পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জনসচেতনতা

রূপপুর

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭

রুশো তাহের

১৯৬০ সালে অস্ট্রিয়া ছয়টি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর অংশ হিসেবে ১৯৭২ সালে ৭০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসল্ফপম্ন একটি রিঅ্যাক্টরের নির্মাণ কাজও শুরু করে। কিন্তু ওই রিঅ্যাক্টরের নির্মাণ কাজ সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রিয়ান পার্লামেন্ট ওই রিঅ্যাক্টর ব্যবহার নিষিদ্ধের পক্ষে ভোট দেয়। কারণ, জনগণের একাংশের নিউক্লিয়ারবিরোধী আন্দোলন। উল্লেখ্য, অস্ট্রিয়ান পার্লামেন্ট সর্বসম্মতভাবে এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে একটি আইনও প্রণয়ন করে। উপর্যুক্ত ঘটনায় দেখা যায়, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন উচ্চতর প্রযুক্তিঘন তথা বিজ্ঞান বিশেষত, নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানের বিষয়-আশয় হলেও নির্মিত প্ল্যান্ট ব্যবহার নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তটি এসেছে রাজনৈতিক বিবেচনায়, জনগণের একাংশের নিউক্লিয়ারবিরোধী আন্দোলনের ফলে, কোনো রকম টেকনিক্যাল বা সায়েন্টিফিক স্টাডি ব্যতিরেকে। এটি অলগ্ধঘনীয় এক বাস্তবতা। বস্তুত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্তটি যেহেতু জাতীয় একটি নীতিনির্ধারণের বিষয়, তাই এখানে জনমতের প্রতিফলন ঘটে বৈকি। আর এ ধরনের সিদ্ধান্তও নিয়ে থাকেন স্বপ্নদর্শী কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। অবশ্যই কোনো বিজ্ঞানী এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, মানে কোনো দেশে সে ধরনের বাস্তবতা বিরাজ করে না। আমাদের 'রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র' নির্মাণযজ্ঞের সিদ্ধান্তও বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নদর্শী নেতৃত্বের অনিবার্য ফল। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। বিশেষত, বাঙালির ৫০ বছরের স্বপ্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ সফলভাবে শুরু করা, তা-ও আবার রাশিয়ার সহযোগিতায়, সেটা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বঙ্গবন্ধুকন্যার অভাবনীয় সাফল্য। কারণ বিশ্ববাস্তবতায় সত্য হলো, পারমাণবিক বোমা বানানোর আশঙ্কায় কোনো মুসলিম দেশকে শান্তিপূর্ণ কাজেও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। কিন্তু গণতন্ত্রের মানসকন্যা ও বিশ্ব শান্তির দূত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশাল এই বাধা অতিক্রম করে শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নন-নিউক্লিয়ার থেকে নিউক্লিয়ারে পদার্পণ নিশ্চিত করেছেন।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে ঘিরে পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর রূপপুরের পদ্মাপাড়ে চলছে মহাকর্মযজ্ঞ। সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের আওতাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সার্বিক কার্যক্রম সরাসরি তদারক করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে নন-নিউক্লিয়ার থেকে নিউক্লিয়ার যুগে পদার্পণ করতে যাচ্ছে, যা আগেই উল্লেখ করেছি। এটি নির্মাণে বাংলাদেশের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগী হয়েছে আমাদের মুদ্ধিযুদ্ধকালীন বন্ধুরাষ্ট্র সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আজকের রুশ ফেডারেশন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ-বিরোধিতায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মিশেলে চলছে এক ধরনের মিডিয়া ওয়ার। একে আবার জনমতের প্রলেপ দেওয়ার অপপ্রয়াসও চলছে। ওই ওয়ারের একটি হাতিয়ার হলো, পারমাণবিক বর্জ্য। যদিও গত ৩০ আগস্ট রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেজস্ট্ক্রিয় বর্জ্য বা স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেওয়া সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সই করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। এর আগে ১৫ মার্চ ঢাকায় এ সংক্রান্ত একটি খসড়া চুক্তি অনুস্বাক্ষরিত হয়, যা ৫ জুন মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদন করে। এদিকে ভবিষ্যতে আরেকটি বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, যেখানে স্পেন্ট ফুয়েল পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিশোধন ব্যয়ের বিষয়টি উল্লেখ থাকবে। স্পেন্ট ফুয়েল ফেরত নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়াগুলো এভাবে ধাপে ধাপে সল্ফপন্ন হবে- এ মর্মে তথ্য-উপাত্ত প্রকল্প সংশ্নিষ্টদের কাছ থেকে অবহিত হয়ে আমার একাধিক নিবন্ধেও উল্লেখ করেছি। কিন্তু কে শোনে কার কথা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণবিরোধীরা এই স্পেন্ট ফুয়েল নিয়ে প্রপাগান্ডা অব্যাহত রাখল। এতে তারা সফলও হলো। এদের প্রপাগান্ডা বা গোয়েবলসীয় প্রচারণার ধরন অনেকটা এ রকম ছিল- 'রাশিয়া পারমাণবিক বর্জ্য ফেরত নেবে না। আবার বলছে, বাংলাদেশকে হাইলি রেডিওঅ্যাকটিভ পারমাণবিক বর্জ্য সংরক্ষণ করতে হবে, যার অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কোনোটিই বাংলাদেশের নেই। ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ, মাটি, নদীনালা, খালবিল- সবকিছু তেজস্ট্ক্রিয়ায় দূষিত হয়ে যাবে। কখনওবা প্রচার করেছে রাশিয়া তার আগের অবস্থান থেকে সরে আসছে। মানে পারমাণবিক বর্জ্য ফেরত নেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু এখন তারা বলছে, বর্জ্য ফেরত নেবে না।' বস্তুত এভাবে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, নিবন্ধ ছেপে এমনকি জনসচেতনতার কথা বলে গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে গোয়েবলসীয় প্রচারণা চালানো হয়। ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে? জনগণকে কি সচেতনতার আড়ালে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছে ওই মহল? প্রথমত, প্রকল্প-সংশ্নিষ্টরা হয়তো বলবেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। সবকিছু তো ঠিকঠাকই আছে। না, এই জবাব যে সঠিক নয়, তা-ই বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে দিতে চাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি, মাইক্রোবায়োলজি, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান, সমুদ্রবিজ্ঞান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের মাঝে দেশে নিউক্লিয়ার সচেতনতামূলক ক্যাল্ফেপইনের অংশ হিসেবে আমার সল্ফপাদনায় প্রকাশিত 'রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন' সংকলনগ্রন্থ বিতরণ ও মতবিনিময় করতে গিয়ে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সল্ফপর্কে নানা নেতিবাচক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অবশ্য ইতিবাচক অভিজ্ঞতাও কম ছিল না। কিন্তু নেতিবাচক পরিস্থিতি ছিল সত্যিই উদ্বেগজনক। এর যথার্থ জবাব না দিয়ে কিংবা এগিয়ে গিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক আছে- এ রকম আত্মতুষ্টিতে থাকা হবে চরমভাবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। এর ফল সুদূরপ্রসারী আবহে ক্ষতিকর। কারণ কেউ বলছে পদ্মায় পানি নেই, কেউবা বলছে, মাছ মরে যাবে। এমনকি ঘনবসতি এলাকায় রেডিয়েশন ছড়াবে রূপপুর প্রকল্প। এ ধরনের প্রসঙ্গ উদ্ভট শোনালেও বিশেষভাবে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় সাধারণ মানষের মধ্যে এমনকি উচ্চ শিক্ষিতজনে এসব ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে।
স্বাধীনভাবে মতামত ব্যক্ত করার জন্য আমরা কি উচ্চ শিক্ষিতজন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের অসচেতন বলব? নিউক্লিয়ার উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশ্বচিত্র সল্ফপর্কে তাদের কোনো ধারণাই নেই- এমনটি ধরে নেব? না, এটা আসলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে কিছু মিডিয়ার প্রচারণা বা মিডিয়া ওয়ারের অনিবার্য পরিণতি। এদিকে মিডিয়া ওয়ারের জবাবে ইতিবাচক প্রচারের অনুপস্থিতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে মানুষের উৎকণ্ঠাই শেষ পর্যন্ত পাকাপোক্ত হবে। এর একটি হচ্ছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো বাঙালির অর্ধশতকের স্বপ্নপূরণের ইতিবাচক কাজটিই নেতিবাচক তথা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ হিসেবে পরিগণিত হবে। তাই পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশকে নবাগত দেশ হিসেবে এবং সেই সঙ্গে নন-নিউক্লিয়ার থেকে নিউক্লিয়ারে পদার্পণের শুভলঘ্নে অবশ্যই নিউক্লিয়ার সচেতনতার কাজটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সল্ফপম্ন করতে হবে। এটি এক ধরনের অবকাঠামোও বৈকি। এদিকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশের নন-নিউক্লিয়ার থেকে নিউক্লিয়ারে পদার্পণের মানে শুধু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনকও নয় বরং কয়েকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ নিউক্লিয়ার উৎস থেকে নিশ্চিত করা। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। তাই দেশে নিউক্লিয়ার সচেতনতামূলক ক্যাল্ফেপইন আগেভাগেই করা উচিত। এ বিষয়টি দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন-সংশ্নিষ্টরা মানে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত, তাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। তা বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এটা সময়ের দাবি। বিলম্ব করা হবে আত্মঘাতী।
বিজ্ঞানলেখক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা