স্থিতিশীল অর্থনীতি, ধারাবাহিক মুদ্রানীতি

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০১৬      

ড. আহসান এইচ মনসুর

গত সপ্তাহে চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ফজলে কবিরের এই প্রথম মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলো। তিনি কি এ নীতিতে পরিবর্তন আনবেন_ সে প্রশ্ন কারও কারও ছিল, যে কারণে এর প্রতি বাড়তি নজর ছিল। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতায় লক্ষণীয় কোনো পরিবর্তন আসেনি। এটা প্রত্যাশিতই ছিল। কারণ, সরকারের নীতিগত কোনো পরিবর্তন ছাড়া সাধারণত মুদ্রানীতিতে বড় পরিবর্তন আসে না। আমরা সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীলতা দেখছি, তারই প্রতিফলন ঘটেছে এ নীতিতে।
ব্যক্তিগতভাবে নতুন মুদ্রানীতিতে মোটামুটি সন্তুষ্ট। এর মূল কারণ হচ্ছে, গত কয়েকটা মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার যে ধারাবাহিকতা ছিল, এবারও সেটা বজায় রাখা হয়েছে। লক্ষ্য অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি যদি ৫ দশমিক ৮ শতাংশে ধরে রাখা যায়, এর প্রভাব অর্থনৈতিক খাত বিশেষত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ইতিবাচক হবে। একই সঙ্গে অবশ্য বৈশ্বিক মূল্য পরিস্থিতি বিশেষত আমাদের বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর মূল্য পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখতে হবে। বলা যায়, এ বিবেচনায় আমাদের ৫ দশমিক ৮ লক্ষ্যমাত্রা এখনও বেশি। বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক ও অংশীদারিত্বমূলক পরিস্থিতির কথাও মাথায় রাখতে হবে। ধারাবাহিকতা যেমন বজায় রাখা চাই, তেমনি ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। খানিকটা উচ্চাভিলাষী মনে হলেও আমি মনে করি, মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা আরেকটু কমিয়ে ৫ দশমিক ৫ রাখা যেত। আমরা দেখব, নতুন মুদ্রানীতিতে যে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা এমনকি চীন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ভারতের চেয়েও কিছুটা বেশি। টাকার বিনিময় হার নির্ভর করে মূল্যস্ফীতির ওপর। ফলে আমাদের টাকার বিনিময় হার যদি স্থিতিশীল রাখতে হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতিকে আরও কমাতে হবে। কারণ, আমাদের নিজেদের মুদ্রা টাকা ওভারভেল্যুড বা অতিমূল্যায়িত। এ হার ইতিমধ্যেই ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এখন সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে। আরও বেশি দূর গেলে রফতানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রফতানিকারকরা ছাড়াও প্রবাসীরা এ হারকে নিরুৎসাহজনক মনে করছেন। তারা প্রচুর অর্থ পাঠাচ্ছেন; কিন্তু পরিবার সে তুলনায় লাভবান হচ্ছে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অবৈধ পথে অর্থ প্রেরণ উৎসাহিত হয়, যা আদৌ কাম্য নয়। আমরা টাকার মূল্যমানের স্থিতিশীলতা চাই। তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও কমানোর ওপর জোর দিতে হবে। আরও একটি কারণে মূল্যস্ফীতি কমানোতে কথা বলছি। এ হার কমাতে পারলে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও কমিয়ে আনতে পারব। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হলে এ হার ক্রমে আরও কমিয়ে আনতেই হবে।
এটা ঠিক, নতুন মুদ্রানীতিতে সুদের হার কমিয়ে আনার ইঙ্গিত রয়েছে। রেঞ্জিং রেট কমে গেছে। এর ফলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য বেসরকারি খাতের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। জানুয়ারি-জুন সময়ের জন্য এটা ছিল ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। আমরা দেখেছি, গত মে মাস পর্যন্ত বেসরকারি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছিল। সেদিক থেকে বেসরকারি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো বাস্তবসম্মত হয়েছে বলে আমি মনে করি। ব্যক্তি খাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধিকে আমাদের স্বাগত জানাতে হবে। এই বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ব্যক্তি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৬ নির্ধারণ করার যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যাবে না।
বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের ঋণের ওপর নমিনাল সুদের হার যদি সিঙ্গেল ডিজিট বা ৯ শতাংশের নিচে রাখতে হয়, তাহলে দুটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। একটি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি, অপরটি সুদহার। মূল্যস্ফীতি যদি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হয়, আর যদি সুদের হার ৬ শতাংশ থাকে, তাহলে ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে সক্ষম হবো না।
এই প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে, ৬ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি কোনোমতে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের ব্যাংকের পলিসি স্টেটমেন্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এর অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের ঋণের মানের অবক্ষয়। অনাদায়ী বা বিলোপিত ঋণের ক্ষয়ক্ষতি মেটানোর বাধ্যবাধকতার কারণে সুদের হার বাড়িয়ে রাখতে হয়। কিছু লোক ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করেন না। কেউ কেউ আদৌ পরিশোধ না করার কৌশল নেন। এটা ব্যাংকিং খাত শুধু নয়, সার্বিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। আমরা দেখছি, বাংলাদেশের প্রায় দশ শতাংশ ঋণ অনাদায়ী। যেহেতু ব্যাংকগুলোকে এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হয়, তারা সুদের হার বৃদ্ধি না করে পারে না। এর দায় চাপে ভালো ঋণগ্রহীতাদের ওপর। সুদের হার কমানোর সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও দক্ষতা বিশেষভাবে বিবেচ্য বিষয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সুশাসনে নজর দিতে হবে এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ক্লাসিফাইড বা শ্রেণিকৃত ঋণের হার পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। এই কাজটি করতে হবে খুবই দ্রুত। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রবৃদ্ধির গতিকে যদি মুদ্রানীতির মাধ্যমে সহায়তা করতে হয়, তাহলে মূল্যস্তরের স্থিতিশীলতা এবং ঋণমানের গুণগত উন্নতি অবশ্যই প্রয়োজন হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককেই আরও কার্যকর পন্থা গ্রহণ করতে হবে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ নিয়েও সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। আমার ধারণা, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ যেভাবে গত কয়েক মাসে বেড়েছে, তাতে করে এটা এই অর্ধের শেষ নাগাদ ১৭ বা ১৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বেসরকারি খাতে মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেলে কিছুটা ক্ষতি হয়। লক্ষ্য রাখতে হবে, এই ঋণের প্রবৃদ্ধি স্পেকুলেশন অ্যাকটিভিটিতে যেন না যায়। ফটকাবাজি কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঋণ বৃদ্ধির মূল লক্ষ্য হচ্ছে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের ব্যবহার তথা তারল্য বৃদ্ধি। যেমন শিল্পপণ্য উৎপাদন খাত, কৃষিপণ্য উৎপাদন খাত ইত্যাদি। চলতি বছরের শেষ নাগাদ যদি বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ১৮ শতাংশ ছাড়িয়ে ২০ শতাংশ পার হয়ে চায়, তাহলে অবশ্যই উৎকণ্ঠার কারণ থাকবে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংককে 'প্রোঅ্যাকটিভ' ভূমিকা গ্রহণ করে তা লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি সীমার মধ্যে রাখতে হবে। কারণ আমরা চাই না, স্পেকুলেশন অ্যাকটিভিটি শেয়ারবাজারসহ অন্যান্য অ্যাপেক্স মার্কেটে আবার দুর্যোগের সৃষ্টি করুক। সেটা গোটা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি অনেক সাধারণ মানুষেরও ক্ষতি করে।
মুদ্রানীতি পর্যালোচনা করে আমার কাছে এটা প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি ও ব্যক্তি খাতে ঋণের চাপ নিয়ে সতর্কাবস্থায় রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ইন্টারভেনশন রেইট রিপো ও রিভার্স রিপো রেইট অপরিবর্তিত রেখেছে। বাজার বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আশা করেছিলেন যে এটা কমানো হবে। আসলে কমানো হয়নি সতর্কতার কারণে। আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্ত সঠিক। এটা ঋণের যথাযথ প্রবৃদ্ধিকে ঠিক রেখে স্পেকুলেশনকে ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
সার্বিকভাবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। এই মুদ্রানীতি তা বজায় রাখতে সহায়ক হবে আমি আশা করি। তবে সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে করে একদিকে তারল্যের প্রবাহে অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, অন্যদিকে বেশি তারল্য যেন ক্ষতিকর না হয়।
নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট