১৯৭১ থেকে ২০১৭- ৪৭ বছর হয়ে গেল স্বাধীনতার। বাংলাদেশের অনেকের কাছে ২৫ মার্চ এসেছিল আকস্মিকভাবে। রাতের আঁধারে নিরীহ মানুষের ওপর এমন বর্বর ও ভয়ঙ্কর হামলা কে ভাবতে পেরেছিল? ২৫ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা চলছে তার। জুলফিকার আলী ভুট্টোও ঢাকায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রায় সব শীর্ষ কর্মকর্তা এসেছেন ইয়াহিয়া খানের ডাকে। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলতেই পারেন যে পশ্চিম পাকিস্তান ছিল অরক্ষিত। পাকিস্তানের দুই অংশের মাঝে ভারতের বিশাল স্থলভাগ। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের একটি বিমান হাইজ্যাক করে নিয়ে গিয়েছিল কাশ্মীরের দুই যুবক। বিমানটি নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানে। জুলফিকার আলী ভুট্টো ওই বিমানে উঠে গিয়ে ছিনতাইকারীদের বাহবা দেন। পাকিস্তানের ক্ষমতায় তখন সেনাবাহিনী। জুলফিকার আলী ভুট্টোকে সামরিক বাহিনী পূর্ণ সমর্থন দেয়। ভারত পাল্টা ব্যবস্থা নেয়- তাদের ভূখণ্ড দিয়ে পাকিস্তানের বিমান চলাচল বন্ধ। ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন অনেকটা পথ ঘুরে- শ্রীলংকার ওপর দিয়ে। সে দেশের রাজধানী কলম্বোতে বিমানের জ্বালানি ভরা হয়। বাংলাদেশে গণহত্যা পরিচালনার জন্য পাকিস্তান ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্র আসে, অফিসার ও জওয়ান আসে। ২৫ মার্চ গণহত্যার খবর বিশ্ববাসী জেনে যাওয়ার পরও পাকিস্তানের সৈন্য ও অস্ত্র আসে বাংলাদেশে। শ্রীলংকা সরকার সে সময়ে যদি বলত- বাংলাদেশে গণহত্যা পরিচালনার জন্য সৈন্য ও অস্ত্র পরিবহনে কলম্বো বিমানবন্দর ব্যবহার করা যাবে না, তাহলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়াত? পাকিস্তানের তখন বিকল্প ছিল আরও অনেক পথ ঘুরে সমুদ্রগামী জাহাজে সামরিক সরবরাহ নিয়ে আসা। এটা হতো সময়সাপেক্ষ। কেন শ্রীলংকার নেতৃত্ব সে সময়ে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধের জন্য উদ্যোগী হলো না? তারা ঢাকা এবং অন্যান্য স্থানে কী ঘটছে, সেটা জানত না- এমন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। গণহত্যা কিংবা অন্য যে কোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার পাকিস্তানের সামরিক সরকারের রয়েছে- এমন বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য নয়। ইয়াহিয়া খান সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন এবং বলপূর্বক ক্ষমতা দখল করেছিলেন। তার কোনো বৈধতা ছিল না। বৈধতা প্রকৃতপক্ষে ছিল বাংলাদেশে ১৭ এপ্রিল গঠিত সরকারের। কারণ ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে জনগণ ভোট দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগকে এবং এ দলের ১৬৭ জন সদস্য পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য যথেষ্ট ছিল। শ্রীলংকার নেতৃত্বের কাছে এসব তথ্য নিশ্চয়ই ছিল।

শ্রীলংকা বাংলাদেশ থেকে কিছুটা দূরে। কিন্তু সে সময়ের বার্মা (এখনকার মিয়ানমার) অনেক কাছের, প্রকৃত অর্থেই প্রতিবেশী। সে দেশের সরকারকেও কিন্তু বাংলাদেশ তখন পাশে পায়নি, বরং তারা ছিল গণহত্যাকারীদের পক্ষে। ডিসেম্বরে যখন পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর পরাজয় আসন্ন, তখন অনেক পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে মিয়ানমারে পালিয়ে যায়। সেখান থেকে তারা নিরাপদে চলে যায় পাকিস্তানে। সে সময়ে মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা এ সুযোগ

করে দেয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয় নিয়ে যাদের আগ্রহ, তারা কি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের প্রশ্নে শ্রীলংকা ও মিয়ানমারের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করার কথা ভাবতে পারেন না? খুব কাছের একটি দেশে দিনের পর দিন নিরীহ নারী-পুরুষ-শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে, অথচ ওই দুটি দেশ কোনো প্রতিবাদ তো দূরের কথা, পক্ষ নিল ঘাতকদের? তাদের স্বার্থ কী ছিল?

মন্তব্য করুন