ব্রেভহার্ট পাইলট

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০১৮

মমতাজ লতিফ

এ লেখাটি যখন লিখছি, তখনও তার স্ত্রী, একমাত্র সন্তান মাহির মা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তার জ্ঞান নেই। জ্ঞান ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই মাত্র জানলাম, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। কেন এই দক্ষ, অভিজ্ঞ পাইলটকে অভিনন্দন জানাচ্ছি, যা আরও ক'দিন আগেই লিখব বলে ঠিক করেও লিখতে পারিনি সাংসারিক সমস্যার কারণে। অথচ লেখা জরুরি ছিল, তা এখন লিখছি। ব্ল্যাকবক্স পাওয়া গেছে। আশা করি, এর প্রাপ্ত ডাটার সঠিক বিশ্নেষণের মাধ্যমে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সঠিক কারণ উদ্ঘাটিত হবে। তবু কতগুলো ঘটনা তথ্যসূত্রে জেনে মনে হয়েছে- ১. পাইলট আবিদ দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, আঁচ করতে পেরেছিলেন; ২. তিনি কিছু সংখ্যক যাত্রীর প্রাণ বাঁচাতে চেষ্টা করেছিলেন, যা প্রকৃতপক্ষে করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যাত্রীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি কাত হয়ে গিয়েছিল। আমার বিশ্বাস, এটি পাইলট বিপদ আঁচ করে স্বেচ্ছায় করেছিলেন। হতে পারে, সামনের রানওয়েতে থাকা কোনো 'বাধা' থেকে বিমানকে কাত করে সরিয়ে রানওয়ের বাইরে ধুলার মাঠে ক্র্যাশল্যান্ড করেছেন, যাতে পেছনের দিকের আগুন মাঝে ও সামনে ছড়িয়ে পড়ার আগেই বিমানটি ভেঙে যায় এবং ভাঙলে এটির দুই টুকরো হওয়ার সম্ভাবনা (কার্যত আশঙ্কা) থাকবে। দুই টুকরো হলে সামনের অংশের যাত্রীরা প্রাণে বেঁচে যাবে। আমার বিশ্বাস, পাইলট এমনটি ভেবেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে আমরা দেখতে পেয়েছি, পোতটি দুই টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েছে। প্রায় ২০ জন যাত্রী এবং পাইলট নিজেও বেঁচে ছিলেন এক দিন-এক রাত। আমার আরও মনে হয়েছে, যাত্রীদের কেউ কেউ শিশুসন্তান, অপরকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেরাও মারা গেছেন। নতুবা আরও ৪-৫ জন লাফিয়ে নামতে পারতেন। কো-পাইলট পৃথুলা রশীদ, অন্য ক্রুরা অবশ্যই অনেক যাত্রীকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছেন। নতুবা সামনের অংশ থেকে তাদের বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল বলে মনে হয়। মনে হওয়ার বড় কারণ, পাইলট আবিদ সুলতান দুর্ঘটনার পর সেদিন সে রাতে বেঁচে ছিলেন। অথচ পরদিন মারা যান। এটা কেন হলো জানি না। প্রশ্ন উঠেছে মনে, পাইলট সবচেয়ে মূল্যবান প্রাণ, তিনি আহত অবস্থায় থাকলে প্রথমেই তাকে সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে দিল্লি বা সিঙ্গাপুরে নেওয়ার কোনো পদক্ষেপের কথা শুনতে পেলাম না। দিনের পর রাতে যে ব্যক্তি বেঁচে থাকে, তাকে এয়ারলাইন্সে দিল্লিতে পাঠালেন না কেন? ডেইলি স্টারে দেখছি- কাঠমান্ডু বিমানবন্দরের ম্যানেজার পাইলটের সামনে একটি থাই বিমানকে আঘাত করা থেকে নিজের বিমানটিকে সরিয়ে নিয়ে ফুটবল মাঠে নামানোর ফলে দুই বিমানের বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে প্রাণহানির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রশংসা করেছেন। আশ্চর্য, এ ক'দিন ধরে আমি এটাই ভাবছি যে, অবশ্যই পাইলট সামনে কোনো কিছু দেখে সেটিকে এড়াতে, অনেক যাত্রীর মৃত্যু এড়াতে ফুটবল মাঠে বিমান অবতরণ করান। অবতরণের সময়ও সচেষ্ট থেকেছেন নিজের বিমানের যাত্রীদের কিছু সংখ্যককে বাঁচানোর এবং সফলভাবে ২০ জন যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়েছেন, যেখানে সারাবিশ্বে বিমান দুর্ঘটনায় যাত্রী, ক্রুদের প্রাণে বাঁচা প্রায় অসম্ভব, দুর্লভ ঘটনা। পাইলট আবিদ একটি মিরাকল ঘটিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন- তিনি কতটা দক্ষ, সাহসী, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে পারঙ্গম ও বুদ্ধিমান। এটা তো বাস্তব, তিনি রানওয়েতে প্লেন দেখে সে প্লেন ও সে রানওয়ের বাইরে বিমানকে নিয়ে গিয়ে যতটা সম্ভব কম প্রাণহানি ঘটিয়েছেন। যখন তার প্লেনটি সামনে খুব কাছেই রানওয়েতে কোনো বাধা দেখছেন, তখন তিনি বুঝে নিয়েছেন- কী হতে যাচ্ছে। তাই বুঝে ঠাণ্ডা মাথায় যতটা সম্ভব কম যাত্রীর মৃত্যুর বিনিময়ে দুর্ঘটনাটা সংঘটনের চেষ্টা করেছেন। ব্রেভহার্ট পাইলট আবিদ, আপনাকে বেঁচে থাকলে আজকে একটি বিশাল অভিবাদন জানাতাম। প্রিয় পুত্রের জন্য প্রাণটিকে ধরে রাখতে পারলেন না বটে; কিন্তু বেশ কিছু যাত্রীকে তো বাঁচিয়েছেন। আপনি বাঁচলে আপনার মুখে শুনতাম পৃথিবীর এক রোমাঞ্চকর বিয়োগান্ত বিমান দুর্ঘটনার শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী। কলম্বিয়ার ফুটবল খেলোয়াড়দের বহনকারী সেই নব্বইয়ের দশকে সংঘটিত বিমান দুর্ঘটনার রোমাঞ্চকর, অবিশ্বাস্য কাহিনীটি মনে পড়ছে। কোনো কোনো মৃত্যু আমাকে ভয়ানক আঘাত করে। গুলশান ক্যাফেতে নিহত ফারাজকে ব্রেভহার্ট ডেকেছিলাম। আজ পাইলট আবিদ সুলতান, আপনাকে ব্রেভহার্ট ডাকছি। প্রিয় পাইলট, আপনাকে অভিবাদন। ব্রেভহার্ট প্রাণপ্রিয় মাহি, বাবার মতো তুমিও ব্রেভহার্ট। তুমি বাবাকে হারিয়েছ, যে বাবাকে আমরা অভিবাদন জানাই, স্যালুট করি। প্রিয় মাকেও হারিয়েছ। মাহি, পৃথিবীটা ভয়ঙ্কর, আবার সুন্দরও। বাবা-মাহীন পৃথিবীতে তোমার জন্য অনেক স্বজন, শিক্ষক, প্রিয় বন্ধুরা এবং আমরা, বিশেষ করে আমি আছি তোমার পাশে। খুব শক্তভাবে তোমার হাত ধরতে চাই। দিতে চাই এক গভীর মমতা ও বিশ্বাসভরা আলিঙ্গন। তোমাকে বাবা-মার স্বপ্ন পূরণে পৃথিবীর নিয়মে সব কাজ করতে হবে। পরীক্ষাটা আরও ভালোভাবে দেবে, আমি নিশ্চিত। ব্রেভহার্টরা সব বাধা জয় করে, সবশেষে তারাই বিজয়ী হয়, তাই না? একদিন, যেদিন তোমার ইচ্ছা হবে, সেদিন তোমার সাথে দেখা হবে- ততদিন তোমাকে খেতে হবে, ঘুমাতে হবে। পড়াশোনা, খেলাধুলা করতে হবে। শোনো, যেদিন আমাদের বন্ধুর ছেলে, জাগরণী প্রকাশনীর মালিক তরুণ দীপন জঙ্গিদের হাতে খুন হয়, পরদিন ওর ছেলের জেএসসি পরীক্ষা ছিল। পৃথিবীর নিয়ম মানতে হয়, নতুবা হেরে যেতে হয়। তাই ওর ছেলে পরীক্ষা দিয়েছিল, পরপর সব পরীক্ষা দিয়েছিল। তুমিও 'ও' লেভেল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হও। ব্রেভহার্ট মাহি, তুমিও বিজয়ী হবে। তোমাকে অভিবাদন।

কলাম লেখক