'আমার কথা শোনো'

শিশু অধিকার

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭      

সেলিনা হোসেন

এবার জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল- 'কন্যাশিশুর জাগরণ, আনবে দেশে উন্নয়ন'। ১২ অক্টোবর থেকে শিশু অধিকার সপ্তাহ শুরু হয়েছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শিশু একাডেমির সহযোগিতায়। শিশু একাডেমি থেকে স্লোগান দেওয়া হয়েছে- 'আমার কথা শোনো'। নিচে লেখা রয়েছে 'ছোটরা বলবে বড়রা শুনবেন'। শুধু কন্যাশিশু কেন, সব শিশুর অধিকারের ব্যাপারে এই স্লোগানটি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কারণ শিশুর অধিকারের বিষয়টি ওরা কথা বলা ও প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে অনেক বেশি বুঝতে শিখবে। তার বড় হয়ে ওঠার সুযোগ গ্রহণ করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জরুরি বিষয়টিও তারা জীবনের শুরু থেকেই সেভাবে রপ্ত করতে শিখে উঠতে পারবে। রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে তার জিজ্ঞাসাটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
শিশুর অধিকারের বিষয়টি আজ আমরা রোহিঙ্গা শিশুদের দিকে তাকালে খুব করে বুঝতে পারি। বিশ্ব শিশুর অধিকার রক্ষার বিষয়টি স্লোগান দিয়ে স্বীকৃতি দিচ্ছে কিন্তু বাস্তবে আমরা কি এর বিপরীত চিত্রটাই অনেক ক্ষেত্রে দেখছি না? মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আক্রান্ত বিপম্ন-বিপর্যস্ত মানুষের সঙ্গে অগণিত শিশুর যে অমানবিক দৃশ্য আমরা গণমাধ্যম মারফত প্রত্যক্ষ করছি তা কতটা মর্মন্তুদ এ কি আর ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণের কোনো দাবি রাখে? নোম্যানস ল্যান্ডে খোলা আকাশের নিচে তারস্বরে কত শিশুর চিৎকার শোনা গেছে। কত শিশুর লাশ নাফ নদে ভেসে উঠেছে। আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, সিরীয় শিশু শরণার্থী সেই আয়লান কুর্দির কথা, যে বালুতে মুখ গুঁজে নিথর দেহ নিয়ে পড়েছিল। এমন আয়লান কুর্দির সংখ্যা সভ্যতা-মানবতার চরম উন্মেষকালেও বাড়ছে চরম নির্মমতা-নিষ্ঠুরতার বলি হয়ে। এর চেয়ে লজ্জার আর কী আছে!
বিশ্বে এখনও কত শিশু বিপম্ন এর সঠিক পরিসংখ্যান মেলানো খুব ভার। মিয়ানমারের আজকের বিপম্ন-বিপর্যস্ত শিশুরা জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ানো। যদি বাংলাদেশ মানবিকতার দরজা খুলে না দিত তাহলে এই শিশুদের কী হতো ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। তাদের কোনো দেশ নেই, ভবিষ্যৎ নেই। নোম্যানস ল্যান্ড তো কোনো শিশু কেন, কোনো মানুষেরই ঠিকানা হতে পারে না। এখনও বিশ্বের অসংখ্য শিশুর সামনে সবটুকুই কেবল অন্ধকার। স্ট্মরণ করি ১৯৯২ সালে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত সার্কভুক্ত দেশগুলোর মন্ত্রীদের তিন দিনের (১৬-১৮ সেপ্টেম্বর) বৈঠকের বিষয়টি। এ অঞ্চলের ৪৩ কোটি শিশুর অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে আয়োজিত হয়েছিল ওই বৈঠক। মন্ত্রীরা অস্ত্র খাতে খরচ কমিয়ে নারী ও শিশুদের জন্য অধিক খরচ করতে সম্মত হয়েছিলেন। তারা তখন আরও বলেছিলেন, জাতীয় আয়ের পাঁচ শতাংশ শিশু কল্যাণে ব্যয় হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে এই দীর্ঘ সময়ে কতটা কী হয়েছে, এ প্রশ্ন উঠতেই পারে।
অনেক দেশেই শিশুরা কম-বেশি অধিকারবঞ্চিত। তবে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে এই চিত্র বেশি পুষ্ট। শিশুশ্রম উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক অনিবার্য নিয়তি। এই শিশু শ্রমিকরা অহরহ নানাভাবে হচ্ছে নির্যাতিত। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। যদিও অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এ ক্ষেত্রে বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো কিংবা উন্নত, কিন্তু এখনও আমরা আমাদের কাগ্ধিক্ষত স্তর স্পর্শ করতে পারিনি। অধিকার কিংবা সুযোগবঞ্চিত শিশুদের স্বার্থান্বেষী মহল নানাভাবে ব্যবহার করে থাকে নেতিবাচক পন্থায়। এর মর্মন্তুদ পরিণতিও আমরা ইতিমধ্যে কম প্রত্যক্ষ করিনি। এই যে মিয়ানমার থেকে শত শত গর্ভবতী মা বন্দুকের নলের মুখে, আগুনের লেলিহান শিকার বিভীষিকায়, বহুমুখী নিপীড়ন-নির্যাতন সয়ে সীমান্তের অপর পাড়ে জীবন নিয়ে কোনো রকমে আসতে বাধ্য হয়েছেন কিংবা যেসব মা এ পরিস্থিতিতে তাদের সন্তান জন্মদান করেছেন, সেসব শিশু জন্মেই শঙ্কার গন্ডিবদ্ধ হয়ে পড়ল। এই অমানবিকতা কি সভ্যতার কলঙ্ক নয়?
আমরা যদি স্ট্মরণ করি সোমালিয়ার কথা, তাহলে মানবিক বোধ কি কঠিনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে না? দু'মুঠো ভাতের জন্য লঙ্গরখানায় মারা গেছে শত শত শিশু! হাড় আর চামড়া ছাড়া কত শিশুর তো আর কিছুই চোখে পড়েনি। গণমাধ্যমের কল্যাণে তো আমরা এমনও দেখেছিলাম- অনাহারে, দুর্বলতায় বিপম্ন শিশুরা লঙ্গরখানার চত্বরে পৌঁছতে পৌঁছতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে। শুধুই খাদ্যের অভাব নয়, মারণাস্ত্রময় সভ্যতার আরও কত নির্মম পরিহাস আমরা দেখেছি, নিষ্ঠুরতা থেকে শিশুরাও নিস্তার পায়নি। ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায়গুলো খুব সঙ্গত কারণেই সামনে চলে আসে, যখন শিশুর অধিকারের বিষয়ে আমরা কথা বলতে চাই। শিশু কিংবা মানুষের বাসযোগ্য হিসেবে এই বিশ্বকে গড়ে তোলার দায় তো বিবেকবান বিশ্ববাসীরই। শুধু স্লোগানের মধ্যে সবকিছু সীমাবদ্ধ রেখে দৃশ্যত কর্মসূচি পালনে কি সমস্যা-সংকটের নিরসনে ঘটবে? না, কখনোই না। উচ্চারণসর্বস্ব অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি বর্জন করে দায়িত্বশীল সবাইকে কাজের কাজটুকু করতে নিষ্ঠ হতে হবে। বাংলাদেশে এক সময় 'টোকাই' শব্দটি খুব বেশি প্রচলিত ছিল। এর প্রেক্ষাপটও সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা। মানবসন্তান 'টোকাই' নয়, মানুষের সবটুকু অধিকার নিয়ে বেড়ে উঠবে, বেঁচে থাকবে, বসবাস করবে- এটাই তো খুব সঙ্গত।
শিশুশ্রম বন্ধের কঠোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। শিশু নির্যাতনকারী যে বা যারাই হোক, তাদের তাৎক্ষণিক কঠোর আইনের আওতায় এনে দন্ড নিশ্চিত করতে হবে। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ- এটি স্লোগান নয়, বাস্তবতা। এই নিরিখেই প্রত্যেক শিশুকে গড়ে তুলতে হবে। শিশুর নিরাপত্তাসহ অধিকারের সব বিষয় নিশ্চিত করা শুধু সরকার কিংবা প্রশাসনের একার দায়-দায়িত্ব নয়। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথ মসৃণ তো করতে হবেই, কিন্তু এ কথাও গুরুত্বের সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, আমরা যদি পরিবারে-সমাজে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সবাই সচেতন ও সজাগ থাকি তবে অশুভ ছায়া প্রলম্বিত হতে পারবে না। আমরা যেন আমাদের দায়িত্বের কথা ভুলে না যাই। শুধু সরকার ও প্রশাসনের ওপর ভর করে যেন পরিত্রাণ না খুঁজি। আমরা অবশ্যই আইন হাতে তুলে নেব না, কিন্তু সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য যূথবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকারটুকুর বাস্তবায়ন করতে হবে আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যেমন যে কোনো সদিচ্ছার বাস্তবায়ন সম্ভব, তেমনি সব অশুভও রোধ করা কঠিন কিছু নয়। সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে আলোচ্য বিষয়টি নিয়ে এ যাবৎ কথাবার্তা কম হয়নি, কিন্তু কাজের কাজ কতটা কী হয়েছে, এই প্রশ্নটা আমাদের কাছে যদি আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে রাখি তাহলে কাগ্ধিক্ষত স্তরে পৌঁছার পথটা নিশ্চয়ই প্রশস্ত হবে বলে মনে করি। শিশুর জন্য চারপাশ নিরাপদ হোক, শিশুর অধিকার বাস্তবায়নে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হোক, এটি সময়ের মুখ্য দাবি। শিশুদের সচেতন করে তোলার দায়িত্ব সমাজ, পরিবারসহ বিভিন্ন স্তর থেকে নিতে হবে। শিশুরা যদি জীবনের শুরু থেকেই পুষ্ট বোধ তৈরির ক্ষেত্র পায়, তাহলে এর ইতিবাচক প্রভাব আমাদের আশার আলো দেখাবেই। শিশুদের জন্য চাই সে রকম পরিবেশ, যে পরিবেশ তাদের বিকাশের পথ প্রশস্ত করবে। শিশুর অধিকারের বিরুদ্ধে যে বা যারাই নূ্যনতম বৈরী অবস্থান নেবে তারা দেশ কিংবা সমাজের মিত্র নয়, হতে পারে না।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে আলোচনাটি শেষ করি। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে যে শিশুটিকে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়, বোঝা হয়ে দাঁড়ায় সে শিশু সমাজের, তার মূল্যায়ন কীভাবে করা হবে? সেই শিশুটি কি তার প্রাপ্য অধিকার ভোগ করছে স্বাভাবিকভাবে? এমনি লাখো শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনসচেতনতা বাড়াতে বিশ্বব্যাপী শিশু অধিকার দিবস এবং সপ্তাহ উদযাপিত হয় প্রতি বছর। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। সেই আগের মতোই বলতে হচ্ছে, শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে। শিশুকে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার সব দায়িত্ব পালন করতে হবে নিষ্ঠার সঙ্গে। তাদের জীবনের শুরুতেই যদি এ কাজ শুরু করা যায় তাহলে অবশ্যই সুফল মিলবে। শিশুকে আদর-স্টেম্নহ দিতে হবে, তার বেড়ে ওঠার সব দায়িত্ব নিতে হবে, তার শিক্ষা লাভের সুযোগ দিতে হবে, চিকিৎসা-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে, তার মানসিক বিকাশের সব সুযোগ যেন সে পায়, সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।
বয়সসীমা যাই হোক, কিছু অধিকার আছে, যা সহজেই পূরণ করা যায়। সেগুলো নিশ্চিত করা আমাদের জন্য অপরিহার্য। যেমন, শিশুকে শাস্তিবিধানের বিষয়টি। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের দেশে শিশুকে লেখাপড়ায় মনোযোগী করার জন্য কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিংবা পরিবারের মধ্যেও নানা রকম নির্যাতনের আশ্রয় নিতে দেখা যায়। তার চেয়ে লজ্জাজনক আর কী হতে পারে! শিশুকে হ্যাঁ বলার অভ্যাসটি আমরা রপ্ত করব- এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
কথাসাহিত্যিক এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ
শিশু একাডেমি