বিজ্ঞানী নিউটনের দেওয়া গতির তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, প্রত্যেক ক্রিয়ারই প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কাজের ক্ষেত্রে নিউটনীয় এ বিখ্যাত সূত্র বাস্তবায়ন হওয়াই তো সার্থকতা! আপনি সারাদিন দেয়াল ধাক্কালেন, এক চুলও নাড়াতে পারলেন না। আপনি আসলে কোনো কাজই করলেন না। আপনার এ প্রচেষ্টাকে বিজ্ঞান কাজ বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে না। এ রকম যেসব কাজে ফল নেই, তা আপনি কেন করতে যাবেন? মঙ্গলবার সমকালের প্রথম পাতায় প্রকাশিত 'তদবিরে বদলায় সিদ্ধান্ত' শিরোনামে প্রতিবেদনটি পড়ে তা-ই ভাবছিলাম। তদবির তো এক বড় কর্ম! আহা কত মানুষের হাত-পা ধরতে হয়, অনুনয়-বিনয় করতে হয়, কোথাও অর্থ ঢালতে হয়, এর সঙ্গে জুতা ক্ষয় তো আছেই। এত কিছুর পরও যদি তাতে ফল না হয়, সে এক হতাশার কথা। না, এখানে হতাশ হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। কারণ কাজের ফল হয়েছে, তদবিরে বদলেছে সিদ্ধান্ত (!)।

জনপ্রশাসনে বদলি নিয়ে যে কত ধরনের তদবির রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। কোথাও টাকা, কোথাও মামা-চাচা, কোথাও ক্ষমতা আবার কোথাও উচ্চপদস্থদের ধরে তদবির হয়। এসব বিবেচনায় যার তদবির যত শক্তিশালী, তারটাই কাজে আসে। বদল হয় সিদ্ধান্ত। আশ্চর্যই বটে, সেদিন ফেসবুকে দেখা গেল একজন পোস্ট দিয়েছে, স্যারের (প্রশাসনের কর্মকর্তা) বদলি আমাদের কষ্ট দিয়েছে, এমন পরোপকারী মানুষ আর হয় না ইত্যাদি। আবার ক'দিন পরই তিনি জানাচ্ছেন, স্যারের বদলি স্থগিত হওয়ায় আমরা আনন্দিত।

আহা কী সার্কাস। সমকালের প্রতিবেদন সেটিই দেখিয়েছে, কয়েকজন কর্মকর্তার বদলির আদেশ হলো, তারা নতুন কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন, এরই মাঝে তাদের অগোচরে হঠাৎ তা বাতিল হয়। আবার অনেককে দেখা যায় বদলি হলো, তারপরও তার নড়ার খবর নেই। উল্টো প্রশাসনকে সে আদেশ প্রত্যাহার করতে হয়। বদলি সংক্রান্ত আদেশ প্রত্যাহারের যে হার সমকালের প্রতিবেদনে এসেছে তা উদ্বেগজনক। গত দুই মাসে প্রায় দেড়শ' কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও ৫০ কর্মকর্তার আদেশ বাতিল করতে হয়েছে। এমনকি একজন কর্মকর্তাকে মাসে তিনবার বদলি করে তা বাতিলও করতে হয়েছে।

তদবির কত শক্তিশালী হতে পারে তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ বোধ হয় প্রতিবেদনটি। প্রশাসনিক কাজের অংশ হিসেবেই পুনর্বিন্যাসের জন্য বদলি নিয়মিত ও স্বাভাবিক ঘটনা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক বদলি আদেশের পর তা বাতিল করা যেমন একদিকে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়, তেমনি স্বাভাবিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে সমস্যাও তৈরি করে।

প্রশাসনে অনেকে ভালো জায়গায় যাওয়ার জন্য তদবির করেন, অনেকে ভালো জায়গা আঁকড়ে থাকার জন্য তদবির করেন। এর বাইরে নানা স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়ও রয়েছে। সমকালের প্রতিবেদনেও তা এসেছে, যেমন স্থানীয় প্রভাবশালীদের কোনো কর্মকর্তা পছন্দ হলো না কিংবা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কর্মকর্তাকে ছাড়তে চান না- তখন তারাই ওই কর্মকর্তার হয়ে তদবিরে নামেন। আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-২১-এর ২-এ বলা হয়েছে, 'সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।' এখানে সরকারি কর্মকর্তাদের সর্বাবস্থায় জনসেবার কথা বলা হয়েছে। ফলে তার কাছে সুযোগ-সুবিধা, পোস্টিং ইত্যাদি জনসেবার চেয়ে বড় হওয়া উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে অন্যায় তদবির বলা চলে সংবিধানের লঙ্ঘন। হোক না সেটা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কাজ। তবে সব কাজই 'কাজ' নয়, এর মধ্যে অ-কাজও আছে। তদবিরও তার বাইরে কি?

mahfuz.manik@gmail.com

মন্তব্য করুন