সময়ের কথা

ঘরে ঘরে নতুন 'সমস্যা'

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৬      

অজয় দাশগুপ্ত

দারিদ্র্য দূর নিয়ে এক আলোচনায় অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলেছিলেন এভাবে- তার পরিচিত এক ব্যক্তির গাড়িচালক তেমন লেখাপড়া শেখেননি, কিন্তু আয় করেন ভালো। ওই চালকের স্ত্রী প্রতিদিন সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং এমএ পাস করেন। এখন বউটি চাকরি খুঁজছেন কিন্তু মিলছে না। মেয়েটির ধারণা, স্বামী যেহেতু ধনী লোকের গাড়ির চালক এবং অনেক ধনী লোকের সঙ্গে জানাশোনা, তাই বউকে একটি চাকরির ব্যবস্থা সহজেই করে দিতে পারে। কেবল সার্টিফিকেট থাকলে চাকরি মিলবে না- এ ধারণা তার হয়েছে।
একই অনুষ্ঠানে আরেকটি ঘটনা বলেছিলেন আরেক আলোচক। তার বাসায় যে নারী 'গৃহকর্মী' হিসেবে কাজ করেন তার ছেলে কলেজে পড়ছে। মায়ের স্বপ্ন, ছেলে বড় হয়ে চাকরি করবে, নিজেদের বাড়ি হবে। মাকে আর তখন অন্যের বাড়িতে 'বান্দিগিরি' করতে হবে না।
আমি এক নারীকে জানি, যার স্বামী তেমন কর্মঠ নন, কিন্তু তিনি কাজ করেন এ-বাড়ি ও-বাড়ি। 'চাকর' বলতে যা বুঝি- প্রকৃতপক্ষে সেটাই তার পেশা। এই পেশায় থেকেই তিনি তিন ছেলেকে স্কুল-কলেজে পড়িয়েছেন। বড় ছেলে এমএ পাস করে এখন স্বায়ত্তশাসিত একটি বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। মাইনে পায় ২৫ হাজার টাকার বেশি। অন্য দুই ছেলেও এমএ এবং এমকম পাস। তারাও চাকরি করবে। বড় ছেলের বিয়ে দেওয়ার সময় খুঁজলেন চাকরিজীবী মেয়ে। পেয়েও গেলেন। কিন্তু নতুন কুটুম বাড়িতে নিজের কী পরিচয় দেবেন- 'চাকর'? এ সমস্যা জটিল, কিন্তু এখন ঘরে ঘরে এমন 'নতুন সমস্যা' তৈরি হচ্ছে। বস্তিবাসী ও দিনমজুরের সন্তানরা পড়ছে। কারখানার শ্রমিক কিংবা গাড়ির চালক অথবা মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে শ্রম ঘামে রিয়াল-দিনার উপার্জন করা 'লেখাপড়ার সুযোগবঞ্চিত' তরুণরা বিয়ে করছে স্কুল-কলেজ পাস দেওয়া মেয়ে। এ মেয়েরা চাকরি চায়। ইতিমধ্যে ধারণা পাকাপোক্ত হয়ে গেছে 'লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে'- এটা সেকেলে কথা। বরং বিএ-এমএ পাস না দিয়েও ড্রাইভারি শিখলে কিংবা টেকনিক্যাল নলেজ থাকলে চাকরির সুযোগ বেশি। সৌদি আরব বা কুয়েত-মালয়েশিয়ায় গেলেও ভাগ্য বদলে যেতে পারে। সে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার দরকার নেই।
গরিবি হটাও ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক স্লোগান। ষাটের দশকের শেষদিকে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার এ স্লোগান তখন জনপ্রিয় হয়েছিল। তবে বিরুদ্ধপক্ষ এটা ব্যঙ্গ করে বলত- গরিবি হটাও নয়; প্রকৃতপক্ষে তিনি গরিবদের হটিয়ে দিচ্ছেন। তার শাসনামলে গরিব আরও গরিব হচ্ছে। এ তর্কের মীমাংসা সহজ নয়। তবে ইন্দিরা গান্ধী বিশাল ভারতে বিপুল সংখ্যক হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে একটি প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলেন- 'আমরাও পারি'।
বাংলাদেশে কিন্তু গরিব মানুষ কমছে। তবে এখনও তারা সংখ্যায় অনেক। বাংলাদেশে ২০০০ সালে 'চরম দরিদ্র' নারী-পুরুষ ছিল মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ। ১৬ বছর পর তা কমে এসেছে ১৩ শতাংশে। দিনে যাদের আয় ৪৩ টাকার কম, তাদের এই হতদরিদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে ফেলা হয়েছে। তাদের সংখ্যা এখন দুই কোটি। বাংলাদেশ সরকার চাইছে ২০২১ সালে আরও ৬০ লাখ লোককে 'হতদরিদ্র' বা দিনে ৪৩ টাকার আয়ের তকমা থেকে মুক্তি দিতে। আর ২০৩০ সালের লক্ষ্য- 'হতদরিদ্র' বলে কেউ থাকবে না। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূস বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, 'অভাব-দারিদ্র্যকে স্থান দিতে হবে জাদুঘরে।' তার প্রত্যাশা- এমন একদিন আসবে বাংলাদেশে যখন একটি গরিব লোকও থাকবে না। অভাব-কষ্ট কেমন- সেটা জানতে হলে যেতে হবে জাদুঘরে। তবে নিশ্চয় কেউ চাইবে না; চিড়িয়াখানায় যেমন বনের পশু-পাখি রাখা হয়, জাদুঘরে তেমনি গরিব চেনানোর জন্য 'জ্যান্ত স্যাম্পল' রাখা হবে।
ড. আইনুন নিশাতের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে। তিনি ৫০ বছর পর বাংলাদেশের রূপ কী হবে এবং সে লক্ষ্যে পেঁৗছাতে কী করণীয় সেটা এমনভাবে বলে গেলেন যাতে চোখের সামনে একটি স্পষ্ট ছবি ভেসে ওঠে। তাকে আমি বলি, সত্তরের দশকের শেষের দিকে চীনের নেতা দেং জিয়াও পিং বলেছিলেন, 'পঞ্চাশ বছর পর আমরা অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হবো।' তার এ ঘোষণায় চীনবিরোধী কেউ কেউ কৌতুকবোধ করে বলেছিল- 'এত দূরের লক্ষ্য'! কিন্তু এ লক্ষ্য ছিল বাস্তবসম্মত। পাঁচ দশক যেতে না যেতেই চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ক্ষমতায় ধরে ফেলেছে। সামরিক ক্ষমতায়ও কাছাকাছি চলে গেছে। বাংলাদেশের কিন্তু সময় এসেছে এ ধরনের লক্ষ্য চূড়ান্ত করে তা অর্জনের কৌশল সুনির্দিষ্ট করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ক্ষেত্রে একটি পদক্ষেপ নিয়ে রেখেছেন- ২০৪১ সালের রূপকল্প। তিনি চাইছেন- বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৭০ বছরে দেশটি যেন উন্নত বিশ্বের কাতারে শামিল হতে পারে। আর স্বাধীনতার ৫০ বছরে (২০২১) লক্ষ্য- মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। মধ্যম বা উত্তম যেখানেই থাকি না কেন, তার কিছু সুনির্দিষ্ট রূপ আছে। এটা স্পষ্ট করার সময় এসেছে। সেটা কেবল সরকারি নথিতে থাকলে হবে না; সব মানুষের কাছে স্পষ্ট করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে- সরকারি কর্মকর্তা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, বিভিন্ন পেশার মানুষকে এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হবে।
লেখাটা শুরু করেছিলাম হতদরিদ্র মানুষদের নিয়ে। আমরা একটু একটু ধনী হচ্ছি- তাতে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ ধনী দেশ হতে পারে- এটা এক সময় ছিল কল্পনার বিষয়। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন প্রভৃতি সংস্থা ও দেশ আমাদের হতদরিদ্র দেশের তালিকায় রেখে দিয়েছিল। তাদের কাছে বাংলাদেশ ছিল 'বাস্কেট কেস', যাদের ধনী দেশগুলো ভিক্ষা ও ঋণ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখবে। কিন্তু বাংলাদেশ এ বদনাম ঘুচিয়ে ফেলেছে। তবে ৩০-৪০ বছর সময় লেগেছে। এ সময় বেশি কি-না, সেটা নিয়ে তর্ক হতেই পারে। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভুল করেছে কি-না, সামরিক শাসনের অধীনে দেশ সঠিক পথে চলেছে কি-না, বিদেশ থেকে পাওয়া ঋণ-অনুদান সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেছে কি-না, এনজিওগুলো গরিব মানুষের ভাগ্য ফেরাতে যে অনুদান নানা দেশ থেকে এনেছে তার কতটা অভীষ্ট লক্ষ্য হাসিলে কাজে লেগেছে- এ সব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হতেই পারে। শিক্ষার প্রসার ঘটছে, কিন্তু মান প্রশ্নবিদ্ধ। স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীরা যা শিখছে তার চেয়ে বেশি শেখা উচিত ছিল- এ নিয়ে দ্বিমত থাকা উচিত নয়। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে সম্ভবত বিতর্ক না করার সময় এসেছে। এটা হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ এখন ভাবতে পারছে- আমরা ধনী দেশ হতে পারি। বছর দশেক আগে একজন অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, 'বাংলাদেশের এমন কী সম্পদ আছে যে বছরে ৭ থেকে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে?' কিন্তু এখন এটা বাস্তব। এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে- প্রবৃদ্ধি কতটা শিল্প-কৃষিতে উন্নতির মাধ্যমে এসেছে আর কতটা সেবা খাত থেকে। মূলকথা হচ্ছে, আমরা পারি- এমন মনোভাব অনেক অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের পদক্ষেপ এ ক্ষেত্রে অনন্য নজির। আমি একাধিক লেখায় 'পদ্মা সেতু স্পিরিট'-এর কথা বলেছি। এখন সময় এসেছে এ স্পিরিট অনুসরণের। বিশাল এ উদ্যোগের পেছনে নেতিবাচক কিছু যে নেই- সেটা বলা যাবে না। এমন একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প থেকে আখের গুছিয়ে নিতে তৎপর অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী। রাজনীতিক, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি- সবাই আছেন এ দলে। বিদেশিরাও আছে। যারা সেতু নির্মাণ, নদী নিয়ন্ত্রণ ও দু'পাশের সড়ক নির্মাণের কাজ পেয়েছে তারা প্রচুর মুনাফা করতে চাইবে। মুনাফা নির্বিঘ্নে দেশের বাইরে নিয়ে যেতে জায়গায় জায়গায় ঘুষ দিতে চাইবে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে রয়েছে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
এ পথে আমরা চলেছি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই। ওই বছরের পহেলা মার্চ নিশ্চিত হয়ে গেল- আমরা স্বাধীনতার পথে চলেছি এবং সশস্ত্র লড়াই করতে হবে এ জন্য। আমরা ভারতের সহায়তা পেয়েছি। ইন্দিরা গান্ধী আন্তরিকভাবে আমাদের পাশে ছিলেন। বিশ্ববাসীর সমর্থনও ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে তো ছিল বাঙালির অদম্য ইচ্ছা। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে কয়েক লাখ তরুণ সশস্ত্র হয়েছিল কোন জাদুমন্ত্রে? তারা ট্রেনিং নিয়ে দলে দলে ফিরেছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়ে। অন্য দেশের মাটিতে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ বেতার কেন্দ্র পরিচালনা করেছি আমাদের নিজস্ব শিল্পী ও কলাকুশলী দিয়ে। প্রায় এক কোটি লোক ভারতের মাটিতে গিয়েছিল প্রাণ বাঁচাতে। তাদের জন্য স্বল্প সময়ে ঘরবাড়ি তোলা হয়েছিল, রেশন প্রদানের ব্যবস্থা হয়েছিল। আবার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের পর দ্রুতই সব শরণার্থী ফিরেও এসেছিল নিজ নিজ ঘরে। এ শক্তিই আমাদের এগিয়ে চলার প্রেরণা।
আমরা উন্নত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। এটা অর্জনে পরিকল্পনায় কিন্তু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। ধরা যাক এখন থেকে ২৫ বছর পরের কথা। আমাদের সব ঘরে বিদ্যুৎ চাই- কিন্তু কীভাবে মিলবে সেটা? কতটা গ্যাসচালিত কেন্দ্র, কতটা সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসবে, কতটা মিলবে নদী আর সমুদ্রের ঢেউ থেকে- এসব নির্দিষ্ট থাকা চাই। আমাদের দক্ষ মানবসম্পদ চাই। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কতজন পাস করবে, কতজনকে দেব টেকনিক্যাল শিক্ষা, কতজন গাড়িচালক হবে, কতজন টেক্সটাইল কর্মী হবে এবং কতজনই বা হবে প্রকৌশলী কিংবা এমবিবিএস ডাক্তার- এসব সুনির্দিষ্ট করার সময় এসেছে। আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা কী হবে, সড়ক ও রেলপথের কীভাবে সমন্বয় হবে, নদী কি সব শুকিয়ে যাবে, খাদ্য-পুষ্টিতে পরিবর্তন আসবে- গরিব মানুষ না থাকলে সমাজের অনেক 'সমস্যা' দেখা দেবে। আমরা বাড়িতে কাজের লোক পাব না, সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার লোক পাব না, কুলি-মুটে পাব না। এমনই কত ধরনের সমস্যা! অফিসে পিওন মিলবে না। সচিবদের কেউ ফাইল এগিয়ে দেবে না সই করার জন্য। এমপি-মন্ত্রীদের গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে থাকবে না। এসব কিন্তু উন্নয়নের সমস্যা। আমরা কি সে জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নিচ্ছি? এ জন্য কেবল আর্থ-সামাজিক পরিকল্পনা নয়; মনোজগতেও চাই বড় ধরনের পরিবর্তন।
সাংবাদিক
[email protected]