বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৩০ লাখ নারী-পুরুষ-শিশুর আত্মদানে অর্জিত বাংলাদেশে তিনি একই সঙ্গে গ্রহণ করেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ। এদিন জাতির উদ্দেশে বেতার ভাষণে তিনি বলেন, 'প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জনাব খন্দকার মোশতাক আহমদ আমাকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান।' তিনি এটাও বলেন, 'গত ১৫ আগস্ট কতিপয় অবসরপ্রাপ্ত ও চাকুরিরত সামরিক অফিসার এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবার-পরিজনকে হত্যা করে। জনাব খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে সামরিক আইন জারি করেন।' বাংলাদেশের রাজনীতির এক অস্থির ও ঝড়ো সময়ে বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েম হয়তো কিছুটা বাধ্য হয়েই এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে থাকার সময়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার দায় কি তিনি এড়াতে পারেন?

আমাদের জানা আছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে একটি খুনিচক্র অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখল করেছিল। এ চক্র মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ২৪ আগস্ট সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ খুনিচক্রকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের জন্য অভ্যুত্থান সংঘটিত করেন। এ সময়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনী প্রধানের পদ থেকে অপসারণ এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত ফারুক-রশিদ-ডালিম চক্রকে দেশ থেকে বিতাড়ন করা হয়। খন্দকার মোশতাক আহমদকেও রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হয় এবং প্রধান বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েম এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৬ নভেম্বর রাতেই 'সিপাহী বিদ্রোহ' নামে পরিচিত আরেকটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ৭ নভেম্বর প্রত্যুষে জিয়াউর রহমান নিজেকে 'সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও সেনাবাহিনী প্রধান' হিসেবে ঘোষণা করেন। এটা বিস্ময়কর যে, ৭ নভেম্বর রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াউর রহমান প্রবল ক্ষমতাধর হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পরও বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতি, একই সঙ্গে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদে থেকে যেতে আপত্তি করেননি। তিনি ৭ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেন, 'জনাব খন্দকার মোশতাক আহমদের দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের যে মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তা যে কোনো উন্নয়নশীল দেশে বিরল এবং সেই দেশের জনগণের জন্য গর্বের বিষয়।' অথচ খন্দকার মোশতাকের এই ক্ষমতা গ্রহণ ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিষ্ঠুর উপায়ে হত্যার মাধ্যমে, যা অসাংবিধানিক ও রাষ্ট্রদ্রোহ।

বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেছিলেন, যাতে সামরিক শাসন জারি করাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। আর এটা এমন এক সময়ে তিনি করেছিলেন, যখন জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েম যখন দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখল এবং এর হোতাদের বিচারের পদক্ষেপ গ্রহণ তো দূরের কথা, মৌখিক নিন্দা জানাতেও ব্যর্থ হন।

বিচারপতি সায়েম এ গ্রন্থ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন মৃত্যুর পর। কিন্তু ১৯৮৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ক্ষুদ্র পরিসরের গ্রন্থটি প্রকাশে সম্মতি দেন। মাওলা ব্রাদার্স ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে বইটির চতুর্থ মুদ্রণ প্রকাশ করে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে পরপর দু'দিনের (৬ ও ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫) দুটি বক্তব্য আমি বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েম রচিত 'বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি' গ্রন্থ থেকে নিয়েছি। এতে তিনি লিখেছেন, 'যেসব পরিস্থিতিতে আমি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করি এ লেখাতে তা বলার চেষ্টা হয়েছে।'

১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি দুই ব্যক্তির বিষয়ে তার অস্বস্তি-কষ্ট-যন্ত্রণার কথা বলেছেন :এক. জিয়াউর রহমান, যার হাতে তিনি প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। দুই. বিচারপতি আবদুস সাত্তার, যাকে তিনি রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী নিয়োগ করেছিলেন এবং 'সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস' করতেন; জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে যাকে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি তাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করে এবং তিনি নির্বাচিত হন।

বিচারপতি সায়েম আরও কয়েকজন ব্যক্তি সম্পর্কে তার বিরূপ মনোভাব গোপন করেননি। তারা হচ্ছেন সেই সব 'জননেতা', যাদের সমন্বয়ে তিনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের অভিলাষ ব্যক্ত করেছিলেন। এরা যে প্রকৃতপক্ষে জিয়াউর রহমানের কূটকৌশলে নিযুক্ত হয়েছিল, সেটা কি তিনি বুঝতে পারেননি? নাকি নিজের আসনের বাইরে কোনো কিছুর প্রতি তার মনোযোগ ছিল না? আমাদের জানা আছে, বিচারপতি সায়েম ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসেই বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা ও ক্যুর রাজনীতির যে ঘৃণ্য অধ্যায়ের সূচনা ঘটে, সেটা তিনি খুব কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেন। তিনি প্রথমে এক নম্বর উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও পরে প্রধান সামরিক প্রশাসক এবং সবশেষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে যে ভুল লোককে বেছে নিয়েছিলেন, সেটা 'বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি' বইয়ে অকপটে স্বীকার করেছেন। এ ব্যক্তি হচ্ছেন জিয়াউর রহমান। তিনি লিখেছেন, 'প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার আগ মুহূর্তে আমি জিয়াকে বলি, আমি যেহেতু নির্বাচন করে যেতে পারলাম না, তাঁকে অনুরোধ করব তিনি যেন নির্বাচন দেন। তিনি আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেন যে, তিনি নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন। শুনে আমি খুশি হই। কিন্তু আমি ভাবতে পারিনি যে নির্বাচনে তিনি নিজেই অংশ নেবেন। সে রকম ক্ষেত্রে সেনাপ্রধান থাকা অবস্থাতেই এবং সামরিক আইনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেও অর্থাৎ ক্ষমতাসীন হয়েই তিনি নির্বাচন করবেন এবং সেই নির্বাচনে নিজে অংশগ্রহণ করবেন, এমন চিন্তা তখন আমার মাথায় আসেনি।'

বাংলায় প্রবাদ আছে- 'শিয়ালের কাছ মুরগি বর্গা'। বিচারপতি সায়েম ঠিক সেটাই করেছিলেন। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটা তিনি করেছেন সরল বিশ্বাসে।

জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব (যার শীর্ষ দুটি পদে রয়েছেন খালেদা জিয়া ও তার পুত্র তারেক রহমান, যারা দুর্নীতির কারণে আদালত দ্বারা দণ্ডিত। জিয়াউর রহমান কর্তৃক ১৯৭৮ সালে এ দল প্রতিষ্ঠার সময় গঠনতন্ত্রের একটি ধারায় ছিল- দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত কেউ দলের পদে থাকতে পারবেন না। কিন্তু খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নেতৃত্ব সে ধারা রদ করেছে) নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন দাবি জানানোর সময়ে ইতিহাসের এ অধ্যায় স্মরণ রাখতে আদৌ উৎসাহী নয়। আমরা এটাও স্মরণ করতে পারি যে, জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা তো ছিলই না; বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতাও ছিল অকল্পনীয়।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তার একটি ছিল 'জাগোদল' নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন। এ দল থেকেই তিনি ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। জাগোদলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে সামনে রেখে। তবে সবার জানা ছিল, কেবল প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট নয়- দলটি 'বেসামরিক শাসক' হিসেবে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার বাহন হতে চলেছে। বিচারপতি আবদুস সাত্তার ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। তাকে নির্বাচন প্রক্রিয়া সক্রিয় করার জন্য বিশেষ সহকারী নিযুক্ত করেছিলেন রাষ্ট্রপতি সায়েম। কিন্তু তিনি যে জিয়াউর রহমানের 'প্লান্টেড', সেটা বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতির ভাষ্য অনুযায়ী- 'এ বিষয়টি তিনি ধারণাই করতে পারেননি।' তিনি বইয়ে বলছেন, যাদের উপদেষ্টা কাউন্সিলের বেসামরিক সদস্য হিসেবে মনোনীত ও নিয়োগ দিয়েছিলেন তাদের প্রায় সকলে সেনানিবাসে গিয়ে তাদের কাছে নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করেন। বইয়ের ৩৫ পৃষ্ঠায় তার অকপট ভাষ্য- '১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিশেষ সহযোগীর (বিচারপতি আবদুস সাত্তার) নেতৃত্বে উপদেষ্টা কাউন্সিলের কতিপয় সিনিয়র সদস্য আমাকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার অনুরোধ করেন। তারা বলেন, তারা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানের অধীনে কাজ করতে চান।'

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগদান করেন, যাকে বিচারপতি সায়েম মনে করেন- 'এ পদোন্নতি' অবশ্যই কোনো কৃতকর্মের পুরস্কার ছিল। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল দুস্কর্মের পুরস্কার। বাংলাদেশে সামরিক শাসনকে বৈধতাদানের পুরস্কার। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের ধারা থেকে বাংলাদেশকে সরিয়ে আনার সুগভীর চক্রান্তের পুরস্কার; অন্ধকার যুগে ঠেলে দেওয়ার পুরস্কার।

বিচারপতি সায়েম এটাও বিস্ময়ের সঙ্গে অবলোকন করেছেন, 'রাজনৈতিক দলগুলো সেনানিবাসে গিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থন জোগাড়ের চেষ্টা করত।' তবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে এ ধারায় ব্যতিক্রম, সেটা তার দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনি লিখেছেন, রাজনীতিকরা আলাপ-পরামর্শের জন্য সেনানিবাসে যেতেন। অবশ্য আওয়ামী লীগ সেখানে যেত না।' [পৃষ্ঠা ১৮]।

বিচারপতি সায়েম বঙ্গভবন ছেড়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানের গণভোটের প্রহসন (৩০ মে, ১৯৭৭) দেখেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, 'সেই গণভোটে হ্যাঁ বাক্সে এত বেশি ভোট পড়ে যে জনগণ সেই ফলকে হাস্যকরভাবে অবিশ্বাস্য মনে করে।'

যে জিয়াউর রহমানের হাতে তিনি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল- রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষমতা ও সমাজতন্ত্র বাদ দেওয়া। এর ওপর যে গণভোটের আয়োজন করা হয়, সেটা চরম প্রহসন বৈ কিছুই ছিল না।

বিচারপতি সায়েম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে অন্তত দু'বার একান্ত আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, '১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময়ে আদালতগুলোর ব্যাপারে গোপনে আমার সঙ্গে পরামর্শ করার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছিলেন। আমি তাকে বলেছিলাম যে ইস্যুটি আলোচনা না করাই ভালো হবে; কারণ পাকিস্তান আমলে সুপ্রিম কোর্টের একজন প্রধান বিচারপতিকে এ রকম সাংবিধানিক আলোচনায় টেনে আনা হয়েছিল, যা জনগণ পছন্দ করেনি।'

২৫ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, '১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে বা মার্চের শুরুতে শেখ মুজিব- যিনি চতুর্থ সংশোধনীর বলে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন- আমাকে বলেন যে, চতুর্থ সংশোধনী একটি সাময়িক পদক্ষেপ, তিনি সংবিধান সংশোধনীর পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন।'

রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে বিচারপতি সায়েমও রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির পরিবর্তন চেয়েছেন। তিনি এ সংক্রান্ত খসড়া তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলেন তার বিশেষ সহকারী বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে, যিনি এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র উৎসাহ দেখাননি। কেনই-বা দেখাবেন? তিনি যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বিশ্বস্ত প্রতিনিধি, যার কাজ ছিল এই ঘৃণিত সামরিক শাসক যেন তার ক্ষমতালোভ চরিতার্থ এবং বাংলাদেশকে পাকিস্তান আমলের মতো ধর্মান্ধ ও পশ্চাৎপদ যুগে ফিরিয়ে নিতে পারেন, সেটা নির্বিঘ্ন করার যাবতীয় দুস্কর্মের পথ মসৃণ করে দেওয়া। জিয়াউর রহমানই রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি বহাল রাখতে চেয়েছেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এই আবদুস সাত্তারকেই পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছিল।

বাংলাদেশের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র বিষয়ে কিছু কথা আমরা জানতে পারি বিচারপতি আবুসাদাত সায়েমের 'বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি' বইয়ে। তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর ২০ বছর বেঁচে ছিলেন। তার তো আরও অনেক কথা বলার ছিল। কেন যে

বললেন না!

তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকাকালেই ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন (১৯৭২) বাতিল ঘোষণা করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটে জড়িত হাজার হাজার অপরাধী এর ফলে মুক্তি পেয়ে যায়। ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দলবিধি জারি করা হয়; যাতে বলা হয়, বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে সামরিক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। কয়েক দিন পর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে তিনি আরও জানান, 'জীবিত বা মৃত কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার ব্যক্তি পূজার উদ্রেক বা ব্যক্তিত্বের মাহাত্ম্য প্রচার অথবা বিকাশ নিষিদ্ধ' থাকবে। রাজনীতি থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্বাসিত করার ঘৃণ্য অভিলাষ থেকেই যে এটা করা হয়েছিল- সে বুঝতে কারও সমস্যা হয় না। তিনি 'যে শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা' রেখেছিলেন, তার চাওয়া অনুযায়ীই এটা তিনি করেছেন- সেটা বুঝতে আমাদের সমস্যা হয় না। কিন্তু তিনি তো বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন; সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন। এ পদে থাকাকালেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়, কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি হয়। তার রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদে থাকাকালেই বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালনের জন্য এমনকি মিলাদ মাহফিলের মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন এবং বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাসভবনে ফুল প্রদানের কর্মসূচিতে বাধাদান করা হয়। তার দায়িত্ব পালনকালেই কিন্তু ১৯৭৬ সালের ১৫ জানুয়ারি ছাত্রীদের আবাসিক হল রোকেয়া হলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রাবাস এবং বুয়েট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিডিআর সদস্যরা হানা দিয়ে শত শত ছাত্রছাত্রীকে আটক করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের সামনে প্রখর রোদে সারাদিন অভুক্ত রাখার পর সন্ধ্যায় বেত্রাঘাতে জর্জরিত করে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ নিবন্ধের লেখকও ছিলেন সেদিনের এই অমানুষিক অত্যাচারের শিকার। এ ঘটনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল হক চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কাছে নয়; করুণা ভিক্ষা করতে গিয়েছিলেন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানের কাছে। এর কিছুদিন পরই অধ্যাপক শামসুল হক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন, যাকে 'সর্বময় ক্ষমতাধর ব্যক্তির' অনুকম্পাপ্রাপ্তি হিসেবেই আমরা ধরে নিতে পারি। কিন্তু, হায়! বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি তার 'বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি'  গ্রন্থে এ ধরনের আরও অনেক ঘটনা, কুৎসিত ঘটনা উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করলেন না!
সাংবাদিক
ajoydg@gmail.com

মন্তব্য করুন