দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত হোক

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০১৮

সুলতানা কামাল, মিজানুর রহমান, মেঘনা গুহঠাকুরতা, খুশী কবির, সুদীপ্ত মুখার্জী, মামুনুর রশীদ, সারা হোসেন, মেসবাহ কামাল, শিশির শীল, অনীক আসাদ, সঞ্জীব দ্রং, শামসুল হুদা, নির্মল চন্দ্র দাস, বিচিত্রা তিরকী, আইনুন নাহার রবীন্দ্রনাথ সরেন ও রোবায়েত ফেরদৌস

সংবিধানের আলোকে দেশের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দলিত ও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সমতলের আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এরপরও তারা মূলধারার জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের স্রোতধারায় একীভূত হতে পারেননি; কিন্তু আমাদের প্রতীতি, সংবিধানের মূল সুরকে ধারণ করে দলিত ও সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে গত ১ নভেম্বর ২০১৮ দেশে বসবাবসরত দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দিনব্যাপী জাতীয় কনভেনশন অনুষ্ঠিত হলো। কনভেনশনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চার শতাধিক দলিত ও আদিবাসী প্রতিনিধি, প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কর্মরত বেসরকারি সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংগঠন, সরকারের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও তরুণ সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উদ্বোধনী ও সমাপনী পর্বসহ তিনটি সমান্তরাল অধিবেশনে মোট ৬টি বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং সংশ্নিষ্ট সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের মতামতসাপেক্ষে জাতীয় কনভেনশন থেকে একটি ঘোষণাপত্র গ্রহণ করা হয়। বর্তমান লেখাটি তার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি।

প্রিয় পাঠক, আপনারা জানেন, আমাদের দেশে যে দলিত জনগোষ্ঠীর বাস, এদের সঠিক সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা হয়নি। এদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। কারও মতে, এদের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ। আবার কারও হিসাবে, এদের সংখ্যা ১৫ লাখের মতো। এরা সমাজে অত্যন্ত অবহেলিত ও নানাদিক থেকে সুবিধাবঞ্চিত। আর বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক আদিবাসী মানুষের বাস। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬টি জেলা, উত্তর-মধ্যাঞ্চলের ৯টি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চারটি জেলা এদের মূল বসবাসের এলাকা। এসব অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীদের মধ্যে রয়েছে সাঁওতাল, গারো, মুণ্ডা, ওঁরাও, মাহাতো, তুরি, পাহাড়িয়া, কোচ, মালপাহাড়িসহ আরও অনেকে।

বাংলাদেশে দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের এই বিরাট সংখ্যক নাগরিক অনেক রকম ন্যায্য সুযোগের অভাবে আর দশজনের থেকে পিছিয়ে রয়েছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান ইত্যাদি থেকে যেমন তারা পিছিয়ে আছেন, তেমনি পিছিয়ে আছেন মৌলিক মানবাধিকার থেকেও। সমাজে প্রচলিত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ, ভূমির অধিকারপ্রাপ্তি এবং রাষ্ট্রীয় সেবাগুলো থেকেও তারা বঞ্চিত থেকে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। এমনকি এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তাদের অত্যন্ত অমর্যাদাকর আচরণের মুখোমুখি করা হয়।

এই যে বঞ্চনা, পিছিয়ে রাখার মনোবৃত্তি - তা জাতি হিসেবে আমাদের অগ্রগতির গতিধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা যখন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এবং কাউকে পিছিয়ে রেখে নয়- এমন উন্নয়নের কথা বলছি, তখন এই মানুষগুলোর কথা বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে। সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে তাদের অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মানতে হবে। আগামী ২০৩০-এর মধ্যে যে ১৭টি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট নির্ধারণ করে আমরা এগোচ্ছি, তার অন্তত ৮টি অভীষ্ট (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৮, ১০, ১৬) অর্জন করা সম্ভব নয়, যদি না আমরা দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের মর্যাদাপূর্ণ উন্নয়নকে চিন্তায় রাখি। সংবিধানের ২৩ (ক) ধারায় দেশের জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী সম্পর্কে বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।' অর্থাৎ বাংলাদেশের সংবিধানের যে অঙ্গীকার- ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থান নির্বিশেষে সব মানুষ সমান, তার মূল সুরকে ধারণ করে যদি উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে প্রয়োজন এক নবতর উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি। আর তার সূচনা হতে পারে দলিত ও আদিবাসীদের মতো সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর নাগরিকদের জন্য বিশেষ উন্নয়ন ও নীতি-পরিকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার মধ্য দিয়ে।

সে রকম একটি উন্নয়ন দর্শন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ধারণা গ্রহণের দাবি নিয়ে সমতলের আদিবাসী ও দলিত নাগরিকদের জন্য সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা কিছু দাবি ও সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশা প্রস্তাব করছি। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে সমতলের আদিবাসী ও দলিত নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রয়োজনীয় নীতি-কাঠামোর দাবিতে একটি জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি হবে এবং তাদের অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন ও মানবাধিকার কিছুটা হলেও নিশ্চিত হবে।

১. টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমতলের আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের আদলে পৃথক মন্ত্রণালয় ও পৃথক মানবাধিকার কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। ২. সমতলের আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি হিসেবে একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা, যাতে বিদ্যমান ভূমি সমস্যা সমাধানে স্বল্প সময়ের মধ্যে ভূমি কমিশন তার কাজ শুরু করতে পারে। ৩. প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে সমতলের আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা ও যথাযথ উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। ৪. দলিত সম্প্রদায়ের সব মানুষ যে যেখানে আছেন, সেখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের জন্য স্থায়ী আবাসের ব্যবস্থা করা এবং মালিকানা তাদেরকে বুঝিয়ে দেওয়া। ৫. সমতলের আদিবাসী ও দলিত নাগরিক যারা নানা কারণে পিছিয়ে রয়েছেন, তাদের জন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সব ক্ষেত্রে বিশেষ কোটা সংরক্ষণ করতে হবে। ৬. সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রম এবং অন্য মৌলিক সেবাগুলোতে সমতলের আদিবাসী ও দলিত নাগরিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা, যাতে করে তারা কোনো বাধা ছাড়াই তাদের ন্যায্য পাওনা পেতে পারেন। ৭. সমতলের আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষায় অগ্রাধিকারভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা, যাতে করে সংশ্নিষ্ট জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে শিক্ষা সংক্রান্ত বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হয়। ৮. বাজেটে সমতলের আদিবাসী ও দলিত নাগরিকদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রেখে সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর উদ্যোগ ও তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

৯. অনতিবিলম্বে বর্ণবৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন, অনুমোদন ও তার বাস্তবায়ন করা জরুরি। ১০. একটি কার্যকর জাতীয় জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা। ১১. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাব থেকে উত্তরণ, টেকসই অভিযোজন সক্ষমতা তৈরি এবং আর্থিক সেবাগুলোতে সমতলের আদিবাসীদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণে বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নীতি-কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে।  ১২. দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি সময়-নির্দিষ্ট জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ১৩. আদিবাসী ও দলিত মানুষ সম্পর্কে বিদ্যমান ভুল ধারণা, ভুল উপস্থাপন এবং নেতিবাচক প্রচারণা বন্ধে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, বেতার এবং বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে ইতিবাচক অনুষ্ঠান প্রচার করা।

আমরা মনে করি, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর পৃথিবী যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাতে রাষ্ট্রকে কেবল ধর্মনিরপেক্ষ হলেই চলবে না, একে যুগপৎ জাতিনিরপেক্ষ, ভাষানিরপেক্ষ, লিঙ্গনিরপেক্ষ ও যৌনতানিরপেক্ষ হতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, শাসকগোষ্ঠী সংবিধানে এই সত্য মেনে নেবে যে, বাংলাদেশ একটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ এবং এর মধ্য দিয়ে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের পরিচয়, অধিকার ও সংস্কৃতিকে সংবিধানে স্থান দেবে; আর এভাবেই কেবল রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে সবার- ছোটদের বড়দের সকলের, গরিবের ফকিরের নিঃস্বের।

দলিত ও আদিবাসী নেতা, মানবাধিকার কর্মী জাতিসংঘ প্রতিনিধি, আইনজীবী, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান সদস্য, নাট্যজন, বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনের প্রতিনিধি, অ্যাকটিভিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক