কিশোর-তরুণদের কথা শুনুন

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

খায়রুল কবীর খোকন

দুই নির্বোধ ড্রাইভার দুটি বাস প্রতিযোগিতামূলকভাবে চালিয়ে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার প্রধান সড়কে শিক্ষার্থীদের ওপর তুলে দিলে দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটে এবং আহত হয় আরও জনাবিশেক ছাত্রছাত্রী। তার পরিণতিতে রাস্তায় নেমে আসতে থাকে কিশোর ও তরুণ শিক্ষার্থীরা। সেই আন্দোলন এমন এক পর্যায়ে চলে যায় যে, সরকার বেশ বিচলিত হয়ে পড়ে।

সেই কিশোর-তরুণদের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ কেবল নিরাপদ সড়ক দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা রূপ নিয়েছিল রাষ্ট্র-প্রশাসনের সব দুর্নীতি ও নির্যাতনমূলক অঘটনগুলো, সামগ্রিক দুঃশাসনসহ সব অনাচারের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ একটি সফল আন্দোলনে। আমাদের এ দেশের অগণতান্ত্রিক ও সুশাসনহীন রাষ্ট্রকাঠামো যে সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার বদলে শুধু অপশাসনের শিকার বানাতেই নিয়োজিত, তার প্রমাণ মেলে এবার হাতেনাতে। কিশোর-কিশোরী বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সরকারি আমলাদের, ক্ষমতাধর রাজনীতিকদের, মন্ত্রীদের পর্যন্ত- তারা কেউই আইনের শাসন কায়েমে অঙ্গীকার পালনে আগ্রহী নন, রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করে বেড়ান, সুশাসন কাকে বলে তারা তা জানারও চেষ্টা করেন না। ক্ষমতা রক্ষার স্বার্থে মুখেই কেবল সেসব বলে বেড়ান নীতি কথার মতো, তোতাপাখির মতো আওড়ান সেসব। ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা নিজের আইনের তোয়াক্কা করেন না কখনোই, সেটা প্রতিনিয়ত, ঘটে বারবার, সেসবের কোনো প্রতিকার নেই এ দেশে- তা প্রমাণিত সত্য।

কিশোরদের কয়েকদিনের রাস্তার বিক্ষোভে, দোর্দণ্ড প্রতাপে রাস্তায় অনাচার চালানো জনপরিবহন-মালিক ও চালকসহ শ্রমিক-কর্মচারী গোষ্ঠীর টনক নড়েছিল। তারা সড়ক পরিবহন আইন বুঝতে শুরু করেছিল। বলা চলে, ঠেকায় পড়ে। কিশোর-কিশোরীরা বিদ্যালয়ের ক্লাসরুম ছেড়ে রাস্তায় নেমে তাদের আইন-কানুন শিখিয়েছিল কয়েকটা দিন ভালোভাবেই। সারাদেশের শান্তিপ্রিয় ও ক্ষমতাধরদের প্রতাপে অসহায় মানুষ প্রশংসা করেছিল কিশোরদের সেই উদ্যোগের। এমনকি পুলিশের কর্তা ব্যক্তিদের, বড় আমলা ও মন্ত্রীদের পর্যন্ত আইনের প্রয়োগ শিখিয়ে ছেড়েছিল তারা। সারাদেশ অবাক হয়ে দেখেছিল- একটা রাষ্ট্রীয় নৈরাজ্যময় দশা থেকে উদ্ধার পাওয়ার লক্ষ্যে কিশোর-কিশোরীরা কতটা সচেতনভাবে তাদের বিক্ষোভের প্রকাশ ঘটাতে পারে অত্যন্ত যৌক্তিক পন্থায়, অহিংস ও শতভাগ শান্তিপ্রিয় পদ্ধতিতে।

সেই আন্দোলনটি যখন একটা ইতিবাচক পরিণতির দিকে যাচ্ছিল, তখনই সরকারের ওপর মহলের বিভ্রান্তিকর নির্দেশে পুলিশ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা একত্র হয়ে কিশোর-কিশোরীদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও অহিংস বিক্ষোভ মিছিলের ওপর, এমনকি সুশৃঙ্খল মানববন্ধনের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। স্মরণ করা যেতে পারে, এর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী-তরুণ-তরুণীদের আন্দোলনেও পুলিশ ও ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা একযোগে হামলা করে বারবার। প্রথমবারে যেমন অনেকেই আহত হয়েছিল, পরেরবারে আরও বেশি সংখ্যায় আহত ও নির্যাতিত হলো কিশোর-তরুণরা। পুলিশের নির্মমতা ছিল নজিরবিহীন। তারা হামলাকারীদের বাধা দিল না, বরং তাদের সঙ্গে নিয়ে একযোগে আন্দোলনরত কিশোর-কিশোরীদের ওপর হামলা চালাল। তারপর চলল নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় আন্দোলনকারী কিশোর-তরুণদের আটক করার পর্ব। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সে কাজটি সফলভাবেই সম্পন্ন করল। একশ'র মতো কিশোর-তরণকে গ্রেফতার করল তারা। আটকের পরে সেসব কিশোর-তরুণের ওপর পুলিশ রিমান্ডের নামে অত্যাচার চলে ব্যাপক হারে (আটককৃতরা সবাই সেই অভিযোগ আদালতে করেছে)। তারা সবাই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী (অল্প কয়েকজন বয়স্ক, পেশাজীবী পুরুষ ও নারী)। এসব আন্দোলনকারী কিশোর-তরুণসহ অন্যদের আটকের বিরুদ্ধে দেশের রাজনীতিকরা, দুনিয়াব্যাপী মানবাধিকার কর্মীরা সোচ্চার হলেন। এমনকি নোবেলজয়ী ব্যক্তিদের আবেদন-নিবেদনেও সরকার পক্ষ সহজে সাড়া দিল না। শেষ পর্যন্ত ঈদুল আজহার আগে আদালত থেকে বেশিরভাগ কিশোর-তরুণ জামিন পেল। এখনও বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আটক আছেন তথাকথিত উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে।

একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে পরিচালিত শান্তিপূর্ণ অহিংস আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মারাত্মক ট্রমা সৃষ্টি করা হলো- পুলিশ, ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের যৌথ হামলার মাধ্যমে। এমনকি তাদের বাবা-মা ও অভিভাবকদের মাঝেও সেই ট্রমা সৃষ্টি হলো। তার স্থায়ী ক্ষত কখনও শুকাবে না হয়তো, ভুক্তভোগী প্রত্যেকেই সারাজীবন সেই ট্রমা দ্বারা আক্রান্ত থাকবে।

সারাদেশের অভিভাবকদের মধ্যে বিষয়টা ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে- এই কিশোর-কিশোরীদের মাঝে পুলিশ ও অন্যসব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং একই সঙ্গে সরকারি-ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসীরা নিষ্ঠুর হামলা চালিয়ে যে ট্রমা তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে, তা কোনোদিন তারা ভুলতে পারবে না। পুলিশ রিমান্ডে তাদের ওপরে নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। সেটা আরেকবার 'ট্রমা' সৃষ্টি।

রাষ্ট্রীয় অবিচার ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, রাষ্ট্র-প্রশাসনের অনাচারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা তো প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার, প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত তা। আমাদের দুর্ভাগ্য, যেসব রাজনীতিক দীর্ঘকাল মানবাধিকারের জন্য, মৌলিক অধিকারের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য রাস্তায় লড়াই করে এসেছেন, নিজেরা স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদীদের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বারবার, তারাই আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রের অন্য নাগরিকদের, বিশেষভাবে সাধারণ জনতার সব অধিকারের কথা ভুলে যান অকাতরে। অনাচারের বিরুদ্ধে, আইনের শাসনের জন্য, সুশাসন কায়েমের জন্য, কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা রাস্তায় নামবে, সেটাতে দোষের কিছুই নেই। দোষের বিষয়টা হচ্ছে, রাষ্ট্র কর্তৃক তাদের ওপর শ্বেত-সন্ত্রাস চালিয়ে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে তাদের অধিকারবঞ্চিত করা, তাদের মাঝে স্থায়ীভাবে 'ট্রমা' সৃষ্টি করা, যা তাদের সারাজীবন একটা 'নাইটমেয়ার' (দুঃস্বপ্ন)রূপে তাড়া করে বেড়াবে, যা থেকে তারা কোনোদিন মুক্তি পাবে না।

সরকার তার মতো সমাধান পন্থা বের করে চলেছে, যা কেবলই ব্যর্থ প্রমাণিত হচ্ছে। আমরা আমজনতার পক্ষে, অন্তত একটা সমাধান পন্থা বের করার চেষ্টা করে দেখতে পারি। আমাদের দেশের কিশোর-কিশোরী (যদি ৯ বছর বয়স থেকে অনূর্ধ্ব ১৮ অবধি গ্রুপটিকে ধরা হয়) জনসংখ্যা হচ্ছে প্রায় আড়াই কোটি। আর তরুণ-তরুণী (১৮ বছর থেকে ২৮ বছর অবধি ধরা হলে) একইভাবে প্রায় আড়াই কোটি। এই পাঁচ কোটি আমাদের জনসংখ্যার প্রধানতম অংশ- তারাই আমাদের মূল ভবিষ্যৎ। এই নাগরিকদের আমাদের লালন-পালন করতে হবে অত্যন্ত সুচারু পদ্ধতিতে, বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ প্রয়োগে, বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার সর্বোত্তম পন্থায়। কোনো রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের 'ট্রমা' যেন তাদেরকে সারাজীবন দুঃস্বপ্নসম আতঙ্ক হয়ে তাড়িয়ে বেড়াতে না পারে, সেটাই রাষ্ট্র বিবেচনায় নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তাদের এই দুটি গ্রুপের জনগোষ্ঠীর জন্য দুটি ফাউন্ডেশন করা যেতে পারে। প্রতিটি ফাউন্ডেশন হবে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে। প্রতিটির পৃষ্ঠপোষক হবেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতির নেতৃত্বে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ড কাজ করবে প্রতিটি ফাউন্ডেশন পরিচালনায়। সদস্য সচিব হবেন একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ (তবে বয়সে ৫৫ থেকে ৬০-এর মধ্যে হতে পারেন)। অন্য সব সদস্য হবেন সমাজের বিশিষ্ট পেশাজীবীদের মধ্য থেকে নেওয়া প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা এই ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হবেন, থাকবেন বিভিন্ন উঁচু স্তরের পেশাজীবীরা। এখানে হবে অবিরাম গবেষণা কার্যক্রম, বিষয়বস্তু কিশোর সমস্যা (কিশোর ফাউন্ডেশনের ক্ষেত্রে) আর তরুণ সমস্যা (তরুণ ফাউন্ডেশনের বেলায়)। শুরুতেই অন্ততপক্ষে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটা বাজেট নিয়ে কাজে নামতে হবে, প্রতি বছরই এই বাজেট বর্ধিত রূপ পাবে। বাজেটের মূল অর্থ সরকার ও অবশিষ্টাংশ জনগণের স্বেচ্ছা অনুদানের ভিত্তিতে সংগৃহীত হবে। এই ফাউন্ডেশন দুটি কিশোর ও তরুণদের যাবতীয় সমস্যাবলি নিয়ে স্টাডি করে যাবে, সমাধান পন্থা বের করবে আর রাষ্ট্রকে তা বাস্তবায়নের জন্য চাপ প্রয়োগ করে যাবে। রাজধানী ঢাকায় ফাউন্ডেশনের বড় আকারের প্রশাসনিক অফিস ও গবেষণা ভবন থাকবে। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একটি করে ফাউন্ডেশন শাখা ভবন রাখা যেতে পারে। দুটি ফাউন্ডেশন একই রকমের প্রশাসনিক ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে যাবে- যথাক্রমে কিশোর সমাজ ও তরুণ সমাজের উন্নয়নে।

এই ফাউন্ডেশন দুটির প্রধান কাজই হবে- কিশোর সমাজ ও তরুণ সমাজের যে কোনো সমস্যার সমাধানে প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করা। কিশোর বা তরুণ সমাজ কোনো আন্দোলনে জড়ালে প্রথমেই তার বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা না নিয়ে এই ফাউন্ডেশনকে দিয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে রাষ্ট্রকে। কোনো অবস্থায়ই পুলিশি হামলার (রাষ্ট্রীয় অন্য কোনো বাহিনীর হামলার) শিকারে পরিণত করা যাবে না কিশোর ও তরুণ সমাজকে বা তাদের কোনো সদস্যকে। মাদকাসক্তি ও নানা ধরনের অপরাধ-প্রবণতাসহ ভয়ানক যেসব সমস্যায় কিশোর বা তরুণ সমাজ মহাসংকটে রয়েছে, সেসবের সমাধানেও গবেষণা কাজ চালাবে ফাউন্ডেশন। মোদ্দা কথা, কিশোর ও তরুণদের মানবিক-আর্থিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে যত প্রকার কর্মকাণ্ড দরকার, সবই করবে এই দুই ফাউন্ডেশন। শুরুটা এখনই দরকার, তারপর বেরিয়ে আসবে কর্মসূচির সম্প্রসারিত রূপগুলো।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ডাকসু সাধারণ সম্পাদক