সাপ ভয়ঙ্কর!

পরিবেশ-প্রতিবেশ

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০১৭      

আব্দুর রাজ্জাক

বিগত কয়েক দিন যাবৎ দৈনিক খবরের কাগজে চার শতাধিক সাপ মারার সংবাদ এসেছে। এ বছরেই যে মানুষ এত বেশি সংখ্যক মেরেছে, তা নয়। প্রতি বছর হাজার হাজার সাপ মেরে ফেলা হচ্ছে। গণমাধ্যমের কারণে এ বছর আমরা ব্যাপারটি জানতে পেরেছি। বিগত কয়েক বছর যাবৎ, বিশেষ করে বর্ষার সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাড়ি কিংবা আশপাশে সাপের উৎপাত বেড়ে যায়। রাতে মানুষ ভয়ে বের হতে পারে না। বন-জঙ্গল ছেড়ে সাপ কি তাহলে মানুষের বাড়িতে বসবাস করতে শুরু করেছে?
এদিকে ২০১৫ সালে স্ট্যানফোর্ড, প্রিন্সটন, ফ্লোরিডা ও মেক্সিকো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক তাদের প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলেছেন, মেরুদণ্ডী প্রাণীরা স্বাভাবিকের চেয়ে ১১৪ গুণ হারে বিলুপ্ত হচ্ছে। ১৫০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ৩৩৮ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। গত দেড় হাজার বছরে ৭৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৪০ প্রজাতির পাখি ও ৩৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। আইইউসিএন-বাংলাদেশ-এর সাম্প্র্রতিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের প্রায় ৩০ শতাংশ বন্যপ্রাণী হুমকির সম্মুখীন। ছয় কোটি ৫০ লাখ বছর আগে অতিকায় ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল নানাবিধ প্রাকৃতিক কারণে, যেটাকে পঞ্চম গণবিলুপ্তি বলা হয়। ফলে গবেষকরা দ্বিধাহীনভাবে দাবি করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা ষষ্ঠতম গণবিলুপ্তির পর্যায়ে রয়েছি এবং এর প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়েছে খোদ মনুষ্য প্রজাতিকে। কেননা, মানুষ নিজেদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে পরিবেশ নষ্ট করছে, বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল ধ্বংস করছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রাণীরা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এটি এতই প্রবল যে, তা আটকানো না গেলে মানুষের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এটাই ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি।
২০১০ সাল থেকে আমি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করছি। ড. রেজা খানের 'বাংলাদেশের সাপ' বইয়ে কত কত সাপের কথা বলেছেন; কিন্তু কয়েকটি প্রজাতি ব্যতীত মাঠ পর্যায়ে খুব কম সাপ দেখেছি। বরং মানুষের কাছ থেকে সাপ মারার গল্প শুনেছি বেশি। অন্য যারা বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করেন, আশা করি তাদের অবস্থাও এ রকম হবে। তাহলে বাংলাদেশের এত সাপ গেল কোথায়? উল্লেখ্য, দেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপের মধ্যে ২৭ প্রজাতি বিষাক্ত, বাকিগুলো বিষহীন। বিষাক্ত সাপের মধ্যে ১৩টি সমুদ্রে বাস করে, বাকিগুলো স্থলে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪-৫টি ব্যতীত অন্যগুলো সিলেট ও চট্টগ্রামের গভীর বন-জঙ্গল ব্যতীত খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু মানুষের কাছে সাপ মানেই আতঙ্ক, সেটি বিষাক্ত হোক কিংবা অবিষাক্ত হোক। সাপ দেখলেই মারতে হবে_ ব্যাপারটা এখন আমরা শুধু বংশপরম্পরায় তা বহন করে যাচ্ছি। যে প্রাণীটি মানুষ এত ভয় পায়, সেটি প্রকৃতিতে থাকার কোনো দরকার আছে? কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে, খাদ্য শৃঙ্খল অটুট রাখতে এদের দরকার আছে। ইঁদুর জাতীয় প্রাণী, পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ সাপের প্রধান খাবার। সাপ এগুলো না খেলে প্রকৃতিতে যে খাদ্য-শৃঙ্খল আছে, সেটি ভেঙে যাবে, বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য আর থাকবে না। আমাদের ধানক্ষেতে দাঁড়াশ বা ঢোঁড়া সাপ কত ইঁদুর খায় এবং আমাদের কত টাকা ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়, তা কখনও হিসাব করে দেখিনি। সাপ প্রকৃতিতে যেসব পরিবেশে থাকত, সেগুলো আমরা নিজেদের প্রয়োজনে ধ্বংস করে ফেলেছি এবং প্রতি বছর ব্যাপক হারে সাপ মারায় প্রাকৃতিক পরিবেশে এখন খুব কম সাপ দেখা যায়।
প্রকৃতিতে প্রতিটি প্রজাতিই চায় টিকে থাকতে এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রেখে যেতে। ফলে সাপ খাবারের প্রয়োজনে, প্রজননের সুবিধার্থে বর্ষাকালে মানুষের আবাসস্থলে ঢুকে পড়ে। তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? এমনিতেই মানুষ সাপ দেখলে মেরে ফেলে। আর নিজ বাড়িতে দেখলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। সম্প্র্রতি দেশের একটি দৈনিক পত্রিকাতে প্রকাশিত এক সংবাদ বলছে, বসতবাড়িতে সাপ ঢুকলে মানুষ না মেরে কী করবে? কেননা, দেশে সাপ উদ্ধারকারী দক্ষ লোক নেই। আর উদ্ধার করলেও এগুলোর দায়ভার কেউ নিতে চান না। তাহলে কি আমরা নির্বিচারে সাপ মারব? এভাবে প্রাণী মেরে আর একটি গণবিলুপ্তির দায়ভার কি আমরা নেব? জনসচেতনমূলক অনুষ্ঠান করলে হয়তো নিধন প্রক্রিয়া কিছুটা কমবে। কিন্তু সাপ নিয়ে যে ভয় বংশপরম্পরায় এবং জেনেটিক্যালি আমরা বহন করছি, সেটি কি যাবে? এ জন্য দরকার একটি দীর্ঘস্থায়ী কর্মপরিকল্পনা।
আমরা যারা বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করি তারা সবাই একটি বিষয়ে একমত, উপজেলা বা জেলাভিত্তিক কিছু লোককে সাপ ধরার প্রশিক্ষণ এবং তা ধরে রাখার যন্ত্র সরবরাহ করা প্রয়োজন। শুধু ট্রেনিংপ্রাপ্তরাই নন, বাংলাদেশের উপজেলা বা জেলাভিত্তিক সাপুড়েদের মোবাইল নম্বরসহ তালিকা তৈরি করা হবে। সাপুড়ে ও ট্রেনিংপ্রাপ্ত লোক বা সাপবন্ধুদের যোগাযোগের নম্বর সবার কাছে থাকবে। বাড়িতে সাপ ঢুকলে সাপুড়ে বা সাপবন্ধুদের খবর দিলে তারা সাপ ধরে নিয়ে যাবেন। আশা করি, এমন উদ্যোগ নিলে তা সাপ রক্ষায় হবে একটি কার্যকরী পদক্ষেপ এবং মানুষ যাতে আর সাপের কামড়ে না মারা যায় সেটিও নিয়ন্ত্রণে আসবে। আশা করছি, এ ব্যাপারে বন বিভাগ এবং উপজেলা বা জেলাভিত্তিক কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা এগিয়ে আসবেন; সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষ।
বর্তমানে আমরা রাজশাহীতে এমন একটি কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছি। এ কার্যক্রম প্রত্যেক অঞ্চলে শুরু করা দরকার। তবে সাপ ধরার প্রশিক্ষণ ও সাপ ধরার যন্ত্র সরবরাহ ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। ইতিমধ্যে বন্যপ্রাণী গবেষণা ও সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করেন তাদের অনেকে এগিয়ে এসেছেন। সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে, যদি আমরা মনে করি প্রকৃতি সংরক্ষণে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রাখা দরকার। পরিবেশ ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকব। কেননা, আমরাও প্রকৃতির অন্যান্য প্রজাতির মতোই একটি প্রাণী প্রজাতি। আসুন বন্যপ্রাণী বাঁচাই, পরিবেশ রক্ষা করি।
বন্যপ্রাণী (সাপ ও ব্যাঙ) গবেষক, বন্যপ্রাণী গবেষণাগার, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়