মিরপুরের মুক্তিদাতা

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০১৭

ডা. এম এ হাসান

৩০ জানুয়ারি মিরপুর মুক্তি দিবস পালিত হয়। ১৯৭২-এর এদিনে মিরপুরকে মুক্ত করতে গিয়ে লে. সেলিমসহ সামরিক বাহিনীর ৪১ জন সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ৪১ দিন পর মুক্ত বাংলাদেশের বুকের কোণে অবরুদ্ধ মিরপুরে দলছুট পাকিস্তানি সেনাসহ আলবদর বাহিনী তথা বিহারি মুজাহিদ কর্তৃক আত্মসমর্পণ চুক্তি ও জেনেভা কনভেনশন ভঙ্গ করে বাঙালি সেনাদের ওপর আক্রমণ করে। পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের মাটিতে পরাভূত হওয়ার পরও এ দেশকে তাদের করায়ত্ত রাখার জন্য যে অশুভ পরিকল্পনা ও অভিলাষ পোষণ করছিল, মিরপুরে সংঘটিত ঘটনা ছিল তারই একটি প্রমাণ।
শহীদ লে. সেলিম ১৯৪৮ সালে যশোরের অভয়নগরের চিকিৎসক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শৈশব থেকেই গণিতে ছিল অসাধারণ মেধা। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আগে তিনি রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যয়নরত ছিলেন। সেখানে তিনি কেবল একজন আপসহীন ছাত্রনেতাই ছিলেন না, একজন অসাধারণ অ্যাথলেট ও কৃতী খেলোয়াড় হিসেবে কলেজ ও বিভাগীয় পর্যায়ের অধিকাংশ ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন।
১৯৭১-এর জুনের শেষে এবং জুলাইয়ের শুরুতে শহীদ লে. সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসান প্রথম শর্ট কোর্স গ্রহণ করেন এবং ৯ অক্টোবর ১৯৭১ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। জুলাইয়ের শেষে ভারতে যে ৬১ জন অফিসারকে ট্রেনিং দেওয়া হয় তাদের মধ্যে মেধা তালিকায় শীর্ষদের মধ্যে স্থান করে নেন শহীদ লে. সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসান। অক্টোবরের ১৮ তারিখে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলে যোগ দিয়ে শহীদ লে. সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসান ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদকে নিয়ে বেলোনিয়া যুদ্ধে শরিক হন। ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ আখাউড়া যুদ্ধে লে. বদি শহীদ হলে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গলের ব্রাভো কোম্পানির দায়িত্ব নেন সেলিম।
শহীদ লে. সেলিম এমন এক মায়ের সন্তান যার স্বপ্নে ছিল দ্রোণাচার্যের মতো এক সাহসী যোদ্ধা। মেধা, বুদ্ধি, ক্রীড়া কৌশল, সাহস, শৌর্য ও বীর্যে অপূর্ব হওয়া সন্তান তার নানা কাজের মাঝে জয় করে নেয় সবার প্রাণ। ১৯৭২-এর ৩০ জানুয়ারি অকালে সমাপ্ত হলো অসাধারণ সম্ভাবনাময় এক অভিযাত্রা।
সেলিম তখন বঙ্গভবনে থাকতেন। সহযোদ্ধাদের নিয়ে ৩০ জানুয়ারি সকালে মিরপুর যান। ওই দিন সকাল থেকেই মিরপুর উত্তপ্ত ছিল। প্রতি রাতে সেখান থেকে গোলাগুলির আওয়াজ পাওয়া যেত। ৯ মাস ধরে মিরপুর ছিল অবাঙালিদের মিনি ক্যান্টনমেন্ট। প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র মজুদ ছিল। হানাদাররা এই অস্ত্রশস্ত্রের বলেই অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সেলিম গুলিবিদ্ধ হলে নিজের গায়ের শার্ট খুলে ক্ষতস্থান বেঁধে নেন। তার সহযোদ্ধারা বলেছিল, 'স্যার, আপনি আমাদের ফেলে যাবেন না।' সেলিম প্রতিজ্ঞা করে বলেছিলেন, 'আমার গায়ে একবিন্দু রক্ত থাকতে তোমাদের ফেলে যাব না।'
মুক্ত হলো মিরপুর। মিরপুর মুক্তিদাতা লে. সেলিম মোহাম্মদ কামরুল হাসান এভাবেই শেষ করলেন নিজের জীবন। বিকেলের দিকে জীবিত সেনাদের নিয়ে কালাপানির ঢালের কাছে তিনি দাঁড়িয়েছেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ফ্যাকাশে ও ক্লান্ত। সবাইকে উৎসাহ জুগিয়েছেন বিল পার হয়ে ক্যান্টনমেন্টের দিকে যেতে। নিজে পানিতে নামেননি। ক্লান্ত শরীরটা একটি গাছের আড়ালে রেখে একটা একটা করে গুলি চালাচ্ছিলেন ঘাতকের দিকে। কভার ফায়ার দিয়ে সহযোদ্ধাদের সরে যেতে সাহায্য করছিলেন। হয়তো ভাবছিলেন জবরহভড়ৎপবসবহঃ আসবে। সেদিন রাতে মেঘে ঢাকা চাঁদ ছিল। ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছিল। হয়তো সেলিম আমার কথা, দেশের কথা, সহযোদ্ধাদের সাহায্যের কথা ভাবছিলেন। না কেউ তাকে উদ্ধার করতে যায়নি। ওর প্রতীক্ষা কত দীর্ঘ হয়েছে জানি না। এক সময় আকাশে ওই ফ্যাকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আমার চাঁদ বুঝি বিদায় নিয়েছে পৃথিবী থেকে। তখন ওর স্বপ্নে হয়তো ওর ভাই এবং অজস্র অশ্বারোহী।
প্রাক্তন ও সামরিক অফিসার মুক্তিযোদ্ধা