ঔষধ শিল্পের অগ্রযাত্রা

অর্থনীতি

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০১৭

কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান

ওষুধ কোনো সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়। এটা উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ হয়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যার গাইডলাইন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের সংশ্নিষ্ট অধিদপ্তরের কঠোর তত্ত্বাবধানে এবং নীতিমালা মেনে উৎপাদন করা হয়। আমাদের দেশের উৎপাদিত ফার্মাসিউটিক্যালস প্রডাক্ট পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি দেশে রফতানি হচ্ছে। শুধু মূল্য সুবিধা দিয়ে নয়, ওই সব দেশের যথাযথ রেগুলেটরি বিধিবিধান মেনে সঠিক তথ্য-উপাত্ত ও মান নিয়ন্ত্রিত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে তা সম্ভব হয়েছে। তাই বলা চলে, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের উত্থান বিস্ময়কর।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওষুধ রফতানি করে নয়া ইতিহাস সৃষ্টি করে নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে সম্ভাবনাময় উদীয়মান এক শিল্প খাত। বর্তমানে দেশে ওষুধ শিল্পের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার ওপরে এবং আন্তর্জাতিক বাজার ২২০০ কোটি টাকারও বেশি। এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৫ শতাংশের ওপরে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি), বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বিএএসএস) ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির (বিএপিআই) প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গার্মেন্ট শিল্পের মতোই এ শিল্পের অগ্রগতি উল্লেখ করার মতো।

প্রতিযোগিতামূলক মূল্য সুবিধা ও ওষুধের গুণগত মান বজায় রাখায় বিদেশি বাজারে দেশীয় ওষুধের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ধারাবাহিক অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে, সেই সঙ্গে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা যথাযথ থাকলে আশা করা যায়, ২০৩০ সালের মধ্যে এই শিল্প গার্মেন্ট শিল্পকে অতিক্রম করবে।

সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও এই শিল্পের সুস্থ বিকাশ ও মানসম্মত উৎপাদনশীলতার জন্য যথেষ্ট সুনাম অর্জন এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সক্ষম হয়েছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সার্টিফিকেশন সনদও পেয়েছে বেশ কিছু কোম্পানি। এ কারণে ওইসব দেশসহ অন্য দেশে ওষুধ রফতানি পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে ওষুধ শিল্প বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা পাওয়া গেলে এর বিকাশ সামনে আরও বাড়ানো সম্ভব। তবে সম্ভাবনাময় ঔষধ শিল্পের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে ধরা হচ্ছে 'কাঁচামাল উৎপাদন'। আর এ কারণে ঔষধ শিল্পের অপার সম্ভাবনার সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছিল না বাংলাদেশ। তবে সে দুয়ারও খুলে যাচ্ছে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় অবস্থিত ঔষধ শিল্পনগরী প্রকল্পের এপিআই শিল্পপার্ক (অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট-এপিআই) প্লট বরাদ্দ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এই পার্কে কাঁচামাল উৎপাদনের সব ধরনের সুবিধা প্রণয়ন করে দেবে সরকার। এরপরই ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের কারখানা স্থাপন শুরু হবে। ফলে আমদানি খরচ শতকরা ৭০ ভাগ কমে আসবে। পার্ক পূর্ণাঙ্গ চালু হলে ঔষধ শিল্পের কাঁচামালের জন্য আর কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। বরং আমরাই উল্টো কাঁচামাল রফতানি করতে পারব। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশে ওষুধের কাঁচামালের বাজার ১২০০ কোটি টাকার বেশি।

বাংলাদেশ ২০২৪ সালের মধ্যে এলডিসি থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলে মেধাস্বত্ব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে নতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হবে। তাই এ সময়ের মধ্যে আমাদের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে হবে। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ঔষধ শিল্প এখন উড়াল দেওয়ার পর্যায়ে রয়েছে- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখনও দেশের অধিকাংশ ওষুধের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, পাবনা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হারবাল, ইউনানি, আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথিক এবং অ্যালোপ্যাথিক ১৩৩৮টি ছোট-বড় ওষুধ উৎপাদনকারী কারখানা রয়েছে। অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, সরকারি নিবন্ধিত ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮৫০টি। দেশের উন্নতমানের ৫৪টির বেশি কোম্পানি ৩০৩টি গ্রুপের ওষুধ রফতানি করে।

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২৬৫টি ছোট-বড় ওষুধ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪টি ওষুধ কারখানা সচল রয়েছে। এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫ হাজার ব্র্যান্ডের ৮ হাজারের বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে। বড় ১০টি কোম্পানি দেশের চাহিদার ৬৯ শতাংশ মিটিয়ে থাকে। বড় ২০টি কোম্পানি বিবেচনায় নিলে তারা মোট চাহিদার ৮৬ শতাংশ সরবরাহ করছে। অচিরেই বাংলাদেশ প্রভাবশালী রফতানিকারক হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করবে। এটা শুধু আমাদের জন্য নয়; দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ খাত থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং আরও করবে।

২০১৬ থেকে চলতি বছরের চলতি মাস পর্যন্ত দেশের ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধ উৎপাদন করেছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার।

ঔষধ শিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে ঔষধ শিল্পের যাত্রা শুরু হয় পঞ্চাশের দশকের শুরুতে। একাত্তরের স্বাধীনতার কিছুদিন পর বাংলাদেশ ওষুধ উৎপাদন শুরু করে। তখন সিংহ ভাগই নির্ভর করতে হতো বৈদেশিক আমদানির ওপর। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ ওষুধের তীব্র সংকটে পড়লে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ওষুধ বিক্রিতে অনীহা দেখায়। দুঃসময়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায় হাঙ্গেরি নামক দেশটি। পূর্ব ইউরোপের এ দেশটির বিনিময়ে বাংলাদেশ পাঠাত পাট ও অন্যান্য কাঁচা পণ্য। ১৯৮২ সালে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি হয়। এর ফলে বিদেশি ঔষধ কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া বাণিজ্য থেকে দেশি শিল্প মুক্তি পায়। এত সব বাধার পাহাড় পেরিয়ে আজকের ঔষধ শিল্পের অগ্রযাত্রা গল্পের মতোই মনে হয়। বর্তমানে দেশের চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করেও বিশ্বের ১৪০টি দেশে মানসম্মত ওষুধ রফতানি হচ্ছে। তাই বলতে হয়, 'বাংলাদেশে ঔষধ শিল্পের বিস্ময়কর উত্থান।'

বিনিয়োগ বিশ্নেষক

ঔষধ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত