'বাস্কেট কেসের' দুই প্রান্ত

সময়ের কথা

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০১৯      

অজয় দাশগুপ্ত

বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে তিন বছর দায়িত্ব পালন করেছেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। এখন যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রে, রাষ্ট্রদূত হিসেবে। শুক্রবার ঢাকার একটি রেস্তোরাঁয় তিনি প্রাতরাশ অনুষ্ঠানে মিলিত হন কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে। এ সময়েই তার কাছে জানতে চাই, বাংলাদেশে অবস্থানকালে তার কাছে সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ছিল কোনটি। আরেকটি বিষয়েও তাকে বলি- যে দেশটিতে তিনি দায়িত্ব পালন করে গেলেন, সেটি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে। আমরা পরাজিত করি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের। সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। তারা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র-অর্থ দিয়েছেন। তারা এটাও মনে করতেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ পরিণত হবে আন্তর্জাতিক বাস্কেট কেসে। ধনী দেশগুলোর সাহায্য ব্যতিরেকে দেশটি টিকে থাকতে পারবে না। ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংকের দু'জন শীর্ষ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞও বলেছিলেন, 'বাংলাদেশ হতে পারে উন্নয়নের টেস্ট কেস। যদি বাংলাদেশের উন্নতি ঘটে, তাহলে ধরে নিতে হবে বিশ্বের যে কোনো দেশেই তা করা সম্ভব।'

বিষয়টি অনেকটা এ রকম, যদি ওই ছেলে ম্যাট্রিক পাস করে, তাহলে স্কুলের চেয়ার-টেবিলও পাস করবে!

হর্ষবর্ধন শ্রিংলার কাছে জানতে চাই, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকের বর্ণিত 'বাস্কেট কেসটি' কেমন দেখে গেলেন? যাদের বাস্কেট কেস বা পরনির্ভর কিংবা আরও স্পষ্ট করে বলা যায় 'ভিখারির দেশ' বলা হয়েছিল, সেই দেশ থেকে আপনি যাচ্ছেন যারা এই বাস্কেট কেস হিসেবে বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করেছিল, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছিল- সেই দেশটিতে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশের তালিকার শীর্ষ পর্যায়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কোন বাংলাদেশকে আপনি তুলে ধরবেন?

নাশতার টেবিলে এমন গুরুগম্ভীর বিষয় উত্থাপন হয়তো শোভন নয়। তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি যেহেতু খোলামেলা মনে কথা বলছিলেন, তাই উত্তর পেতেও সমস্যা হয়নি। সর্বদা হাসিখুশি, উত্তরদানে চটপটে- এভাবেই তাকে গত তিন বছর আমরা দেখেছি। বাংলাদেশে অবস্থানকালে সবচেয়ে ভালো লেগেছে কোন বিষয়টি- এ প্রশ্নে তিনিও খানিকটা থেমে-থমকে গেলেন। একটু দম নিয়ে বললেন, এ তালিকা তো বেশ বড়। কোনটি রেখে কোনটি বলি! 'তবে বলতে পারি, খাবারের কথা, বিশেষ করে নদ-নদীর মাছ। বাংলাদেশের বড় সম্পদ বিপুলসংখ্যক নদ-নদী। তিন বছর বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনকালে ৬৪ জেলার মধ্যে অন্তত ৪৫টিতে গিয়েছি। সর্বত্রই সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। কোনটি রেখে কোনটি খাব, সেটা বাছাই করা সহজ ছিল না। ধর্ম-পেশা নির্বিশেষে কত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। কেউ বলেনি, ভারত বন্ধু দেশ নয়; বরং সবাই দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর কথা বলেছে।'

খাদ্যের পাশাপাশি শ্রিংলা বলেন সংস্কৃতির কথা। তিনি পহেলা বৈশাখ রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে মাঠে বসেই গান শুনেছেন। টানা পাঁচ দশকের বেশি একই স্থানে আয়োজিত হচ্ছে এ অনুষ্ঠান। শুরুর দিকে ছোট্ট পরিসরের অনুষ্ঠানটির ব্যাপ্তি এখন গোটা রাজধানী এবং প্রকৃতপক্ষে সমগ্র বাংলাদেশজুড়ে। পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রাও তাকে মুগ্ধ করে। তিনি অমর একুশে উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমি এবং আরও অনেক স্থানে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও শরিক হয়েছেন। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস পালনের জন্য বিভিন্ন সংগঠনের অনুষ্ঠান দেখেছেন। কয়েক বছর ধরে ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং কেন্দ্রীয় জাদুঘরে ভারতীয় হাইকমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ তিনি তোলেন। এসব অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ও ভারতের শিল্পীরা অংশ নিচ্ছেন। এ ধরনের অনুষ্ঠানে দুই দেশের শিল্পীরা দর্শকের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পান।

হাইকমিশনার ভিসার প্রসঙ্গেও কথা বলেন। তিনি জানান, ২০১৭ সালে প্রায় ১৩ লাখ বাংলাদেশিকে ভারতে যাওয়ার ভিসা দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় রয়েছে কয়েকটি অফিস, যেখান থেকে প্রতিদিন অনেককে ভিসা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের অনেক জেলা থেকেও ভিসার আবেদন জমা নেওয়া হয়। ঈদের সময় প্রথম যখন 'ভিসা ক্যাম্প' আয়োজন করা হয়েছিল- সে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, হাইকমিশনের জানা ছিল না যে কতজন আসবেন ফরম পূরণ করে। আবেদন কি অনেক পড়বে, নাকি গোটা আয়োজন অপ্রয়োজনীয় প্রমাণিত হবে- এমন শঙ্কা নিয়েই আমরা নির্দিষ্ট স্থানে জমায়েত হই। দেখা গেল, আবেদন করেছেন কয়েক হাজার। কিন্তু বড় কোনো সমস্যায় না পড়েই প্রত্যেককে ভিসা প্রদান করা সম্ভব হয়। তিনি বলেন, এখন ভিসা নিয়ে হয়রানির কোনো অভিযোগ শোনা যায় না। মুক্তিযোদ্ধা ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সীরা পাঁচ বছরের মাল্টিপল ভিসা পেয়ে যান। ভারতে যেসব ছাত্রছাত্রী পড়তে যায়, তাদের এক বছরের ভিসা প্রদান করা হতো। এর অর্থ হচ্ছে, প্রতিবছর তাদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আসতে হতো। আমরা যে শিক্ষার্থী যে কোর্সে পড়তে যাবে, তার মেয়াদ অনুযায়ী ভিসা প্রদানের ব্যবস্থা করেছি।

ভিসা পদ্ধতি সহজ করা, বাংলাদেশি খাবার কিংবা সংস্কৃতি- এসবের বাইরেও বিশেষ আনন্দের মুহূর্ত যে তার রয়েছে, সেটা জানা গেল কথার ফাঁকে ফাঁকে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন দুই দেশের সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের প্রসঙ্গ। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এ চুক্তি সই করেন। কিন্তু ভারতের পার্লামেন্টে তার অনুমোদন আটকে ছিল। ২০১৫ সালের মে মাসে ভারতের পার্লামেন্ট সর্বসম্মতভাবে এ চুক্তি অনুমোদন করলে পরের মাসেই ছিটমহল বিনিময়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে যে ভূখণ্ড লাভ করে, বাংলাদেশ থেকে ভারত পায় তার তুলনায় কিছুটা কম। ভারতের আয়তন ও লোকসংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। অর্থনৈতিক-সামরিক ক্ষমতায়ও পার্থক্য বিস্তর। সে দেশের স্থল, বিমান ও নৌবাহিনীর অফিসার ও সৈন্যরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর পাশে থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছেন। অনেকে আত্মাহুতি দিয়েছেন। আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখি, সেই দেশটিই বাংলাদেশের সঙ্গে যে স্থলসীমানা চূড়ান্ত করার চুক্তি সম্পাদন করেছে, তা সাদা চোখে বাংলাদেশের তুলনামূলক বেশি অনুকূলে। আমার মনে আছে, চুক্তির দলিল হস্তান্তর উপলক্ষে ঢাকা সফরে এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, 'এই যে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি; তা কি শুধু জমি-সংক্রান্ত বিবাদের সমাধান? যদি কেউ এটা মনে করেন, দু-চার কিলোমিটার জমি এদিকে গিয়েছে- এটা কিন্তু সেই সমঝোতা নয়। এটা সেই চুক্তি, যা মনকে যুক্ত করেছে। পৃথিবীতে সব যুদ্ধই হয়েছে জমির জন্য। আপনাদের পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, আমরা বৌদ্ধ সার্কিট শুরু করতে চাই পর্যটনের জন্য। বৌদ্ধ ছাড়া ভারতও অসম্পূর্ণ। যেখানে বুদ্ধ রয়েছেন, সেখানে যুদ্ধ হতে পারে না। আর এ জন্য সারাবিশ্ব জমির জন্য লড়তে পারে, মরতে পারে। কিন্তু আমরা দুটি দেশ, যারা এ জমিকেই আমাদের বন্ধুত্বের সেতুবন্ধ হিসেবে দাঁড় করিয়েছি। আমি এখানে আজকের একটি খবরের কাগজে দেখেছি- বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তিকে বার্লিনের দেয়াল ভাঙার ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছে। এটা খুব বড়মাপের চিন্তাধারা। এ ঘটনা পৃথিবীর অন্য কোথাও হলে অনেক আলোচনা হতো। হয়তো নোবেল পুরস্কার দেওয়ার জন্য রাস্তা তৈরি হতো। আমাদের কেউ জিজ্ঞেস করবে না; কারণ আমরা দরিদ্র দেশের মানুষ। কিন্তু গরিব হওয়া সত্ত্বেও যদি আমরা একজোট হয়ে চলি, তাহলে দুনিয়া স্বীকার করুক আর না করুক, দুনিয়াকে মানতে হবে যে, এ লোকেরাই নিজেদের শক্তির ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলেছে বিকাশের পথে।'

সেদিন নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য শুনতে শুনতে মনে হয়েছিল, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী (বাংলাদেশের শেখ হাসিনা ও ভারতের নরেন্দ্র মোদি) যে প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন, দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেভাবে সীমান্ত সমস্যার সমাধান করেছে শান্তিপূর্ণ পন্থায়, তার প্রতি কি উন্নত বিশ্ব যথাযথ নজর ও গুরুত্ব দিয়েছে? নরেন্দ্র মোদি নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রসঙ্গও টেনেছিলেন। তার কথায় কি ক্ষোভ ও হতাশা ছিল না?

হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এ চুক্তির খুঁটিনাটি প্রণয়নের কাজে যুক্ত ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে এ বিষয়টিকে বিশেষ মুহূর্ত হিসেবেই তিনি উল্লেখ করেছেন।

ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তি হয়েছিল আরও এক বছর আগে, ২০১৪ সালের জুলাই মাসে। এ-সংক্রান্ত রায় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ভারতের দ্য টেলিগ্রাফ। তারা বলেছিল, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশকে পশ্চিমবঙ্গের আয়তনের চেয়েও বেশি সমুদ্র এলাকা দিয়েছে। ভারত সরকার তাৎক্ষণিক এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছিল। রায় প্রসঙ্গে টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন ছিল এভাবে :New Delhi, July 8: India has lost to Bangladesh a swathe of sea larger than the area of Bengal in a landmark ruling by a UN tribunal after decades of tug-of-war rooted in the Partition of 1947.
The UN’s Permanent Court of Arbitration has awarded Bangladesh 106,613sqkm of a total of 172, 220sqkm that according to New Delhi was under dispute but should belong to India.

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের জুন মাসে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কয়েক মাসের মধ্যে তিনি গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করে ফেলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যারও সমাধান হয় আলোচনার মাধ্যমে। একই সঙ্গে তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের স্থায়ী নিষ্পত্তির প্রতি মনোযোগী হন- বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলার জন্য ব্যবহার করতে না দেওয়া।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে, বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর জোট ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে ফের ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের মদদদান শুরু করে। দেশ-বিদেশের অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, খালেদা জিয়ার এ নীতির পেছনে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রত্যক্ষ উস্কানি ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য দায়ী এ দেশটির নেতৃত্ব যে কোনো মূল্যে ভারতের ক্ষতি করার নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে অস্থিতিশীল করার মনোভাব সর্বদাই তাদের রয়েছে। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাসায়নিক সার কারখানার জেটিতে বিদেশ থেকে জাহাজে গোপনে আনা যে ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়েছিল, তা পাঠানো হতো ভারতের আসামের সন্ত্রাসীদের কাছে- এটা এখন সবার জানা।

শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ফের ক্ষমতায় এসে এ ধরনের অপতৎপরতা বন্ধ করে দেন। এর সুফলও মিলছে। ভারতের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী মহল, সংস্কৃতিসেবীসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিরা বারবার এ জন্য শেখ হাসিনার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তারা দুই দেশের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টনসহ এখনও যেসব সমস্যা রয়ে গেছে, তার নিষ্পত্তির তাগিদ দিয়ে এটা বলতে ভোলেন না- বাংলাদেশের স্বার্থকে বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ, বাংলাদেশ ভারতের একটি বড় সমস্যার সমাধানে অবদান রেখেছে।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বহু বছর ধরে আমরা দেখছি, নির্বাচনী প্রচারে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা ভারতকে বাংলাদেশের দুশমন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এবারে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। হর্ষবর্ধন শ্রিংলাও আমাদের সঙ্গে আলোচনায় এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ তার নিজস্ব এজেন্ডায় ফিরতে পেরেছে। উন্নয়নের ইস্যু সামনে এসেছে। তারা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বিষয়গুলোর ওপর জোর দিয়েছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর উন্নয়নে এ দেশের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে, তার ওপর কোনো শুল্ক্ক দিতে হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে ভারত যেসব পণ্য রফতানি করে, তার ওপর শুল্ক্ক আরোপ করা হয়। এ ধরনের নীতির কারণেই ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি বাড়ছে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভারতের বিনিয়োগ বাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এখানে উৎপাদিত পণ্য ভারতে রফতানি হবে। আবার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে পারেন। এ বিদ্যুতের একটি অংশ বাংলাদেশ তার নিজস্ব প্রয়োজনে ব্যবহার করার পর যা বাড়তি থাকবে, সেটা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রফতানি করতে পারে। এভাবেও বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, ভারত থেকে বাংলাদেশ যেসব মেশিন-কাঁচামাল আমদানি করে, তা এখানে নিজস্ব শিল্পপণ্য উৎপাদনে ব্যবহার হয়। এর ফলে কর্মসংস্থান বাড়ছে। রফতানি বাড়ছে। তিনি বিশেষভাবে সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন, যাতে কেউ ভুল তথ্য পরিবেশন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে না পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয়রা প্রতিবছর 'শত শত কোটি ডলার ভারতে নিয়ে যাচ্ছে' বলে প্রচারিত খবরের কথা উল্লেখ করে বলেন, এর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।

হর্ষবর্ধন শ্রিংলা তার নতুন কর্মস্থল যুক্তরাষ্ট্রে কোন বাংলাদেশকে তুলে ধরবেন- এ প্রশ্নে বলেন, এ দেশ যে মোটেই 'বাস্কেট কেস' নয়, সেটা তো এখন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বিশ্বসমাজ বলছে। বাংলাদেশ দ্রুত উন্নতি লাভ করছে। সেটা বিশ্বসমাজের নজর এড়াতে পারছে না। একসময়ে উন্নত বিশ্বগুলো ভারতের পরিচয় দিতে গিয়ে হাতির পাল, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, পুরনো রাজপ্রাসাদ, মন্দির- এসবের ছবি দিত। এখন তারা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কথা বলে। স্বর্ণালঙ্কার রফতানির কথা বলে। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানকালে এখানের ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো দেখেছি। দ্রুত উন্নতি লাভ করছে বাংলাদেশ। শিক্ষার প্রসার ঘটছে। ক্রিকেটে বড় শক্তি হয়ে উঠছে। এসব কারণে ভারতেরও সুবিধা। প্রকৃতপক্ষে দুটি দেশ এখন এমন অবস্থানে রয়েছে, যারা একে অপরের উন্নয়নে সহায়তা প্রদানের ক্ষমতা অর্জন করেছে। এই নতুন বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তর সক্রিয় রয়েছে। আপনারা নিজেরাই এখন নিজেদের তুলে ধরার অবস্থানে রয়েছেন। ওয়াশিংটনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ ক্ষেত্রে আমার ভূমিকা রাখার সুযোগ যদি আসে, নিশ্চয়ই সেটা কাজে লাগাব।

তার এ অঙ্গীকার সফল হোক- এটাই প্রত্যাশা।

সাংবাদিক
ajoydg@gmail.com