মানবতার সেবায় রেড ক্রিসেন্ট

প্রকাশ: ০৮ মে ২০১৮

আফতাব চৌধুরী

ইতালির উত্তরে 'সলফেরিনো' নামক এক পল্লী প্রান্তরে ২৪ জুন, ১৮৫৯ সালে ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ ও মারাত্মক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সূর্যোদয় থেকে শুরু হয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলা ৯ ঘণ্টাব্যাপী এ যুদ্ধে উভয় পক্ষের দুই লক্ষাধিক সৈন্য অংশ নেয়। এতে প্রায় ৪০ হাজার সৈন্য হতাহত হয়। যুদ্ধে আহত সৈন্যরা বিনা চিকিৎসায় যুদ্ধক্ষেত্রের উন্মুক্ত প্রান্তরে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছিল। সুইজারল্যান্ডের যুবক হেনরি ডুনান্ট সে সময় ব্যবসায়ের প্রয়োজনে ফ্রান্সের তৃতীয় নেপোলিয়নের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে যুদ্ধের মর্মান্তিক, করুণ ও ভয়াবহ দৃশ্য দেখে ব্যথিত হন এবং যে উদ্দেশ্যে তিনি সলফেরিনোতে এসেছিলেন, তা পরিত্যাগ করে আশপাশের গ্রামের মহিলা ও যুবকদের ডেকে এনে অস্থায়ী সেবাকেন্দ্র তৈরি করে আহতদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। এ থেকে রেড ক্রস নামীয় সেবা প্রতিষ্ঠানটির জন্ম হয় এবং ক্রমে রেড ক্রস এক আন্তর্জাতিক সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে সারাবিশ্বে প্রায় দুইশ' বছর ধরে আর্তমানবতার সেবা করে যাচ্ছে এবং একটি আন্দোলন হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত।

রেড ক্রস, রেড ক্রিসেন্ট ও রেড ক্রিস্টাল জাতি, উপজাতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, শ্রেণি অথবা রাজনৈতিক বিশ্বাসে কোনো প্রকার বৈষম্যের সৃষ্টি করে না। একমাত্র প্রয়োজনের তাগিদে ব্যক্তির যন্ত্রণা দূর করা এবং জরুরি অবস্থায় দুর্দশাগ্রস্তের সেবায় অগ্রাধিকার দানের প্রচেষ্টা চালায়। রেড ক্রস, রেড ক্রিসেন্ট ও রেড ক্রিস্টাল পক্ষপাতহীন হয়ে বিশ্ববাসীর সেবায় কাজ করে। রড ক্রস, রেড ক্রিসেন্ট ও রেড ক্রিস্টাল একটি নিঃস্বার্থ ও স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রতিষ্ঠান- এর মধ্যে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। এ সংস্থার সদস্যবৃন্দ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে মহান মানবসেবার কাজে নিয়োজিত এবং এতে ব্যক্তিস্বার্থ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা থাকতে পারে না। যে কোনো দেশে শুধু এটি রেড ক্রস, রেড ক্রিসেন্ট বা রেড ক্রিস্টাল প্রতিষ্ঠান নামে থাকতে পারে।

পৃথিবীব্যাপী এটি একটি পরিবারের মতো। ব্রিটিশ ভারতের অধীনে ইন্ডিয়া রেড ক্রস সোসাইটি গঠিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার ফলে পাকিস্তানের ভৌগোলিক এলাকায় পূর্বের আইনের সামান্য রদবদল করে পাকিস্তান রেড ক্রস সোসাইটির অধীনে পূর্ব পাকিস্তান শাখা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান রেড ক্রস সোসাইটি গঠিত হয়, যা বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডে পরিচালিত হতো। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয়ের পর পাকিস্তান রেড ক্রস সোসাইটির পূর্ব পাকিস্তান শাখা বাংলাদেশের জাতীয় সোসাইটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সরকারের কাছে স্বীকৃতি লাভের জন্য আবেদন করে। ৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের এক আদেশের মাধ্যমে 'বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি' গঠিত হয়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনের আওতায় চলে আসে। এর পর ৩১ মার্চ ১৯৭৩ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি 'বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি' আদেশ ১৯৭৩ (পিও ২৬) জারি করেন। এই আদেশবলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি স্বীকৃতি লাভ করে। ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ সালে ২২তম আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের তেহরান সম্মেলনে বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি আন্তর্জাতিকভাবে পূর্ণ স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৮৮ সালের ৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির আদেশে সংবিধান সংশোধনের ফলে বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটির নাম পরিবর্তিত হয়ে 'বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি' হয়।

পরিবেশকর্মী, বৃক্ষরোপণে পুরস্কারপ্রাপ্ত