সৎ জীবনের প্রতিকৃতি

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭      

মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী

চট্টগ্রামের কৃতী সন্তান মাস্টার রুহুল আমীন চৌধুরী। জনসেবা এবং শিক্ষকতায় একই সমান্তরালে নিবেদিতপ্রাণ এক ব্যক্তিত্ব, যার জীবন ও কর্ম সততার অনুপম দৃষ্টান্ত। রাউজান 'আরআরএসি ইনস্টিটিউশন' সমসাময়িক সময়ে খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল, যে প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ৩০ বছর তিনি ভূগোল শাস্ত্রে বিশাল পান্ডিত্য নিয়ে জ্ঞান বিতরণ করেছেন। ভূগোল শাস্ত্রে তার পান্ডিত্য ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ভূগোল পড়াতে গিয়ে মানচিত্রের দিকে তার দৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হতো না। শিক্ষকতার বাইরে তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দীর্ঘ ৩২ বছর জনসেবা ও সুশাসনের অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তার পরিশ্রম ও পৃষ্ঠপোষকতার ফসল ইয়াসিননগর জুবিলি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জানিপাথার বিদ্যালয় এবং জুবিলি ঈদগাহ মাঠ। তিনি বন-জঙ্গলে ভরা হলদিয়া ইউনিয়নে চোর-ডাকাত এবং বন্য জীবজন্তুর উপদ্রব বন্ধ করে বসবাস উপযোগী করেন। অনেক দাগি অপরাধীকে পাকড়াও করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করেন। জনগণ রুহুল আমীন চৌধুরীর আমলে নির্বিঘ্ন ও নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারত। তার প্রাণনাশের চেষ্টাও করা হয়েছিল, কিন্তু এলাকাকে অপরাধমুক্ত করে তিনি মানুষের প্রিয় পাত্রে পরিণত হন। তার কাছে মানুষ বিচার পেয়েছে; কিন্তু বঞ্চিত হয়নি এবং শান্তি পেয়েছে, অবহেলা পায়নি। তার কঠোর মনোভাব ও দৃঢ়চেতা সিদ্ধান্তে অপরাধীরা প্রকল্ফিপত থাকত। নেতৃত্বের অহংবোধ কিংবা পান্ডিত্যের আত্মম্ভরিতামুক্ত ছিলেন তিনি। ব্রিটিশ সরকার সুশাসনের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে জুরি বোর্ডের সদস্য নিযুক্ত করেন। জুরি বোর্ডেও তার বিচারিক ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। তখনকার দিনে জুরি বোর্ডের সদস্য হওয়ার জন্য যথেষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতার মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে হতো। আজ থেকে ৯০ বছর আগে ১৯২৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রিত করে সুশাসনের স্বীকৃতি হিসেবে সনদপত্র, ঘড়ি ও সোনার আংটি উপহার দেন। ১৯২৯ সালে মাত্র ৭০ টাকা বেতনে শুরু হয় তার শিক্ষকতা জীবন। প্রতিদিন ৬ মাইল হেঁটে তিনি রাউজান স্কুলে আসা-যাওয়া করতেন। তিনি গ্র্যাজুয়েশন লাভ করেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। অনন্য মেধাবী না হলে এ কলেজের ছাত্র হওয়া কঠিন বাস্তবতা। তার ইচ্ছা ছিল আইন শাস্ত্রে উচ্চতর পড়াশোনা করা; কিন্তু ভারত বর্ষজুড়ে 'বন্দে মাতরম' আন্দোলন শুরু হওয়ায় তিনি দেশে প্রত্যাগমন করেন। তার হাতে গড়া ছাত্ররা বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করেছেন। হিন্দু-মুসলমানসহ পাহাড়ি জুম্ম জনগণ তাকে প্রচন্ড ভক্তি ও শ্রদ্ধা করত। শিক্ষকতার সামান্য বেতনের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে অদম্য চেতনায় তিনি কৃষিজমি কিনে খামার গড়েছেন, দরিদ্র কৃষকদের আয়ের সুযোগ করে দিয়েছেন, খামারে তাদের বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাউজানে হিন্দু অধ্যুষিত ডাবুয়া গ্রামে আক্রমণ চালায়। এ কঠিন ক্রান্তিকালে তিনি দুটি হিন্দু পরিবারকে তার বাড়িতে গোপনে নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করেন। দীর্ঘ ৯ মাস এ পরিবারের সদস্যরা রুহুল আমীন চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাস করেছিলেন। রুহুল আমীন চৌধুরীর তিন সুযোগ্য ছেলের জীবনে বাবার সততা ও নৈতিকতার অনুশীলন প্রতিফলিত হয়েছে পূর্ণমাত্রায়। সততা ও নৈতিকতাকে আজ এ সমাজে 'লেন্স' দিয়ে অবলোকন করতে হয়। সুতরাং তার জীবন ও মূল্যবোধ বর্তমান প্রজন্মের কাছে পাথেয় হিসেবে সমর্পণ করলাম।
সাবেক ম্যাজিস্ট্রেট, চট্টগ্রাম
বর্তমানে মহাপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন