মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী গতকাল আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমার দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা। ২৬ বছর আগে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠন হওয়ার শুরু থেকেই তিনি যুক্ত ছিলেন। আমৃত্যু এর সঙ্গে ছিলেন। আন্দোলনে যুক্ত থাকলেও ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী প্রথম দিকে সংকোচের কারণে সামনে আসতে চাইতেন না। নিজের ওপর সংঘটিত নির্যাতন সম্পর্কে প্রকাশ্য বলতে চাইতেন না। এ জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে তিনি সময় নিয়েছেন। তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এ বিষয়ে কথা বলবেন। পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা মুক্তিযুদ্ধের সময় কী ঘৃণ্য তৎপরতা চালিয়েছে, তা মানুষকে জানাতে হবে। জানাতে হবে এবং এদের বিচার হতে হবে। শুধু ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী নন, একাত্তরের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্যাতিত নারীদের সবাই এমন সংকোচের দেয়ালে আবদ্ধ ছিলেন। স্বাধীনতার পর থেকেই তাদের চারপাশে ঘেরা ছিল অবহেলা, অপমান ও বেদনার দেয়াল। ফেরদৌসী প্রথম সেই দেয়াল ভেঙেছেন। শুধু নিজের দেয়াল ভাঙা নয়, তিনি একাত্তরে নির্যাতিত অন্য নারীদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন এ বিষয়ে কথা বলতে। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে মানুষকে জানাতে হবে, অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় আনতে হবে। আমার এখনও মনে আছে, ১৯৯৯ সালে জাতীয় জাদুঘরে অনুষ্ঠিত এক নাগরিক সভায় তিনি প্রথম প্রকাশ্য মুখ খোলেন। সেদিন মঞ্চে সেক্টর কমান্ডাররা উপস্থিত ছিলেন। তাদের সামনে তিনি বললেন, হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা কীভাবে তার ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। আমি দেখেছি, সেদিন মঞ্চে ও দর্শকসারিতে উপস্থিত কারও চোখ শুকনো ছিল না। এক পর্যায়ে ফেরদৌসী একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সহসভাপতির দায়িত্ব নিলেন। তারপর থেকে যতদিন শারীরিকভাবে সক্ষম ছিলেন, সারাদেশে ঘুরে বেরিয়েছেন। একাত্তরে নির্যাতিত যারা আড়ালে ছিলেন, তাদের সামনে আসার জন্য, কথা বলার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। এই যে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালে সে সময় নির্যাতিত নারীরা ট্রাইব্যুনালের কাছে সাক্ষ্য দিয়েছেন, এটা সম্ভব হয়েছে ফেরদৌসীর কারণেই। তার কারণেই একাত্তরে নির্যাতিত নারীরা যেন সম্মান ও ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন। বর্তমান সরকার যে নির্যাতিত নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, এর পেছনেও রয়েছে ফেরদৌসীর ভূমিকা। তিনি বলতেন, আমরা নির্যাতিত বটে, একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাও। আমাদের ত্যাগ ও যন্ত্রণার সীমা-পরিসীমা নেই। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্যাতনের বিষয় সামনে আনার বিষয়টি সহজ ছিল না। এ জন্য ফেরদৌসীকে বিভিন্ন মহল থেকে অপমান এমনকি লাঞ্ছনার শিকারও হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি একবার মুখ খোলার পর তাকে আর দমানো যায়নি। তার সাহসের কাছে সব বাধা দূর হয়েছিল।

শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও ফেরদৌসী হয়ে উঠেছিলেন যুদ্ধকালীন নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের ক্ষতিপূরণের দাবিতে ২০০০ সালে টোকিওতে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছিল। সেখানে ফেরদৌসীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তার ওপর নির্যাতনের বিবরণ শুনে মঞ্চে বসা কোরিয়ার এক নির্যাতিত নারী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন। জ্ঞান ফেরার পর ওই নারী বলেছিলেন, এমন নির্যাতন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও হয়নি। পরের দিকে শারীরিক অক্ষমতার কারণে ফেরদৌসী আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে যেতে পারতেন না। কিন্তু তিনি চাইতেন, বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের কথা সবাই জানুক। এ জন্য প্রতিনিধি পাঠাতেন। চার বছর আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এ বিষয়ে শুনানি হয়েছিল। সেখানে ফেরদৌসীর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। তিনি যখন ফেরদৌসীর কথা তুলে ধরেছিলেন, সেই অধিবেশন চেয়ার করছিলেন রোমানিয়ার একজন সদস্য। তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন।

ফেরদৌসী তার ভাস্কর্য বা শিল্পকর্মেও নিজের যন্ত্রণাকে তুলে ধরেছেন। ১৯৯৯ সালেও ওই সভায় তিনি বলেছিলেন, শরীরে করে আবর্জনা বয়ে নিয়ে বেড়ানোর অনুভূতি হয় তার। আমরা জানি, তিনি এক মহান মানুষ। শিল্পকর্মেও তিনি আবর্জনা থেকে মহৎ কিছু করতেন। বেদনা ও কষ্টকে তুলে ধরেন শিল্পের মাধ্যমে। আমি মনে করি, ফেরদৌসীর আরও অনেক কথা বলার ছিল। কিন্তু মাত্র ৭১ বছর বয়সে তাকে চলে যেতে হলো। তিনি একাত্তরে নির্যাতিত নারীর মুখপাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। তার মতো দ্বিতীয় কেউ আর থাকল না। আরও অনেকে এখন বলছেন, আরও অনেকে বলবেন; কিন্তু তার মতো করে কেউ বলতে পারবে? ফেরদৌসীর প্রয়াণে আমাদের আন্দোলনেও একটা বিরাট শূন্যতা তৈরি হলো। এটা যদিও পূরণ হবে না; আমি বিশ্বাস করি, তার সাহস ও সংগ্রাম আমাদের অনুপ্রাণিত করে যাব। অনুপস্থিত থেকেও ফেরদৌসী আমাদের সঙ্গে সবসময়ে থাকবেন।

লেখক ও গবেষক; সভাপতি, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি

মন্তব্য করুন