বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকরা তাদের সম্মান ও সম্মানী নিয়ে আন্দোলন করছেন। এ কথা অনস্বীকার্য, সম্মান ও সম্মানী নিয়ে যে কেউ আন্দোলন করতে পারেন। কিন্তু শিক্ষকদের এ আন্দোলন নিয়ে ভুল বোঝার অবকাশ আছে। কারণ অনেকে মনে করতে পারেন, শিক্ষকরা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, সম্মান নির্ধারিত হয় সম্মানী দিয়ে। বিষয়টি সম্পূর্ণ সত্য নয়। সম্মানের বিষয়টি আপেক্ষিক এবং তা সাংস্কৃতিক এতিহ্য দ্বারাও নির্ধারিত হয়।
আমাদের দেশে হাইকোর্ট কিংবা সুপ্রিম কোর্টের একজন মাননীয় বিচারপতিকে দেখা যায় মসজিদের একজন ইমাম সাহেবকে সম্মান দিতে। আবার ইমাম সাহেবকে দেখা যায়, তিনি মাননীয় বিচারপতিকে সম্মান দেখাচ্ছেন। এ দেখে বোঝার উপায় নেই, ইমাম সাহেবকে কি বিচারপতি সম্মান দিচ্ছেন, না ইমাম সাহেবই বিচারপতিকে সম্মান দিচ্ছেন। আসলে উভয়ে উভয়কে সম্মান দিচ্ছেন। যদিও এ কথা আমরা সবাই জানি যে, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ও সম্মানীর দিক থেকে মাননীয় বিচারপতি অনেক ঊর্ধ্বে।
আগেই বলা হয়েছে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চলমান এ আন্দোলনের দুটি দিক রয়েছে; যার একটি হচ্ছে সম্মান, অন্যটি সম্মানী। প্রথমে সম্মানের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যাক। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের মধ্যে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে অনেকে সিএসপি অফিসার হয়েছেন কিংবা বিসিএস অফিসার হয়েছেন। তার মানে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের চেয়ে একজন সিএসপি বা বিসিএস অফিসারের মর্যাদা বেশি বলে তারা মনে করেছেন। যে কারণে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে প্রশাসনের চাকরিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটি হলো ক্যারিয়ার শুরুর দিকের বিষয়। আবার যখন ক্যারিয়ারের শেষের দিকে আসে তখন দেখি অনেক স্বনামধন্য অধ্যাপক সরকারের যুগ্ম সচিব কিংবা বর্তমানের কিছু অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একটি পদের জন্য তদবির করেন। তখন সেই সম্মানিত শিক্ষক আমার চোখে নিজেই তার সম্মানকে ক্ষুণ্ন করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে গিয়ে কিছু শিক্ষক যেভাবে 'আত্মসমর্পণ' করেন, তাতে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, তারা কীভাবে নিজেদের মর্যাদাকে হানি করছেন। পেশার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের বিষয়টি প্রধানত সমাজের মূল্যবোধ দ্বারা নির্ধারিত হয়। তাই একজন ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে প্রশাসনের চাকরিকে বেশি প্রাধান্য দিতেই পারেন। কারণ সে ব্যক্তির কাছে ওই পেশার সম্মান বেশি।
এখন আলোচনা করা যাক সম্মানিত শিক্ষকদের সম্মানীর বিষয় নিয়ে। আন্দোলনরত শিক্ষকরা সম্মানীর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ভারতের দৃষ্টান্ত দেখাচ্ছেন। তারা বলছেন, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা মাসে এক লাখ ৩০ হাজার রুপি বেতন পাচ্ছেন। এটি সত্য, ভারতের শিক্ষকরা সে সম্মানী পাচ্ছেন। কিন্তু আন্দোলনরত সম্মানিত শিক্ষকরা এ কথা বলছেন না, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সে সম্মানী পাওয়ার জন্য এক ধরনের এসিড টেস্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেমন, পুনা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি, একজন সহযোগী অধ্যাপক ১২টি পিএইচডি গবেষককে সুপারভিশন সম্পন্ন করার পরও এবং ১৮টি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা থাকার পরও অধ্যাপক হতে পারেননি। কারণ তার চেয়ে ভালো আরেকজন প্রার্থী ছিলেন। ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাদের প্রচুর বিশ্বমানের গবেষণা প্রকাশনা রয়েছে তারাই সাধারণত সেখানে তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অধ্যাপক হচ্ছেন। তাই তাদের যে বেতন-ভাতা ভারত সরকার দিচ্ছে সেটি তাদের যোগ্যতা বিচারে তেমন বেশি কিছু নয়।
আর একটি বিষয়ে এখন গুরুত্ব দিতে চাই। তা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের কর্মঘণ্টার বিচার করা। যেমন, একজন শিক্ষক ভারতে সকালে এসে বিভাগে ঢোকেন এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি শিক্ষা ও গবেষণা নিয়ে সময় কাটান। ভারতে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা এমনকি রাত পর্যন্ত বিভাগে থাকেন কিংবা বাসা থেকে আবার ল্যাবে আসেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তারা কোনো কাজ না করলেও অন্তত অফিসের চেয়ারে বসে থাকেন ৫টা পর্যন্ত। কিন্তু বাংলাদেশে সম্মানিত শিক্ষকদের অনেককে বিশ্ববিদ্যালয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনও উদাহরণ আছে, কখনও কখনও একজন সম্মানিত শিক্ষক এক সেমিস্টারের পুরো একটি কোর্স শেষ করেছেন মাত্র ৪-৫টি ক্লাস নিয়ে।
অনেকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করেন দুই শ্রেণীর লোক। এক. যারা একে চাকরি মনে করেন এবং আরেক শ্রেণী যারা শিক্ষকতা করেন। যারা চাকরি করেন তাদের জন্য সম্মান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা হর-হামেশা অন্যের সঙ্গে এ বিষয়গুলো তুলনা করেন। আর যারা শিক্ষকতা করেন তাদের সে তুলনা করার কোনো প্রয়োজন নেই, চাহিদাও নেই। কারণ তারা নিজেরাই নিজেদের যথেষ্ট সম্মানী ব্যক্তি বলে মনে করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান বিতরণের জন্য বেশি শ্রম দেওয়া দরকার। সে বিষয়ে যিনি যত বেশি মনোযোগী হবেন তিনি তত বেশি সম্মানিত হবেন এবং সে কারণে সরকারসহ সবাই তখন তাদের আরও বেশি সম্মানী প্রদানের ব্যাপারে সমর্থন দেবেন। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ঋরৎংঃ ফবংবৎাব, ঃযবহ ফবংরৎব রঃ. ভারতসহ অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মান ও নিয়ম অনুসরণ করে অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত। ইউজিসি এ বিষয়ে মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সাধারণত আমরা ধরে নিই, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হলেন জ্ঞানসাধক পণ্ডিত। প্রশ্ন হচ্ছে_ কেন তিনি যারা পণ্ডিত নন তাদের সঙ্গে নিজের সম্মান নিয়ে তুলনা করতে যাবেন? আর যদি তুলনা করেন তাহলে সবাই ভাববে, আসলে তার পাণ্ডিত্য কিংবা সম্মানের ঘাটতি রয়েছে। আমি মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাণ্ডিত্য অর্জন এবং তা প্রকাশে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া দরকার। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা একটিমাত্র নির্দেশক; কিন্তু তা সব 'সম্মানে'র নির্দেশক নয়।
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

মন্তব্য করুন