সুস্থ রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকে, বিদ্বেষ নয়

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

এমাজউদ্দীন আহমদ

জনস্বার্থ এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সংগঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রাণবন্ত রাখতে এবং রাজনৈতিক সমাজে উদ্ভূত সমস্যাগুলোর সন্তোষজনক সমাধান আনতেই জন্ম হয়েছে রাজনীতির। অনৈক্যের মধ্যেই রাজনীতির জন্ম, অনৈক্যের মধ্যেই তা বেড়ে ওঠে। কিন্তু রাজনীতি যেহেতু সামাজিক সমস্যা সমাধানমুখী যৌথ কর্ম, তাই এর অস্তিত্ব এবং সাফল্যের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো অনৈক্যের সীমিত মাত্রা। ব্যক্তি, সমষ্টি বা দলের মধ্যে অনৈক্য দেখা না দিলে যেমন রাজনীতির জন্ম হতো না, ঠিক তেমনি ব্যক্তি, সমষ্টি বা দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য যদি অনতিক্রম হয়ে ওঠে, তাহলেও রাজনীতি টিকে থাকে না। তখন সমাজে সৃষ্টি হয় এক ধরনের 'মাৎস্যন্যায়'। তখন শক্তিশালী ও হিংস্র বোয়াল ও হাঙ্গররা ছোটদের গ্রাস করে ফেলে। এ জন্য সুস্থ রাজনীতিতে বিদ্যমান থাকে প্রথমত, অনৈক্যের মধ্যেও কোনো কোনো বিষয়ে ঐকমত্য, যেন ভিন্নমতের ঝড়ো হাওয়ায় জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ বিধ্বস্ত না হয়। দ্বিতীয়ত, সুস্থ রাজনীতির ক্ষেত্রে বিদ্যমান থাকে তীব্র প্রতিযোগিতা; কিন্তু থাকে না বৈরিতা। বরং সুস্থ রাজনীতির প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো রাজনীতিকদের মধ্যে সমঝোতার এক সুদৃঢ় বন্ধন, পারস্পরিক সহিষুষ্ণতার এক সুখদ আবহ, একসঙ্গে মিলেমিশে জাতীয় স্বার্থকে সংরক্ষণের এক দৃঢ় সংকল্প। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিকদের মধ্যে আত্মপ্রত্যয় এবং আত্মবিশ্বাস মণিকাঞ্চনস্বরূপ। জাতীয় স্বার্থের সংরক্ষণ ক্ষেত্রে আপসহীনতা এ কারণে রাজনীতিকদের এক অমূল্য গুণ। তৃতীয়ত, যেহেতু রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো সামাজিক জীবনের সমস্যা সমাধান এবং সমস্যার সমাধান আনয়ন ক্ষেত্রে বল প্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনা-পর্যালোচনা-সমালোচনার প্রাধান্য; তাই রাজনীতিকদের কর্মপদ্ধতি এমনভাবে রচিত হয়, যেখানে পারস্পরিক আলোচনার পরিধি হয় অতি বিস্তৃত। চতুর্থত, সুস্থ রাজনীতি সব সময় অতীতকে ছাড়িয়ে বর্তমানকেন্দ্রিক এবং ভবিষ্যৎমুখী। অতীতে পা রেখে সফল রাজনীতিকরা বর্তমানকে সাজিয়ে থাকেন এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হন।
এ যুগে সুস্থ রাজনীতির আদল নির্ধারিত হয়েছে সমাজের বৃহত্তর জনসমষ্টির সম্মতির ভিত্তিতে, গণতন্ত্রের মৌলিক বিধিবিধানের কাঠামোয়। নির্বাচন প্রক্রিয়া এ কারণে এত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। নির্বাচিত হলেই কিন্তু সরকার গণতান্ত্রিক হয় না। নির্বাচন শুধু রাজনীতিকে গণতন্ত্রের মহাসড়কে টেনে আনে। সরকারকে গণতন্ত্রের অবয়ব দান করে মাত্র। জার্মানিতে হিটলারের সরকারও নির্বাচিত সরকার ছিল। এ দেশেও নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। নির্বাচিত সরকার তখনই গণতন্ত্রের পথে এক পা, দুই পা করে অগ্রসর হয়, যখন তাদের উদ্যোগ প্রবাহিত হয় রাজনৈতিক সমাজে আইনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, ব্যক্তির প্রাধান্যকে ছাপিয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্যকে তুলে ধরার আগ্রহে, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনয়নের আগ্রহে, নির্ধারিত নীতিগুলো বাস্তবায়নকালে বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিতকল্পে, বিশেষ করে সব ধরনের অনুরাগ বা বিরাগ পরিত্যাগ করে জনস্বার্থকে তাদের কর্মের মূল্যায়নের প্রধানত মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার অভিপ্রায়ে। সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতির মৌল অঙ্গীকার হলো রাজনৈতিক ক্ষমতার মালিক জনগণ, রাজনীতিকরা নন এবং রাজনীতিকদের গতিপথের নির্ধারক কোনো নেতার ইচ্ছা বা অনিচ্ছা নয়, বরং দেশের আইন।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনীতি কার্যত বন্দি হয় সংসদে। সংসদ ছেড়ে রাজপথের তপ্ত অঙ্গনে রাজনীতি একবার প্রবেশ করলে তাকে আর সংসদমুখো করা সম্ভব হয় না। এর অনেক কারণ রয়েছে। ক. দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে দুটি বৃহৎ দল। নির্বাচনে তারা অংশগ্রহণ করেন শুধু জেতার জন্য। হারতে তারা শেখেননি। খ. বিভিন্ন চাপের মুখে সংসদে গেলেও জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে আলোচনার পরিবর্তে নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং কারণে-অকারণে সংসদ ত্যাগের মহড়া দিয়ে থাকেন। গ. জাতীয় সংসদে স্পিকারের বিরুদ্ধে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উপস্থাপন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্পিকারের দলপ্রীতি। ঘ. অধিকাংশ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সংসদের বাইরে গ্রহণের উদ্যোগ।
বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ কার্যকর হতে পারে যদি দেশের নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিচর্চার শুভসূচনা হয়। নির্বাচনে আসে গণরায়। এ গণরায়কে অলঙ্ঘনীয় বলে গ্রহণ করার মন-মানসিকতা বাংলাদেশের রাজনীতিকদের মধ্যে প্রাধান্য লাভ করুক_ তা-ই জনগণের প্রত্যাশা। বাংলাদেশে নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রয়োগের ক্ষেত্রে বেশকিছু চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স তৈরি করা অপরিহার্য। এমনিতেই ক্ষমতাসীন দলের একটা ঝোঁক হলো মস্ত বড় মন্ত্রিপরিষদ গঠন করা। এ প্রবণতা সরিয়ে রেখে দক্ষ এবং অভিজ্ঞ নেতাদের সমন্বয়ে একটি ছোট মন্ত্রিপরিষদ গঠন করলে তেমন ক্ষতি হয় না। তাহলে প্রধানমন্ত্রী তার ওপর ন্যস্ত নির্বাহী কর্তৃত্বের বিন্যাস করতে পারেন সহজে। প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হতে পারেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। প্রধানমন্ত্রী সব মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের সমন্বয়কারী হলে, বিশেষ করে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছ হলে নির্বাহী কর্তৃত্ব অনেকটা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় যেভাবে একটি সুপার সচিবালয়ে রূপান্তরিত