'ছোট কাকু'র সংস্কৃতি সেবার চলি্লশ বছর

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৭

মামুন রশীদ

ফরিদুর রেজা সাগরের সঙ্গে আমার পরিচয় আশির দশকের শুরুতে, যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। ঢাকার যেটি আজকে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম তার পাশে, বায়তুল মোকাররম মসজিদের অপর পাশে 'খাবার দাবার পিঠাঘর' নামে একটি খাবারের দোকান ছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে, '৮২ সালে এরশাদ তথা মজিদ খানের শিক্ষানীতিবিরোধী আন্দোলনের সময় সর্বপ্রথম আমি ওখানে যাই। মূলত পিঠা খাওয়ার জন্যই ওখানে গিয়েছিলাম। তার পর থেকেই মাঝে মধ্যে তাকে ওখানে দেখতাম। তিনি ওই খাবারের দোকানের ক্যাশ কাউন্টারে বসতেন। খুব কম কথা বলতেন। একটা ভারিক্কি চালে চলতেন এবং নীরব থাকতেন। তবে মুখের কোনায় একটি বুদ্ধিদীপ্ত হাসি লেগে থাকত।
তার সঙ্গে আমার সম্মুখ পরিচয় হয় চলচ্চিত্রকার-লেখক তানভীর মোকাম্মেলের মাধ্যমে। তানভীর মোকাম্মেল আমার অগ্রজপ্রতিম, ঘনিষ্ঠ বন্ধুও বটে। আমরা তখন একই সঙ্গে ঢাকার মালিবাগ এলাকায় থাকতাম। আমার বিয়ের সময় তিনিই আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন ইমপ্রেস গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার ফরিদুর রেজা সাগরের সঙ্গে। তখন ফরিদুর রেজা সাগরের ইমপ্রেস ভিডিও আমার ও স্ত্রী ফাহমিদার বিয়ের পুরো চিত্র গ্রহণ করে। আরও বেশি মনে আছে, তারা যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেছে নিয়েছিলেন, সেগুলো ছিল অনবদ্য।
ফরিদুর রেজা সাগর যখন 'চ্যানেল আই' প্রতিষ্ঠা করলেন তার বন্ধুদের নিয়ে, তখন 'চ্যানেল আই'য়ের শুরু থেকেই আমাদের একটি সুযোগ এসে গিয়েছিল এবং তার সঙ্গে শাইখ সিরাজ এমনকি তার আরও যে বন্ধুরা রয়েছেন, তাদের সঙ্গেও আমাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। পরবর্তীকালে 'ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস' এবং অন্য যেসব খাতে তারা কাজ করছেন, সেগুলোর সঙ্গে আমি ব্যবসায়িক সেবা প্রদানে সম্পৃক্ত ছিলাম। তাদের সবার মাঝে একটি বিষয় প্রতীয়মান, তারা সবাই বাংলাদেশকে নিয়ে এগোতে চান। এখানে মূল আলোচ্য বিষয় হলো, ধীরে ধীরে এই ফরিদুর রেজা সাগরকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিকাশে, সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশে মোটামুটি একটা স্টেকহোল্ডার অ্যাপ্রোচ নিয়ে এগোতে দেখেছি। তিনি শিশুতোষ সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০০৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান এবং জনসংযোগ ও সাংবাদিকতায় ২০১৫ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
অনেকের কাছেই 'চ্যানেল আই' শুধু একটি টিভি চ্যানেল নয়; তা সত্যিকার অর্থেই দেশের ভেতরে ও বাইরের লোকজনের জন্য 'হৃদয়ে বাংলাদেশ'। যেমনটি আমি আজকে নিজে বলতে পারি যে, প্রতিদিন সকালবেলা যদি আমি 'গানে-গানে সকাল শুরু' না দেখতে পারি, তাহলে আমার দিনটিই যেন শুরু হতে চায় না। গান ছাড়াও কিছু অনুষ্ঠানের কথা বলতে পারি, যেগুলো সত্যিকারের বাংলাদেশকে তুলে আনছে। শাইখ সিরাজের অনুষ্ঠানটি ছাড়াও ইদানীংকালে ব্রাউনিয়া যে 'স্বর্ণ কিশোরী' নামে একটি অনুষ্ঠান করছে, ওটিও কিন্তু আমাদের সত্যিকার অর্থে ইনক্লুসিভ গ্রোথ কিংবা অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি কিংবা উন্নয়নের ধারাকে সমুন্নত রাখতে কাজ করছে। আজকে 'চ্যানেল আই' রবীন্দ্রসঙ্গীত বলুন, নজরুলসঙ্গীত বলুন, পল্লীগীতি বলুন, বিভিন্ন গানের প্রতিযোগিতা বলুন, বিবিসির সঙ্গে একজোট হয়ে অনুষ্ঠানের কথা বলুন, তৃতীয় মাত্রার কথা বলুন- এ সবকিছুরই এক মিলন মেলা। বিভিন্ন জায়গায় শিল্পী, কলাকুশলী, সাহিত্যিক বা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমাদের যে জীবনাচরণ, আমাদের যে উত্তরণ; তেমনটি রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে, নজরুলকে কেন্দ্র করে, আমাদের দেশের গানকে কেন্দ্র করে মোটামুটি সংস্কৃতির একটি আধার কিংবা ধারক-বাহক হয়ে দাঁড়িয়েছে এই 'চ্যানেল আই' কিংবা এ প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান কর্ণধার ফরিদুর রেজা সাগর। তিনিই মূলত এটিকে পেছন থেকে ধরে রেখেছেন, এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
আমি এক সময় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'চ্যানেল আই'তে এত লোক কেন? আপনারা অনেকেই জেনে থাকবেন, আমরা যারা ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনা করেছি কিংবা ফাইন্যান্সে পড়াশোনা করেছি, সব সময় 'অপটিমাম ক্যাপাসিটি মডেলিং'-এর কথা বলি। কিন্তু ফরিদুর রেজা সাগরকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, এত লোক কেন ঘোরাঘুরি করছে এখানে? আপনার কি এত লোক দরকার 'চ্যানেল আই'তে কিংবা 'রেডিও ভূমি'তে, যেটা তারা নতুনভাবে শুরু করেছেন। তিনি তখন মুচকি হেসে বললেন, থাকুক না আমাদের ধরে। আমরাও বেঁচে থাকি, ওরাও বেঁচে থাকুক। এই যে নেতৃত্বের একটি গুণাবলি, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোনো, এটি কিন্তু বাংলাদেশে আস্তে আস্তে বিরল হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে 'প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি' পরিচালিত হচ্ছে, বেসরকারি খাত আস্তে আস্তে কর্ণধারের ভূমিকায় চলে আসছে। চ্যানেল আই কিংবা ফরিদুর রেজা সাগরের সব প্রতিষ্ঠানই ব্যক্তি খাতের। তার পরও তার মধ্যে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নেতৃস্থানীয় একটি গুণ দেখতে পেয়েছি।
অনেকে হয়তো জানেন না, ফরিদুর রেজা সাগর শিশুতোষ সাহিত্য, শিশুদের নিয়ে লেখালেখি করেন। তার ওই 'ছোট কাকু' সিরিজ (যদিও তিনি হাস্যোচ্ছলে প্রায়ই বলেন, ছোট কাকু'র স্রষ্টা আফজাল হোসেন) আমার খুবই মজা লাগে। 'ছোট কাকু' সিরিজের বইগুলো পড়ে খুবই অভিভূত হয়েছি। তিনি যে চুপচাপ একটি মুচকি হাসেন, অত্যন্ত ভারী একটি চশমা ব্যবহার করেন, তার ভেতরে অত্যন্ত হাস্যরসোজ্জ্বল, চটুল, চপল একজন 'ছোট কাকু' রয়েছে। তার বয়স যা-ই হোক না কেন, এই 'ছোট কাকু'কে তার বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
ফরিদুর রেজা সাগরের পরিবারের সঙ্গেও আমার কমবেশি সখ্য রয়েছে। তার স্ত্রী একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ। তাদের মেঘনা ও মোহনা নামে দুই মেয়ে রয়েছে। তাদের একজন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে পড়েছে। তাদের সঙ্গেও আমি কথা বলেছি। তারা অত্যন্ত প্রগলভ, সপ্রতিভ এবং সহজ-সরলভাবে চলে। এ সবকিছু মিলিয়ে ফরিদুর রেজা সাগর একজন লেখক; একজন বাঙালি সংস্কৃতির বাহক। এ দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, একজন সংগঠক- সর্বোপরি একজন ভালো বন্ধু, ভালো ভাই, ভালো স্বামী, ভালো বাবা এবং সবার ওপর সত্য হচ্ছে- তার হৃদয়ে সর্বদাই 'বাংলাদেশ'।
ব্যাংকার, অর্থনীতি বিশ্লেষক