আমাদের প্রবাসী প্রজন্ম

বিজয়ের মাস

প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৬

মুহম্মদ জহিরুল আলম সিদ্দিকী

এক যুগের বেশি সময় ধরে বিদেশে বসবাস করছি। এই দীর্ঘ সময়ের বেশিরভাগ কেটেছে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক গণ্ডিতে। মূলত পিএইচডি গবেষণায় শিক্ষা ছুটিতে থাকা অথবা নতুন ইমিগ্র্যান্ট হওয়া এক দল তরুণ-তরুণীর সঙ্গে। প্রবাস জীবনের শুরু থেকেই একটি বিষয় আমাকে খুব বেশি ভাবিয়ে তোলে। আমার যে বন্ধুকে সেই হাই স্কুল জীবন থেকে চিনি, যাকে আমি কোনোদিন ধর্ম-কর্ম বা ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে শুনিনি, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল, মৌলবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে যে ছিল সবচেয়ে সোচ্চার, সে বিদেশে এসে ধর্মীয় রাজনীতির সঙ্গে কীভাবে জড়িয়ে যায়_ এটি আমাকে খুব ভাবিয়ে তোলে। তবে পেছনের কারণটি খুব যে কঠিন তা কিন্তু নয়। ২০০১ সালে বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে একটি বিশেষ দল খুব শক্ত অবস্থান পেয়ে যায়। তারা দেশ-বিদেশে ডালপালা বিস্তারে তখন থেকেই খুব সক্রিয়। গত কয়েক বছরে আমাদের প্রবাসী কমিউনিটিতে যেভাবে এদের অবস্থান শক্ত হচ্ছে, তা দেখে আমি মাঝেমধ্যে খুব শঙ্কিত হয়ে যাই। এর পরও আমাদের ব্রিসবেনে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযথ সম্মানের সঙ্গে উদযাপন করা হয়। পহেলা বৈশাখে এখানে বাঙালিরা এখনও বাঁধভাঙা আনন্দে মেতে ওঠে। আর এসবের মূলে আছে ২২ বছর আগে কিছু দেশপ্রেমিক বাঙালির হাতে গড়া কমিউনিটি সংগঠন_ ব্রিসবেন-বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন।
১৭ ডিসেম্বর ব্রিসবেনের দারা বউলস ক্লাবে শ'তিনেক বাঙালি জড়ো হয়েছিলেন বিজয় দিবস উদযাপন করতে। ১৬ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ১৭ ডিসেম্বরে বিজয় দিবস উদযাপনের কারণটি খুব সোজা। এখানে আমরা সবাই ওয়ার্কিং ক্লাস। কমবেশি সবাইকেই রুটি-রোজগারের জন্য সারা সপ্তাহ কাজ করতে হয়। উইকেন্ড ছাড়া কয়েক ঘণ্টার জন্য কোথাও যাওয়া অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব। এত ব্যস্ততার মধ্যেও বাংলাদেশ-পাগল ব্রিসবেন-বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরেফিন ভাই সব জাতীয় দিবসেই ভালো একটি অনুষ্ঠান উপহার দেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কয়েকটি সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে কাজ করার সূত্রে জানি, এ রকম অনুষ্ঠান করতে কেমন বেগ পেতে হয়। তার মধ্যে যদি কোয়ালিটি শিল্পী বা পারফর্মারের অভাব থাকে তাহলে আয়োজকদের কী পরিমাণ দুর্ভোগে পড়তে হয় তা সহজেই অনুমেয়।
ব্রিসবেনে বাঙালিদের অনুষ্ঠানে আগে যেটি দেখা যেত না, ইদানীং ঘন ঘন দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতির অনেক নেতা কমিউনিটির এসব অনুষ্ঠানে আসেন। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন লোকাল এমপি মিল্টন ডিক। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের তুখোড় সংস্কৃতি কর্মী বিপু এবং অ্যাসোসিয়েশনের সাংস্কৃতিক সম্পাদিকা তুলি নূরের প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় প্রথমেই আরেফিন ভাই তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে চমৎকারভাবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরলেন। মিল্টন ডিক বাঙালিদের প্রয়োজনে তার পক্ষ থেকে সব রকম সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। তাকে বাঙালিদের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে ধন্যবাদ জানাল আমাদের ছোট্ট সাহার।
মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে। পিনপতন নীরবতা। জাতীয় সঙ্গীত শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সবাই দাঁড়িয়ে গাইছে_ আমার সোনার বাংলা...। ৭-৮ বছরের কয়েকটি শিশুকেও দেখলাম তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে গলা তুলে জাতীয় সঙ্গীত গাইছে। জাতীয় সঙ্গীত শেষ হওয়ামাত্র কমিউনিটির অতি পরিচিত একজন বললেন, এ গানটি শুনলে এখনও কেমন জানি লাগে! শরীরের রক্ত টগবগ করে ওঠে; কী বলেন ভাই? আপনার হয় না? আমি কিছুই বললাম না। হাসলাম। তাকে আমি কীভাবে বলি যে শুধু এই গান না; স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানসহ যে কোনো দেশের গান শুনলে বুকে পাথরের মতো শক্ত কিছু একটা জমে যায়। গলা ভারি হয়ে আসে। চোখ টলটল করে ওঠে।
গান শেষ হতেই একটা ভিডিও দেখলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে বায়ান্ন থেকে শুরু করে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে নিয়াজির সারেন্ডারের ইতিহাস সংক্ষেপে দেখানো হয়েছে। এ রকম ভিডিও দেখতে আমার ভালো লাগে না। দেখলেই একাত্তরের যত ইতিহাস জানি, মনে পড়ে যায়। স্বাধীনতার এত বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভেতরে হাঁটা শুরু করি। মার্চের উত্তাল দিলগুলো, ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ডাক, দেশব্যাপী গেরিলা যুদ্ধের খণ্ডচিত্র, রাজাকারদের তাণ্ডব, হানাদার বাহিনীর পাশবিক ধ্বংসলীলা, নদীতে ভাসমান লাশ, ধর্ষিত বীভৎস কোনো বোনের চেহারা চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু আজ ভালো লেগেছে। বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন_ তা খুব সঠিকভাবে দেখানো হয়েছে। জয় বাংলা স্লোগান দেখানো হয়েছে। চারদিকে ইতিহাস বিকৃতির যে ধারা শুরু হয়েছে সেখানে এ উদ্যোগটি খুব প্রশংসার দাবি রাখে। ইতিহাস তো ইতিহাসই। 'জয় বাংলা' কোনো সাংগঠনিক শব্দ নয় । এটি আওয়ামী লীগের শব্দ নয়। এটি দেশপ্রেমের শব্দ। এই 'জয় বাংলা' মুখে ও বুকে ধারণ করেই লাখ লাখ বীর বাঙালি দেশের জন্য হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
আমার কাছে যে কোনো জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে ভালো লাগে শিশুদের অংশগ্রহণ। এবারও দেখলাম অনেক শিশু অংশগ্রহণ করেছে। কেউ গেয়েছে কবিতা, কেউ করেছে নাচ। ৫-৭ বছরের শিশুদের আপন মনের কবিতা অথবা গানের তালে নাচ কার না ভালো লাগে! একটি শিশু, যে জন্মেছে বাংলাদেশের বাইরে, যার সঙ্গে বাংলাদেশের আলো-বাতাসের কোনো পরিচয় নেই, বাংলাদেশকে চিনেছে বাবা-মায়ের দেশ বলেই, বাংলা ভাষাকে জেনেছে বাবা-মায়ের ভাষা বলেই; সেই শিশুদের আবৃত্তি শুনে, নাচ দেখে কেমন জানি স্তব্ধ হয়ে যাই! দেশের কথা তখন খুব মনে পড়ে। শৈশবের প্রভাতফেরির কথা মনে পড়ে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সব অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে। রক্তে কিসের যেন আলোড়ন অনুভব করি! দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়। আমার ধরণা, শত চেষ্টা করেও এদের পারফর্ম্যান্সের শতভাগের ১ ভাগ পারফর্মও আমি বা আমাদের বয়সীরা শৈশবে করিনি ।
বিদেশে ভালো অনুষ্ঠান করতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো ভালো মানের শিল্পী খুঁজে পাওয়া। আমাদের ব্রিসবেনে এদিক দিয়ে তুলনামূলক কম বেগ পেতে হয়। এদিনের অনুষ্ঠানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হলভর্তি মানুষকে এক সময়ের তুখোড় সংস্কৃতিকর্মী বিপু ও আমাদের কমিউনিটির প্রিয় মুখ অবনী, নীলা, শিল্পী একে একে মাতিয়ে রাখলেন ঘণ্টাখানেক। অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদিকা তুলি নূর রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় বৌ-শাশুড়ির যে চিরায়ত ঝগড়া দেখালেন, তা দেখে আমি বুঝতেই পারছিলাম না_ এটা অভিনয়, নাকি সত্যি!
আমাদের ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে ভিন্ন আকাশের নিচে, ভিন্ন আলো-বাতাসে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক একটা বৈপরীত্য তাদের আছে। কিন্তু এসব অনুষ্ঠানে একটা বিষয় আমাকে নাড়া দেয়। সব বাবা-মায়ের সঙ্গেই ছোট শিশুরা আসে। নাচ-গান-আবৃত্তিতে অংশও নেয়। তাদের সবার বয়সই ১০ বছরের নিচে বা এর কাছাকাছি। এদেশে বেড়ে ওঠা ১৮ বা ২০ বছরের বেশি বয়সের কাউকে অনুষ্ঠানে দেখা যায় না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা, অসাম্প্র্রদায়িক বাংলাদেশের কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা, ৩০ লাখ প্রাণ ও দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার কথা, পাকিস্তানিদের দ্বারা নির্যাতিত হওয়ার সঠিক ইতিহাস, খেটে খাওয়া মানুষের সংগ্রামের কথা, আমাদের গর্বের বিষয়, ঘৃণার বিষয় এ প্রজন্মের কাছে এসব অনুষ্ঠান দিয়ে খুব সহজে পেঁৗছানো যায়।
বিজয় দিবসে দেখেছি শত শত শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী তাদের তুলতুলে গালে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা এঁকে চারদিকে চষে বেড়াচ্ছে। মনের আনন্দে একের পর এক তারা বিজয় দিবসের ইভেন্টে অংশ নিচ্ছে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। লাল-সবুজের সরল সি্নগ্ধ পতাকা তাদের নিষ্পাপ মুখের জমিনে কী দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছিল! এই সি্নগ্ধতায় আমাদের মেয়ে রিদা, তার বন্ধু সাহার বা তাদের আর শত বন্ধু বেড়ে উঠুক।
বিজ্ঞানী ও শিক্ষক, গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া