'গুঁড়া দুধের' ব্যবসায় লস ও ইসলামী ব্যাংকিং

সাম্প্রতিক

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০১৭      

ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী

কয়েক বছর আগে ইসলামী ব্যাংকের এক গ্রাহকের কাছ থেকে একটি অদ্ভুত ধরনের সমস্যার কথা জেনেছিলাম। তিনি গুঁড়া দুধ আমদানি করেছিলেন। এ জন্য ঋণ গ্রহণ করেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে। ব্যবসার নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ নিয়ে আমদানি করা পণ্য জমা থাকে ঋণদাতা ব্যাংকের হেফাজতে। আমদানিকৃত গুঁড়া দুধের গুণমান নিয়ে সংশয় দেখা দিলে মামলা হয় এবং এর নিষ্পত্তি হতে প্রায় তিন বছর চলে যায়। সর্বোচ্চ আদালতের রায় যায় আমদানিকারকের পক্ষে। আদালত রায়ে এটাও বলেন_ এ দুধ বাজারজাত করা যেতে পারে, যদি মেয়াদ অতিক্রান্ত না হয়।
প্রচলিত ধারার ব্যাংক হলে আমদানিকারকের কাছে তারা ঋণ ও সুদ দাবি করত। ব্যবসায়ে লাভ কিংবা লোকসান যা-ই হোক না কেন, কেউ ঋণ নিলে তা মেয়াদান্তে ফেরত দিতে হবে এবং এ জন্য নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করতে হবে। কিন্তু ইসলামী ব্যাংক শরিয়া ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। তারা ঋণগ্রহীতার কাছে সুদ নয়, বরং মুনাফার অংশ দাবি করে থাকে। কিন্তু উলি্লখিত ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী গুঁড়া দুধ আমদানি করে লাভ করেননি; পুরোটাই লোকসান গেছে। কারণ যে দুধ তিনি আমদানি করেছিলেন, প্রায় তিন বছর মামলা চলার সময় তার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়; মামলা চালাতে ব্যয় হয়ে গেছে প্রচুর অর্থ। সময়ও ব্যয় হয়েছে। এ জন্য ক্ষতি হয়েছে আমদানিকারকের। শরিয়া ভিত্তিতে ব্যাংক পরিচালিত হলে লাভের অংশ ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা ভাগাভাগি করে নেবেন। আর লোকসান হলে তার দায়ও দু'পক্ষের। কিন্তু বাংলাদেশে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো কি এ নিয়ম অনুসরণ করে? বিষয়টি নিয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এ নিয়ম হুবহু অনুসরণ করতে গেলে বাংলাদেশে ব্যবসা করা কঠিন হবে। কারণ তখন ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আমদানিকারক, রফতানিকারক_ তাদের অনেকেই লোকসান দেখাবে। ফলে ব্যাংককেও লোকসানের বোঝা টানতে হবে।
এ কারণে এ ধরনের ব্যাংক মুনাফা বা লোকসানের বণ্টন নয়; ঋণগ্রহীতার জন্য একটি নির্দিষ্ট অর্থ আগেভাগেই ঠিক করে দেয়।
আলোচ্য ঋণের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করতে হবে। ঋণ নিয়ে যে ব্যবসায়ী দুধ আমদানি করেছিলেন সেটা বাজারজাত করতে পারেননি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে। কিন্তু এ জন্য তার কোনো দায় ছিল না। তিনি মামলায় পড়েছিলেন এবং রায় গেছে তার পক্ষে। তাহলে ঋণের আসলের অর্থের দায় কেন তার ওপর বর্তাবে? ইসলামী শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যবসায় ব্যবসায়ী ও ঋণদাতা ব্যাংকের চুক্তি হয়। লাভ হলে দু'পক্ষ মুনাফা বণ্টন করবে। লোকসান হলে তার দায়ও দু'পক্ষের। যদি নিম্নমানের দুধ আমদানির বিষয়টি প্রমাণিত হতো তাহলে দায় বর্তাত কেবল আমদানিকারকের। কিন্তু আদালত রায় দিয়েছেন_ আমদানিকারকের কোনো দায় নেই।
শরিয়াভিত্তিক আরেকটি ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক পাঠানো নিয়ে সংবাদপত্রে একটি প্রতিবেদন দেখেছিলাম। ব্যাংকটি সম্পর্কে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেসব নিয়ে অনুসন্ধানের জন্য একটি টিম প্রেরণ করে। ওই দলে ছিলেন একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তখন একটি পত্রিকা বিষয়টির সমালোচনা করে লিখেছিল, 'ইসলামী ব্যাংকে হিন্দু পরিদর্শক!' বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এর উত্তরে বলেছিলেন, আমরা বিভিন্ন ব্যাংকে অডিটর পাঠাই; হিন্দু বা মুসলিম নয়। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নতুন চেয়ারম্যান আরাস্তু খান দায়িত্ব গ্রহণের দিন বলেছেন, এ ব্যাংকে এখন থেকে যে কোনো ধর্মের অনুসারীই চাকরি করতে পারবেন, যদি তিনি যোগ্য হন। তিনি ব্যাংকের নিয়ম ও বিধিবিধান অনুসরণ করে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন কি-না, সেটাই হবে বিবেচ্য। তার এ মন্তব্য থেকে স্পষ্ট_ ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ব্যাংকে এ ক্ষেত্রে এতদিন ব্যত্যয় ঘটেছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এখন দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংক হিসেবে গণ্য হচ্ছে। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির মুদারাবা সঞ্চয়ী জমা ছিল ২৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা, মুদারাবা মেয়াদি জমা ছিল ১৯ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। অন্যান্য মুদারাবা জমা ১৬ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন ঘটার পর ব্যাংকটি নিয়ে গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শুরু থেকেই আমরা জেনেছি, এ ধরনের ব্যাংক সুদভিত্তিক নয়; লাভ-লোকসান ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। এ ধরনের ব্যাংকিং কতটা সম্ভব_ সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্টরা যে ধর্মের নাম ব্যবহার করছেন_ সেটা স্পষ্ট। শোনা যায়, কোথাও কোথাও মসজিদের খুতবায় ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। আর্থিক খাতের কোনো কোনো বিশ্লেষক এটাও বলেন, ব্যাংকটির যে রমরমা অবস্থা, শরিয়া ভিত্তিতে পুরোপুরি পরিচালিত হলে সেটা সম্ভব হতো না। শুরুতেই বলেছি, তারা ঋণগ্রহীতার জন্য লাভ বা লোকসানের বণ্টন নয়, একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ আগেই নির্ধারণ করে দেয়। তারা আমানত সংগ্রহেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে। ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, তফসিলি ব্যাংকগুলো আমানত বা জমা গ্রহণের ক্ষেত্রে আগেভাগেই একটি অঙ্ক সুদ হিসেবে নির্ধারণ করে দেয়। ইসলামী ব্যাংকও একই কাজ করে ভিন্ন নামে। তারা আমানতকারীদের বলে না_ ব্যাংকের লোকসান হলে আপনারা আমানতের জন্য জমা করা অর্থের বাড়তি কিছু পাবেন না। তারা ব্যবসায়ের জন্য ধর্মীয় অনুশাসনের ওপর জোর দেয়। কিন্তু বাস্তবে অন্যান্য তফসিলি ব্যাংকের সঙ্গে
ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম পদ্ধতিতে তেমন পার্থক্য টানা যাবে না।
আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। ইসলামের অনুশাসন তারা অনুসরণ করেন। সুদ ইসলামে হারাম। যখন কোনো ব্যাংক থেকে বলা হয়_ তারা হারাম ব্যবসা করেন না, বরং হালাল ব্যবসা করেন, তখন ব্যাংকিং লেনদেনে আগ্রহী অনেকেই তাতে এ ধরনের ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনে আগ্রহ বোধ করেন। এ ব্যাংকের মালিকানার ৬৩ শতাংশের বেশি এসেছে দেশের বাইরে থেকে। তবে অনেক লোকের মধ্যে ধারণা রয়েছে_ ইসলামী ব্যাংক জামায়াতে ইসলামীর ব্যাংক। এ দলের একাধিক শীর্ষ নেতা ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালন করার কারণে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। এটাও জনশ্রুতি_ জামায়াতে ইসলামী কিংবা তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না হলে এ ব্যাংকে চাকরি পাওয়া কার্যত অসম্ভব। নতুন পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টি নিশ্চয় খতিয়ে দেখবে। ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি-সিএসআর তহবিলের অপব্যবহার হয়েছে কি-না, সেটা খতিয়ে দেখার কথা বলেছে।
এটা ঠিক যে, ইসলামী ব্যাংকের আমানত ও ব্যবসা ক্রমাগত বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অনেকেই এ ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠায়। এ জন্য ব্যাংকটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক চালু করতে পেরেছে। সন্দেহ নেই, সেবার মান উন্নত রাখার কারণেই এ অর্জন সম্ভব হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের আমলে এ ধারা অব্যাহত থাকবে, সেটাই কাম্য। একই সঙ্গে বলব, ব্যাংকটি শরিয়া ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষিত ধারা পুরোপুরি অনুসরণ করুক, যাতে দুই ধারার ব্যাংকের মধ্যে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হয়। এখন যা চলছে তাতে কিন্তু প্রচলিত ধারার ব্যাংকিংয়ে যুক্তদের প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং আরও কয়েকটি ব্যাংক ধর্মীয় অনুভূতি কাজে লাগিয়ে ব্যবসা করছে।
শুরুর দিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে সরকারের কিছু শেয়ার ছিল। বিএনপির শাসনামলে তা হস্তান্তর হয়ে যায়। এখন তা পুনর্বহাল হয় কি-না, সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকব। সরকারের শেয়ার কাদের হাতে গেছে এবং কী প্রক্রিয়ায়, সেটারও তদন্ত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে ব্যাংকিং ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষণীয়, এখানে কোনো ব্যাংক সমস্যায় পড়লেও আমানতকারীদের স্বার্থ কখনও ক্ষুণ্ন হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এ জন্য কৃতিত্ব পাবে। ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পরও তাই আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার কারণ নেই।
মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)