প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা

এ বছরেই উদ্যোগ নিন

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৬      

সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

সরকার প্রাথমিক শিক্ষার স্তরকে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ব্যাপারে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই; বরং সবাই একে সাধুবাদ জানাবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সাল থেকে আর কোনো প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা নেওয়া হবে না। আমাদের বক্তব্য, এই পরীক্ষাটি এবার বাতিল করতে বাধা কোথায় বা শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হবে- এ রকম কোনো সম্ভাবনাও নেই।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠন করে। তার পর হঠাৎ করে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষা দেশব্যাপী বোর্ডের অধীনে নেওয়া হবে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করেছিল, এ রকম কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। তবে যতটুকু জানা যায়, পূর্ববর্তী বিএনপি সরকার এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিল। পুনর্নির্বাচিত হলে সম্ভবত এটি কার্যকর করত। যাহোক, মহাজোট সরকার এটি কার্যকর করে। সে সময় শিক্ষা বোর্ড এ পরীক্ষা নিত। বর্তমানে ন্যাশনাল একাডেমি ফর প্রাইমারি এডুকেশন (ন্যাপ) এই পরীক্ষা পরিচালনা করে আসছে। আগে বলা হতো পিসএসি, বর্তমানে পিইসি। নাম যা-ই হোক, কী সর্বনাশ করে চলেছে পরীক্ষাটি, তা আলোচনা করা দরকার। কেমন কাটছে পঞ্চম শ্রেণির একটি ছাত্রের জীবন। ছেলেটিকে ভোরে ঘুম থেকে উঠিয়ে বেলা ৮টার আগে কোচিং সেন্টারে নিয়ে আসা হয়। তার পর কোচিং শেষ হলে বাসা থেকে যে নাশতা বানিয়ে আনা হয়, তা তার মুখে গুঁজে দেওয়া হয়। কর্মজীবী মানুষ যা করে থাকে, শিশুদের সেই কাজটি করতে হচ্ছে। সেখান থেকে স্কুলে। স্কুল থেকে যখন বাসায় ফেরে, তখন সে শারীরিক এবং মানসিকভাবে কতটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয় না। এখানে উল্লেখ্য যে, ঢাকা শহরে যাতায়াত একটা সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে ফেলে। কোনো শিশু যদি মিরপুর কিংবা যাত্রাবাড়ী থেকে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে পড়তে আসে, তা হলে তাকে কতখানি ধকল সইতে হয়, তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? এখন এই সমাপনী পরীক্ষার কথা বলতে গিয়ে জিপিএ ৫/গোল্ডেন নামক একটি দানব ছেলেমেয়েদের তাড়া করছে। প্রথমে পিএসসি এবং জেএসসি চালু করে বেশি উদারভাবে পরীক্ষাপত্র দেখা হয় এবং জিপিএ ৫ সহজলভ্য করা হয়। এর ফলে এমন একটা ধারণা হয়েছে যে, জিপিএ ৫/ গোল্ডেন না পেলে জীবনটা বৃথা। এ ক্ষেত্রে ছেলের অভিভাবকরা বেশি উন্মাদ হয়ে গেছেন। এটি অর্জনের জন্য তারা কোমলমতি শিশুর ওপর কী নির্যাতন করছেন, তা তারা বুঝতেই পারেন না। ছেলেটি যে সকালে উঠে মা-বাবার সঙ্গে অনেক স্বাদ আহ্লাদে নাশতা খাবে, এটি যেন সবাই ভুলে গেছে। কথায় বলে, নয়ে যার হয় না, নব্বইয়ে তার হবে না। শিশুটি যে সময় হেসেখেলে স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হয়ে উঠবে, সে সময় তাকে যন্ত্রের মতো চালনা করা হচ্ছে। শিশু হৃদয়ের কোমল অনুভূতি বিকাশের কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। এখানে পঞ্চম শ্রেণির সিলেবাস সম্বন্ধেও কিছু বলতে হয়। বিশেষভাবে ধর্ম এবং গণিতকে কঠিন করা হয়েছে। কোনো অবস্থায় পঞ্চম শ্রেণির জন্য মানানসই হয়নি। এসব নিয়ে আপাতত আলাপ করার সুযোগ বা লাভ নেই। সংবিধানে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, তার পরিবর্তে দেশে চলছে বহুমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা। ২০১৬-১৭ আর্থিক বছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, নারীর পাশাপাশি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে আমরা সমভাবে গুরুত্ব দিচ্ছি। এদিকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীও দাবি করেছেন যে, শিশুদের জন্য একটি পৃথক বিভাগ খোলা হোক। এ রকম বক্তব্য যেখানে আসছে, সেখানে কেন কোমলমতি শিশুদের চিন্তাচেতনা, কোমল অনুভূতি বিকাশের অন্তরায় ঘটিয়ে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার বন্ধনে আবদ্ধ করা হবে? কোচিং, বিশেষ ক্লাস কিংবা সহায়ক বই এসবের প্রয়োজন চিরকাল রয়েছে। আমরা স্কুলে উচ্চ ক্লাসে বিষয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়েছি। টেস্টের পর ফাইনাল পরীক্ষার আগে শিক্ষকরা বিশেষ ক্লাস নিয়েছেন। টেস্ট পেপার মেডইজি বেরিয়েছে, আমরা কিনেছি। অতএব এসবের কোনো দরকার নেই, এ কথা বলব না। পর্যায়ের কথা বিবেচনায় আনতে হবে। অষ্টম শ্রেণি একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, এ অবস্থায় ছেলেদেরকে কিছুটা অতিরিক্ত বোঝা নিতে হবে এবং তাদের কোচিং এবং সহায়ক গ্রন্থের প্রয়োজন হবে। আর এই পর্যায়ে একটি পাবলিক পরীক্ষার সার্টিফিকেট দেওয়া দরকার। কেননা সরকারি এবং বেসরকারি কিছু পদে চাকরির জন্য এই যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া কিছু কারিগরি/ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য এই পর্যায়ের সাধারণ শিক্ষা থাকা বাঞ্ছনীয়। সেদিক থেকে সরকার প্রাথমিক শিক্ষার স্তরকে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা যথাযথ হয়েছে, সে কথা আগেই বলা হয়েছে। আমাদের বিশেষ অনুরোধ, এ বছরই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাটা বাতিল করে দেওয়া হোক। এখানে আরও একটি কথা বলা প্রয়োজন। তা হলো, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ভূত চতুর্থ শ্রেণিতে থাকতেই ঘাড়ে চেপে বসে। কেননা, অভিভাবকদের সতর্কতার কারণে চতুর্থ শ্রেণি থেকেই কোচিং স্কুলে নিয়ে যেতে শুরু করেন। এটা বোধগম্য হচ্ছে না যে, আগামী বছর যে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না, তা এবার বাতিল করলে কী আসে যায়। এখানে আরও বলা প্রয়োজন, এরা অর্থাৎ যারা বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণিতে, তাদের তো অষ্টম শ্রেণিতে পরীক্ষা দিতেই হবে। তা হলে কেন এই অনড় সিদ্ধান্ত। অবশ্য আমলাতান্ত্রিক দাম্ভিকতা যদি কাজ করে, তাহলে ভিন্ন কথা। আমলারা মনে করছেন, তাদের সিদ্ধান্ত যে তারা এবারের পরীক্ষা নেবেন বলেছেন, অতএব নিতেই হবে। কেননা, এই উপমহাদেশের গণবিমুখ আমলারা জনকল্যাণের কথা ভাবেন না। তারা তাদের নিজস্ব ঢঙে চলেন। তবে সরকার যেখানে বলছে তারা জনগণের নির্বাচিত সরকার; অতএব, জনগণের কল্যাণের কথাই তারা ভাববেন। অতএব ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার শিকল থেকে মুক্ত করা হোক। তারা হেসেখেলে মুক্ত বিহঙ্গের মতো চলাফেরা করুক। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তোতা কাহিনী নিশ্চয় অনেকে পড়েছেন। আমাদের শিশু-কিশোরদের অবস্থা যেন তোতার মতো না হয়।

সাবেক ইপিসিএস ও কলাম লেখক