শিক্ষার্থীরা ফি মূসক আরোপের প্রতিবাদ করছে। তারা বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেছে। তাদের কাউকে কাউকে মূসকসহ ফি জমাও দিতে হয়েছে। তাই শিক্ষার্থীরা সরাসরি হার্ডলাইনে। শিক্ষা জনগণের অধিকার বলে 'শিক্ষায় মূসক আরোপ'কে বৈষম্যমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করেছে তারা। মূল কথা, কোনো পক্ষ (সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়নি। ফলে একটি বহুমুখী সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, যা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। অবশ্য দেরিতে হলেও গত ১০ সেপ্টেম্বর এনবিআর থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, মূসক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ওপর আরোপ করা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের দিতে হবে না।

আশা করা গিয়েছিল, এ ঘোষণায় সংকট কেটে যাবে। কিন্তু কাটেনি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ এবং শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট নন। আইনজ্ঞরা বলছেন, এটা মূসকের আইনগত ভিত্তির পরিপন্থী। আশঙ্কা রয়েছে, কিছুদিন পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মূসকের টাকা অন্যভাবে শিক্ষার্থীদের থেকে আদায় করতে পারে। কারণ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ (রহিত আইন, ১৯৯২) ফি নেওয়ার ব্যাপারে কোনো সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে না। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর মূসক আরোপ 'অলাভজনক' হিসেবে দাবি করা (ক্ষেত্রবিশেষে সোসাইটিজ অ্যাক্ট ১৮৬০-এর আওতায় নিবন্ধন নেওয়া) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলোর নতুন সংজ্ঞায়নের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করছে।

ফি নির্ধারণের মতো বেতন-ভাতাদির ক্ষেত্রেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন সীমা নির্ধারণ করে না। নিজেদের প্রদেয় বেতন-ভাতা এবং আদায় করার জন্য ফি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেরা নির্ধারণ করে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে অনুমোদন নেয়। তাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি ও বেতন-ভাতাদির কাঠামো বিভিন্ন রকম। এতে অতিরিক্ত আদায় ও প্রদান করার সম্ভাবনা থেকে যায়। নিয়ন্ত্রণ, তদারকি এবং সমন্বয় ব্যবস্থা জোরদার না করা হলে মূসক আরোপের ফলে শিক্ষার মান কমে যেতে পারে। ক্লাসের সময়, সংখ্যা, গবেষণা ইত্যাদি হ্রাসের মাধ্যমে তা ঘুরেফিরে শিক্ষার্থীদেরই ক্ষতি করবে।

অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বলা হলেও তার আয়-ব্যয় এবং উদ্বৃত্ত আয়ের ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য উন্মুক্ত নয়। তথ্য যাচাই ও আয়-ব্যয় তদারকির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই, অন্তত একজন শিক্ষক, অর্থ প্রদানকারী শিক্ষার্থী কিংবা দেশের নাগরিকদের তা জানার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ৩৯তম রিপোর্টে (২০১৩ সালে প্রকাশিত) আয়-ব্যয়ের তথ্য দেয়নি এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখ আছে।

যদি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান না হয় তাহলে কী ধরনের প্রতিষ্ঠান তা নির্ধারণ করা হচ্ছে না। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করলে সরকার 'শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা' রোধের ব্যবস্থাও করছে না। আবার অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মতো তাদের জন্য বিদ্যমান আইনি কাঠামোর আওতায়ও কর আদায় না করে মূসক আরোপ করেছে। সরকার মূসক আরোপের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবং সেগুলোর শিক্ষার্থীদের কোনো সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয়নি। আদায়কৃত কর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রয়োজনীয় খাতের উন্নয়নে ব্যয় করার পরিকল্পনা আছে বলে জানা যায়নি। ফলে করের 'পারস্পরিক সুযোগ-সুবিধার' বিষয়টি বাদ পড়ছে এবং কর প্রদানে অনীহা সৃষ্টি করছে।

সরকার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারেনি বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরকারের নির্দেশনা বোঝেনি এবং শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারেনি বা বুঝেও শিক্ষার্থীদের বোঝায়নি অথবা অন্যভাবে বুঝিয়েছে বা ফি বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামিয়ে দিয়েছে_ এর যে কোনো একটিও বিদ্যমান ব্যবস্থার ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে না। এর পুনরাবৃত্তি আবারও বড় ধরনের সংকটের জন্ম দিতে পারে।

যে ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা আবশ্যিকভাবে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে বিঘি্নত করছে। ক্লাসের বদলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় অবস্থান নিলে তা শিক্ষার পাশাপাশি জনগণের জন্যও দুর্ভোগের। এ অবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে দেওয়ার এবং বারবার ঘটতে দেওয়ার সুযোগ নেই। তাহলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সংজ্ঞায়নই কি একটি উপায়?

গবেষণা সহযোগী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট


মন্তব্য করুন