ডাক্তার এম আর খান :একজন মানবতাবাদী কর্মবীর

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০১৬      

বদরুদ্দীন উমর

৫ নভেম্বর ডাক্তার এম আর খানের জীবনাবসান হয়েছে। তার সঙ্গে ছিল আমার দীর্ঘদিনের পরিচয়। তিনি বিদেশ থেকে ডাক্তারি পাস করে আসার পর তার বাবা তাকে আমার আব্বার কাছে নিয়ে এসেছিলেন দেখা করাতে আমাদের রামকৃষ্ণ রোডের বাসায়। তখনই তাকে আমি প্রথম দেখি ও তার সঙ্গে পরিচয় হয়। সেটা মনে হয় ছিল ১৯৬২ সাল। পরে তার সঙ্গে আমার একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে রাজশাহীতে থাকার সময়।
তিনি বরাবরই একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন। ১৯৫৩ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর তিনি এডিনবরা ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একাধিক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে চাকরি করার পর তিনি দেশে ফিরে এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগে যোগদান করেন। পরে ১৯৬৪ সালে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (শিশু স্বাস্থ্য) পদে যোগ দেন। মনে হয় ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি রাজশাহীতে ছিলেন। আমি রাজশাহী ছেড়ে আসি ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে, তখনও তিনি রাজশাহীতে ছিলেন।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজে কয়েকজন ডাক্তারের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়, যার মধ্যে ডাক্তার এম আর খান ছাড়াও ছিলেন ডাক্তার এমদাদ খান এবং ডাক্তার কাদরী। বিভিন্ন সময়ে তাদের কাছে আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসা নিই। আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে, প্রত্যেক রোগীকে তিনি অতি যত্ন সহকারে দেখতেন সময় নিয়ে। তার একটি নোটবই ছিল, তাতে তিনি প্রত্যেকের ওপর নোট নিতেন। আমার বড় মেয়ে মসিহার পেটে এক-দেড় বছর বয়সেই কীভাবে টেপ ওয়ার্ম নামে এক ধরনের ওয়ার্ম দেখা যায়। সাদা রঙের টেপের মতো ছোট ছোট জিনিস নিয়মিত বের হলেও সেটা বন্ধ করা কিছুতেই যাচ্ছিল না। রাজশাহীর কোনো ডাক্তারের চিকিৎসাতেই কাজ হচ্ছিল না। ডাক্তার এম আর খানও কিছু করতে পারছিলেন না। কিন্তু তিনি এটা খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন এবং এ বিষয়ে বেশ কিছুদিন নানা জার্নালও ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলেন। তার নোটবুকের কথা বলেছি। তিনি এ বিষয়ে তার নোটবুকে প্রয়োজনীয় বিষয় লিখে রাখতেন। এ নিয়ে তার ধৈর্য দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম। তারপর একদিন তিনি বললেন, নতুন এক চিকিৎসা করবেন নতুন ওষুধ দিয়ে। দেখা গেল, সেই ওষুধ দিতেই ম্যাজিকের মতো কাজ হলো। পরদিনই দেখা গেল, ওয়ার্ম থেকে টেপের মতো যে জিনিস বের হচ্ছিল সেগুলোসহ ওয়ার্মটির মাথাসুদ্ধ পড়ে গেল! আমার মেয়ে রোগমুক্ত হলো। এতে ডাক্তার খান খুব খুশি হয়েছিলেন। এই সামান্য বিষয়টি এখানে উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, নিজের কাজ তিনি কত যত্নের সঙ্গে ও সিরিয়াসলি করতেন একজন চিকিৎসক হিসেবে, তার প্রমাণই আমি আমার মেয়ের চিকিৎসা ক্ষেত্রে দেখেছিলাম। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, তিনি শুধু আমার মেয়ের চিকিৎসা ক্ষেত্রেই এটা করেছিলেন। মোটেই তা নয়। প্রত্যেক রোগীই তার কাছে ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে তিনি অবহেলা করতেন না। নিজের পেশাকে তিনি একটা মানবিক কাজ হিসেবেই বিবেচনা করতেন।
রাজশাহীতে থাকার সময় শুধু চিকিৎসার প্রয়োজনে নয়, এমনিতেও মাঝে মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হতো। তাদের সঙ্গে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। আমি যখন রাজশাহী থেকে চলে আসি, তখন তিনি তার বাসায় এক রাতে দাওয়াত করেছিলেন। সেই সাক্ষাতের পর তার সঙ্গে ঢাকাতে যোগাযোগ হলেও আগের মতো বেশি দেখা-সাক্ষাৎ হতো না। কিন্তু তবু দেখা-সাক্ষাৎ হলে উভয়েই আমরা খুশি হতাম।
অন্য কথায় যাওয়ার আগে আমার পারিবারিক চিকিৎসার আর এক ঘটনা বলা দরকার। ২০০০ সালে ঢাকায় আমার ছেলে সোহেলের মেয়ে ইনশা ও ছেলে জেহান দু'জনই কী একটা ওষুধ পানিতে গুলে খেয়ে ভীষণ অসুস্থ হলো। তাদের অবস্থা দেখে আমরা খুব ভয় পেলাম। ডাক্তার খানকে ফোন করায় তিনি তাদেরকে সেন্ট্রাল হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেন। সেখানে তার চিকিৎসাধীনে থেকে তারা কয়েকদিনের মধ্যে সেরে উঠল। তার মৃত্যুর পর এসব কথা খুব মনে পড়ছে। তিনি যে কীভাবে অসুস্থ শিশুদের ভরসাস্থল ছিলেন এটা শুধু এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই নয়, তার সমগ্র জীবনের কাজ থেকেও ভালোভাবে বোঝা যায়।
ডাক্তার এম আর খান শুধু ধরাবাঁধা চিকিৎসা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন না। শিশুদের জন্য চিকিৎসা কেন্দ্রের যে কত অভাব এটা উপলব্ধি করে তিনি একাধিক শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজের টাকা দিয়ে গড়ে তোলেন ডাক্তার এম আর খান-আনোয়ারা ট্রাস্ট। দুস্থ মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, তাদের আর্থিক-সামাজিক উন্নয়নে এই ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। পরে তার উদ্যোগেই গড়ে ওঠে জাতীয় শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন। এ ছাড়াও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। তার বাড়ি সাতক্ষীরায়। সেখানেও তার উদ্যোগে গঠিত হয়েছে সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতাল। তাছাড়া যশোর শিশু হাসপাতাল, সাতক্ষীরা ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্ট্রার। তার গ্রাম রসুলপুরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন রসুলপুর উচ্চ বিদ্যালয়। এ ছাড়া তার উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে উত্তরা উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতাল, চাইল্ড হার্ট ট্রাস্ট, নিবেদিতা নার্সিং হোম। একজনের পক্ষে এতগুলো চিকিৎসা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকা কীভাবে সম্ভব হলো, এটা ভাবলে অবাক হতে হয়। তাছাড়া একজনের চিত্তে মানবতাবোধ কী পরিমাণে থাকলে তার পক্ষে এটা সম্ভব, এটাও এর থেকে বোঝা যায়।
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা যেখানে নির্মমভাবে অবহেলিত, যেখানে চিকিৎসকদের অনেকের মধ্যে অর্থ লোভের পরিচয় বিশ্রীভাবে পাওয়া যায়, ডাক্তার এম আর খান তার ধারে-কাছেও ছিলেন না। চিকিৎসাকে মানবসেবার কাজ বলা হয়। এই মানবসেবার যে নিদর্শন ডাক্তার এম আর খান এই হতভাগ্য দেশে রেখে গেছেন, তার কোনো তুলনা আর দেখি না।
৭.১১.২০১৬
সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল