চলচ্চিত্র কারখানার মেরুদণ্ড

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

ফাহমিদুল হক

ধরা যাক, নায়করাজ রাজ্জাক বলে কেউ ছিলেন না। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কারখানার চেহারা কেমন হতো সেক্ষেত্রে? একরকম অকল্পনীয় ব্যাপার! এ দেশের চলচ্চিত্র কারখানায় যতটুকু ঋজুতা এসেছিল, তাতে অনেকখানি রাজ্জাকের অবদান ছিল। তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র কারখানার মেরুদণ্ডের মতো, যাকে আশ্রয় করে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটা অবয়ব গড়ে উঠেছিল। ষাটের দশকের শুরুতে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে অভিনেতা হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে থিয়েটার গুরুর পরামর্শে ঢাকায় অভিবাসন করেন তিনি, যদিও তিনি প্রথমত বোম্বে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নতুন শহরে বা ভিন্ন দেশে এসে তাকে প্রথম প্রথম অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্রের পরিচালক আবদুল জব্বার খানের ইকবাল ফিল্মসে তৃতীয়-চতুর্থ সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। কোনো কোনো ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। এর আগে টেলিভিশনেও কাজ করেছেন। স্ত্রী ও শিশুসন্তান নিয়ে নতুন পরিবেশে দারিদ্র্যদশায় পড়তে হয় তাকে। জহির রায়হানের 'বেহুলা' চলচ্চিত্রে প্রথম নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। এই চলচ্চিত্রের সাফল্যের কারণে তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি।
ষাট ও সত্তরের দশকের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক হিসেবে তিনি অধিষ্ঠান ছিলেন, যার রেশ আশির দশক পর্যন্ত ছিল। হয়ে উঠেছিলেন নায়করাজ। নায়ক হিসেবে তিনি ছিলেন সুদর্শন, অভিনয়ে ছিলেন সাবলীল। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের উচ্চকিত অভিনয়রীতিকে মাথায় রেখেই পরিচালক ও চলচ্চিত্র সমালোচক আলমগীর কবির এ দেশের চলচ্চিত্রকে বর্ণনা করেছিলেন 'ক্যামেরা থিয়েটার' হিসেবে। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য যে থিয়েটার বা যাত্রার ঢঙে চেঁচামেচির প্রয়োজন নেই, ইঙ্গিতটা সেদিকেই করা হয়েছে। রাজ্জাকের চলচ্চিত্রগুলোও উপমহাদেশীয় মেলোড্রামাই বটে; কিন্তু তার মধ্যেও তার সাবলীল অভিনয়শৈলী অনেক বাস্তবানুগ ছিল। তরুণ রাজ্জাককে দেখে দর্শকের মনে হতো ঘরের ছোট ভাই বা প্রেমিক রাজ্জাক হয়ে উঠেছিলেন এ দেশের তরুণীদের কাঙ্ক্ষিত পুরুষ আইকন। বাংলাদেশের মহানায়ক তিনি।
জহির রায়হানের চলচ্চিত্র দিয়ে তার অভিনয় শুরু। জহির রায়হানের আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। সে হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রথম দশকে শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রে তার যুক্ততা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ছিল। কিন্তু একজন অভিনেতার তো আর বিশেষ এক ধরনের চলচ্চিত্রে সীমিত থাকলে চলে না। তিনি একদিকে যেমন সুভাষ দত্ত, চাষী নজরুল ইসলামের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, তেমনি কামাল আহমেদ, আজিজুর রহমান, মোহসীন প্রমুখের নির্মিত চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। কবরীর সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় তো কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু শাবানা বা ববিতার সঙ্গে জুটি হিসেবে বহু সফল চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন। নায়করাজ হিসেবে পরিচিত হলেও বিচিত্র চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি, নায়কের গরিমায় আবদ্ধ থাকেননি। 'ছুটির ঘণ্টা'র দপ্তরি, 'রংবাজ'-এর রংবাজ, 'অশিক্ষিত'র গ্রাম্য পাহারাদার, 'কী যে করি'তে মেয়ের দালাল, 'বড় ভালো লোক ছিল'র যুবা সাধক- এ রকম নানা ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করেছেন। আমার খুব মনে পড়ে চাষী নজরুল ইসলামের 'শুভদা' চলচ্চিত্রে সদানন্দ নামে হাসিখুশি স্যাক্রিফাইসিং পার্শ্বচরিত্রে রাজ্জাকের অভিনয়ের কথা। একটা বিরতির পর নব্বই দশকে তিনি চরিত্রাভিনেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। এমনকি কলকাতার টালিগঞ্জেও তিনি নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। তবে উভয় কারখানাতেই সার্বিক পরিস্থিতি অবনতির দিকে ছিল। ফলে এই পর্বে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি বিশেষ কোনো অবদান রাখতে পারেননি। একমাত্র ব্যতিক্রম 'বাবা কেন চাকর' চলচ্চিত্রটি, যা কলকাতায় রিমেক হয়।
এ দেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি প্রযোজনা-পরিচালনায় যুক্ত হবেন না, তা হয় না। স্ত্রীর নামের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে গড়ে তুলেছিলেন রাজলক্ষ্মী প্রডাকশন্স। তার ব্যানারে তিনি অনেক চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন, পরিচালনাও করেছেন বেশ কয়েকটি। রাজলক্ষ্মী প্রডাকশন্স থেকে ২০টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রংবাজ, অনন্ত প্রেম, পাগলা রাজা, চাপাডাঙার বৌ, মৌচোর, সৎ ভাই, বাবা কেন চাকর ইত্যাদি। সবই সুপারহিট চলচ্চিত্র। তার পরিচালিত ১৮টি চলচ্চিত্রের সবগুলোই রাজলক্ষ্মী প্রডাকশন্স থেকে নির্মিত হয়েছে। তার প্রথম পরিচালিত চলচ্চিত্র 'অনন্ত প্রেম' আর পরের দিকের পরিচালিত চলচ্চিত্র 'বাবা কেন চাকর' বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য দুটি চলচ্চিত্র।
ব্রিটিশ চলচ্চিত্র তাত্তি্বক রিচার্ড ডায়ার বলেছেন, তারকাকে তিন উপায়ে বোঝা যায়- এক. নির্মিত ইমেজ হিসেবে; দুই. পণ্য হিসেবে এবং তিন. আদর্শ হিসেবে। রাজ্জাক শেষ জীবনে সভা-সমাবেশে ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আসতেন। কিন্তু তার কর্মময় সময়ে তিনি পণ্য হিসেবে ততটা বিকোননি (ধরা যাক বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবে তাকে দেখা যায়নি, অবশ্য চলচ্চিত্রের পোস্টারের কথা ভিন্ন); কিন্তু প্রযোজনা কোম্পানির বরাতে বা সিনে সাংবাদিকতার মাধ্যমে সুদর্শন রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তাকে নির্মাণ করা হয়েছে। কিছু ব্যতিক্রমী চরিত্র ছিলই; কিন্তু রাজ্জাক বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশেষ ভঙ্গিমার এক্সপ্রেসিভ একজন হ্যান্ডসাম মানুষ, যার দৃষ্টি কিছুটা কৌণিকভাবে সামনের দিকে, যিনি তার প্রেমিকার জন্য সহজ-স্বাভাবিক কিছু প্রেমময় উক্তি উচ্চারণ করবেন_ রাজ্জাকের বেশিরভাগ ইমেজ নির্মাণ এভাবেই করা হয়েছে। রাজ্জাক এক আদর্শও বটে, যার পর্দার ইমেজ দর্শককে বরাবরই প্রভাবিত করেছে। তার প্রতিফলন হয়তো অনুগামী দর্শকের চুলের ছাঁটে পড়েছে অথবা প্রেমিকার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে গিয়ে তরুণের বাচনভঙ্গিতে তার ম্যানারিজম স্থানান্তরিত হয়েছে।
সেই হিসেবে তিনি একজন সত্যিকারের তারকা, একজন নায়করাজ।
চলচ্চিত্র সমালোচক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক