঙতে ভাঙতে ভাটির দিকে যায়। একবার ভাঙন দেখা দিয়ে চার-পাঁচ বছর ওই এলাকায় ভাঙন চলতেই থাকে। মাওয়ায় এই ভাঙন থাকলে পদ্মা সেতু প্রকল্পে খুব একট প্রভাব পড়বে না। কিন্তু যদি আরও ভাটিতে ভাঙতে থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে।' (সমকাল, সাক্ষাৎকার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৩)

তখন যারা আশঙ্কা করেছিলেন যে মাওয়া ফেরিঘাটের ভাঙন পদ্মা সেতু প্রকল্পে প্রভাব ফেলতে পারে, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক ছিলেন সেই দলে। তিনি লিখেছিলেন_ 'আরিচার কাছে যমুনা নদী ১৫-২০ কিলোমিটার চওড়া। এর ভেতরের চরগুলো অবস্থান পরিবর্তন করে, তাই একেক সময় একেকরকম মনে হয়। প্রকৃত ব্যাপার হলো, দৌলতদিয়ার ভাটিতে পদ্মার তিনটি প্রবাহপথ ছিল, একটি বাম তীরে হরিরামপুরের পাশ দিয়ে, একটি ডান তীরে ফরিদপুরের পাশ দিয়ে এবং আরেকটি সোজাসুজি ভাটির দিকে। বর্তমানে উত্তরের প্রবাহপথটি বন্ধ হয়ে গেছে, ফরিদপুরের পাশ দিয়ে প্রবাহটিও ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তাই সোজাসুজি প্রবাহপথটি প্রবল হয়ে ভাটিতে পদ্মা সেতু সাইটের উত্তর অংশ মাওয়ার ওপর আঘাত হানছে। এই এলাকার মাটি শক্ত থাকায় ব্যাপক ক্ষতি না করে আগামী বছর ভাঙন এলাকা ভাটিতে সরে যাবে। তবে এর উজানে অপর পারে আড়িয়াল খাঁ নদের উৎসমুখের কাছে যে ভাঙন শুরু হয়েছে তা দু'তিন বছরের মধ্যেই পদ্মা সেতু সাইটের দক্ষিণ তীরের বিশাল এলাকা নদীগর্ভে নিয়ে যাবে।' (সমকাল, ৯ অক্টোবর, ২০১৩)

এই দুই বিশেষজ্ঞের ধারণা আপাত বিপরীতমুখী মনে হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয়ে মিল রয়েছে। তা হচ্ছে, মাওয়ার ভাঙন যদি আরও ভাটির দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য দুর্ভাবনার কারণ হতে পারে। এবার যে ভাঙন শুরু হয়েছে, তা কি ভাটির দিকেই এগোচ্ছে? দুর্ভাগ্যবশত অন্তত সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়ে কোনো আলোকপাত নেই। এই ভাঙনের সঙ্গে যে দুর্মূল্য পদ্মা সেতু প্রকল্পের দূর বা অদূরবর্তী সম্পর্ক থাকতে পারে, সেই আভাসও পাওয়া যাচ্ছে না। মাওয়ার লঞ্চডুবি ও যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে এবং এখন ভাঙন নিয়ে টেলিভিশন টক শোতে কথাবার্তা হচ্ছে বটে, সেখানেও কাউকে দেখছি না বিষয়টির দিকে নজর দিতে। বিপদের আশঙ্কা সেখানেই।

পাড় সুরক্ষা সংক্রান্ত নানা ব্যবস্থা সত্ত্বেও আমরা আবার ভাঙন দেখছি। প্রশ্ন হচ্ছে, ভাঙন কি ভাটির দিকে যাচ্ছে? মাওয়ায় ভাঙনের কারণে কি পদ্মা সেতু প্রকল্পের নকশায় কোনো পরিবর্তন আনতে হবে? তাহলে কিন্তু ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রকল্পটির ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। মমিনুল হক সরকার তখন বলেছিলেন_ '২-১ বছরের মধ্যে ভাঙন যদি সেতু এলাকায় আসে, তাহলে হয়তো নকশায় কিছু স্বল্পমাত্রার পরিবর্তন আনতে হতে পারে।'

বিষয়টি খতিয়ে দেখা বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কাজ। সাদা চোখে দেখে, সাধারণ নাগরিকের বিবেচনা থেকে বলা যায়, যেহেতু পরপর দুই বছর মাওয়া পয়েন্টে ভাঙন চলছে, অনেকটা অদূরের পদ্মা সেতু প্রকল্পে এর কোনো প্রভাব পড়বে কি-না সে বিষয়টি অন্তত আলোচনায় আসুক। মনে রাখা জরুরি, পিনাক-৬ নিয়ে আমরা ব্যস্ত থাকার সময় নিভৃতে মাওয়া ফেরিঘাটে ভাঙন শুরু হয়েছিল এবং এক রাতেই হঠাৎ ফেরিঘাট বিলীন হয়ে গিয়েছিল। এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়। কেবল মাওয়ার ভাঙন এবং সংলগ্ন ফেরিঘাটে এর প্রভাব নিয়েই যেন আমরা মাথা না ঘামাই। নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কেবল স্থানিক বিষয়ে মাথা গুঁজে থাকার প্রবণতা বিপজ্জনক হতে বাধ্য।

যে কোনো 'প্রাকৃতিক' বিপত্তির কারিগরি সমাধান নিশ্চয়ই রয়েছে, অস্বীকার করছি না। কিন্তু পদ্মা সেতু প্রকল্পের স্পর্শকাতরতাও মনে রাখতে হবে। নাগরিকদের দিক থেকে দাবি থাকবে_ মাওয়ায় ভাঙনের কারণ ও প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন, তার প্রভাব যেন ইতিমধ্যে নানা জটিলতায় জেরবার পদ্মা সেতু প্রকল্পে না পড়ে। মাওয়া ফেরিঘাট রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই; কিন্তু পদ্মা সেতুর প্রকল্পের নিরাপত্তা আরও জরুরি। কিন্তু মাওয়ার ভাঙন মোকাবেলা যেন নিছক ফেরিঘাটের ইস্যু হয়ে না দাঁড়ায়। কষ্ট করে হলেও আরেকটু দূরের পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গে এর সম্পর্কের দিকে তাকানো দরকার।

সাংবাদিক ও গবেষক

[email protected]