ভারতবর্ষের বাংলা অঞ্চলে প্রথম কবে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে এ অঞ্চলে সাংবাদিকতা কর্মের অস্তিত্ব খুবই প্রাচীন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সেই মৌর্য যুগে রাজদরবারে এক ধরনের রাজকর্মচারী ছিল, যারা রাজ্যের নানা জায়গা থেকে খবরাদি সংগ্রহ করত। এদের বলা হতো প্রতিবেদক। তাদের কাজটি ছিল আজকের যুগের রিপোর্টারদের মতো। সেটি ছিল আসলে সাংবাদিকতা। এক কথায় আমরা বলতে পারি, খ্রিষ্টের জন্মের আগেও এ অঞ্চলে সাংবাদিকতা কাজের প্রচলন ছিল। তবে বাংলা অঞ্চলে সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকতা তথা সংবাদপত্রের প্রচলন ঘটেছে ব্রিটিশ আমলে।

ভারত উপমহাদেশে প্রেস স্থাপন এবং সংবাদপত্র প্রকাশের প্রথম উদ্যোগটি গৃহীত হয়েছিল (১৭৬৮ সালে) একজন ইংরেজ দ্বারা। তিনি ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক কর্মচারী; নাম উইলিয়াম বোল্ট। কোম্পানি আমলে ইংরেজদের মূল লক্ষ্য ছিল এ অঞ্চল থেকে অর্থ উপার্জন করা। নীল চাষের মাধ্যমে তা বেশি মাত্রায় করা হতো। কোম্পানি ছাড়াও কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তি পর্যায়ে বিভিন্নভাবে অর্থ উপার্জনে লিপ্ত হয়ে পড়ত। এমন এক কর্মচারী ছিলেন উইলিয়াম বোল্ট। কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একসময় ধারণা জন্মে, উইলিয়াম বোল্ট নিজ স্বার্থের জন্য দেশীয় নবাব এবং ওলন্দাজ বণিকদের সঙ্গে বেআইনিভাবে বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করে কোম্পানির স্বার্থকে বিঘ্নিত করতে লিপ্ত। সে কারণে তারা তাকে এক পর্যায়ে কোম্পানির চাকরি থেকে বহিস্কার করেন। তখন বোল্ট উদ্যোগ নিলেন তিনি কলকাতায় একটি প্রেস বসাবেন এবং সেখান থেকে একটি পত্রিকা বের করবেন। এ ব্যাপারে কলকাতা কাউন্সিল হলে হাতে লিখে একটি বিজ্ঞাপনও সেঁটে দিলেন এবং তাতে উৎসাহী সংশ্নিষ্ট যারা ছাপানোর কাজ চালাতে সক্ষম, তাদেরকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানালেন।

উইলিয়াম বোল্ট দীর্ঘদিন কোম্পানির কর্মচারী থাকায় তিনি কোম্পানির ভেতরের খবরাখবর জানতেন। তাই কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে কোম্পানির লোকেরা তাকে মাদ্রাজে নিয়ে এসে জাহাজে করে সরাসরি দেশে পাঠিয়ে দেয়। এভাবে সংবাদপত্র প্রকাশের প্রথম উদ্যোগটি পরিণতি পায়। এ ঘটনার এক যুগ পর ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ভারতের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র 'বেঙ্গল গেজেট' বা 'ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভার্টাইজার'। এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন অগাস্টাস হিকি। সে কারণে সাধারণ্যে এটি 'হিকি'স গেজেট' বলে সমধিক পরিচিত। এটি ছিল একটি ট্যাবলয়েড সাইজের পত্রিকা। এ সময় ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস এবং হেস্টিংসের একজন বিচারপতি ছিলেন এলিজা ইম্পে। কিছুদিন না যেতেই গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে হিকির দ্বন্দ্ব হওয়ায় হিকি'স গেজেট গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস, তার স্ত্রী মিসেস হেস্টিংস ও বিচারপতি এলিজা ইম্পেকে নিয়ে 'মিথ্যা বা বানোয়াট' খবরাখবর ছাপতে শুরু করল। এক পর্যায়ে গিয়ে হিকির ওপর কর্তৃপক্ষীয় ক্রোধের খÿ নেমে এলো। একে একে তার পত্রিকার ডাক বিভাগীয় সুবিধা বাতিল করা হলো, হিকিকে কারাদণ্ড দেওয়া হলো, সবশেষে তার প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হলো। এভাবে ভারত উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্রের যবনিকা ঘটল। উল্লেখ্য, পত্রিকাটি ছাপা হতো ইংরেজি ভাষায় এবং সম্পাদকও ছিলেন একজন ইংরেজ।

১৮১৮ সালের আগে ভারতে বাংলা ভাষায় বাঙালি মালিকানায় কোনো পত্রিকা বের হয়নি। অনেকের মতে, ১৮১৮ সালের ২৩ মে প্রকাশিত সাপ্তাহিক 'সমাচার দর্পণ' হচ্ছে প্রথম বাংলা সংবাদপত্র। পত্রিকাটি বের হয়েছিল শ্রীরামপুরের মিশনারিদের উদ্যোগে। এটির সম্পাদক ছিলেন একজন ইংরেজ; জন ক্লার্ক মার্শম্যান। এ ব্যাপারে আরেকটি মতও আছে। সেটি হচ্ছে, গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত 'বঙ্গাল গেজেটি' হচ্ছে প্রথম বাংলা সংবাদপত্র। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপধ্যায় লিখেছেন, ১৮১৮ সালের ১৪ মে থেকে ৯ জুলাই তারিখের মধ্যে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল। কলকাতা থেকে প্রকাশিত (২৫ জানুয়ারি, ২০১৮ তারিখে) 'প্রথম বাঙালি প্রকাশক ঠাঁই পাবেন মেলায়' শীর্ষক একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বাংলা ও তাবৎ ভারতীয় ভাষার মধ্যে যে বইটি আধুনিক ছাপাখানায় ছেপে বাজারে আসে তা হলো অন্নদামঙ্গল। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮১৬ সালে। প্রেস অব ফেরিস অ্যান্ড কোং থেকে ছাপানো বিদ্যা এবং সুন্দরকে নিয়ে রচিত এ বইটির লেখক ছিলেন ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর। মুদ্রক ও প্রকাশক ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। তিনি শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের কম্পোজিটর হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। এই অসামান্য কাজটি গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যই করেছিলেন। মনের আলাপ নামক একটি লিটল ম্যাগাজিনের ২০১৭ বর্ষপূর্তি সংখ্যায় পুলক মণ্ডল রচিত 'বাংলা সংবাদপত্রের দুশো বছর :উপেক্ষিত নায়ক গঙ্গাকিশোর' প্রবন্ধে এসব তথ্য রয়েছে।

দৈনিক আজকাল পত্রিকার ২৫.০১.২০১৮ তারিখের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, 'বঙ্গাল গেজেটি' নামে যে সাপ্তাহিক সংবাদপত্রটি বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার পাটুলী-বহরা গ্রামের বাসিন্দা গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য বের করেন, সেটি শুধু বাংলায় নয়, তাবৎ ভারতীয় ভাষার মধ্যে প্রথম প্রকাশিত সংবাদপত্র। ১৮২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে 'ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া' নামক একটি ইংরেজি কাগজের প্রতিবেদনে গঙ্গাকিশোর এরূপ স্বীকৃতি পান। পরে ১৮৫২ সালে 'সংবাদপত্রের ইতিবৃত্ত' বইটিতেও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এবং ১৮৫৫ সালে 'ডেসক্রেপটিভ ক্যালকাটা অব বেঙ্গলি ওয়ার্কস' বইতে ফাদার লং পরিস্কারভাবে বলেছেন, গঙ্গাকিশোরের 'বঙ্গাল গেজেটি'ই বাংলা এবং তাবৎ ভারতীয় ভাষার প্রথম সংবাদপত্র। ১৮১৮ সালের ২৩ মে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত 'সমাচার দর্পণ' কিংবা ওই একই বছর ১৪ মে থেকে ৯ জুলাই তারিখের মধ্যে যে কোনো একটি দিনে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত 'বঙ্গাল গেজেটি' পত্রিকার কোনটি প্রথম বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা, এটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাংলা ভাষায় একজন বাঙালি কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র যে 'বঙ্গাল গেজেটি'- এ নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। ফাদার লং কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের লেখাতে 'বঙ্গাল গেজেটি'কে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র হিসেবেই দাবি করা হয়েছে।


skasalam@gmail.com


অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন