জনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকা

অন্যদৃষ্টি

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

আফতাব চৌধুরী

ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকের খবর- জাতিসংঘের তথ্য মতে, বিশ্বের সবচেয়ে জনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকা। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে প্রতি বর্গমাইলে ৪৪ হাজার ৫০০ লোকের বসবাস। প্রতি বর্গমাইলে এত লোকের বসবাস পৃথিবীর আর কোনো দেশে নেই। ইউএন হেবিট্যাট আরবান ডাটা শিরোনামে জাতিসংঘের ৭৪১টি শহরের তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ যেসব শহর রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই এশিয়ায়। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস, গ্রিসের রাজধানী এথেন্স ও স্পেনের বার্সেলোনা। উত্তর আমেরিকার শহরগুলোর মধ্যে নিউইয়র্ক সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর। তালিকায় হংকং, মালদ্বীপের রাজধানী মালেসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরের উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির এ চাপ কী ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি করছে, তা ব্যাখ্যা করা নিষ্প্রয়োজন। যে কোনো দিকে তাকালেই এ সমস্যার বহু বিস্তৃত চিত্র চোখে পড়ে।

খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক প্রয়োজন যেমন আছে, তেমনি আছে জীবনমান উন্নয়নের সংকট। রাজপথের দিকে তাকালে এ বহুধা বিস্তৃত সমস্যার সবচেয়ে বাস্তব ও জীবন্ত ছবি আমাদের চোখে পড়ে। উন্নয়নশীল দরিদ্র দেশগুলোর বড় বড় শহরের এ রাজপথগুলোই হচ্ছে এসব দেশের সামগ্রিক জীবনচিত্রের অনুপুঙ্খ বিবরণ সংবলিত পোস্টার। রাজপথেই গড়ে উঠছে ভাসমান মানুষের অস্থায়ী বাসস্থান, গড়ে উঠেছে বস্তি। এসবই ঢাকার মতো এসব অঞ্চলের বড় শহরগুলোর প্রাত্যহিক জীবনচিত্র। উপচেপড়া জনসংখ্যার ভারে পিষ্ট ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলো একদিন জনস্রোতের অনিঃশেষ ধারায় আরও বিপন্ন, বিপর্যস্ত ও বিবর্ণ হয়ে পড়বে। দেখা দেবে নগরজীবনের আরও নানা গুরুতর সংকট, মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলবে না। বস্তিতে ছেয়ে যাবে শহরের প্রতি এলাকা, বাড়বে আরও ভিড়, আরও অভাব। অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের পণ্ডিতরা এ বিপুল জনসংখ্যাই দারিদ্র্য ও দুর্দশার অন্যতম প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তারা একবাক্যে এও বলেছেন, যদি এভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে এ দরিদ্র দেশগুলোতে আরও বিপুল পরিমাণ খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেবে। দেখা দেবে আরও কর্মসংস্থানের অভাব, বেকারত্ব এবং দেশের বড় শহরগুলোতে উপচেপড়া সংখ্যাতীত মানুষের ভিড় বাড়বে। জনসংখ্যা রোধের উদ্যোগ ও প্রয়াস সত্ত্বেও এভাবেই আমাদের মতো দরিদ্র দেশগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত আছে।

এ ক্ষেত্রে সাফল্য বা অগ্রগতিও কি কিছুই নেই? না, তা নয়। সাফল্য আছে, অগ্রগতিও আছে; কোনো বছর এশিয়ায় বা কোনো বছর আফ্রিকায় বেশ সাফল্যেরও খবর শোনা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমস্যার যথার্থ কোনো সমাধান হয় না। সমাজে দারিদ্র্য ও অশিক্ষা অব্যাহত রেখে পরিকল্পিত পরিবারের মতো একটি উন্নত চিন্তার বাস্তবায়ন কতখানি সম্ভব হবে, সেটাই বোধ করি ভেবে দেখার মতো বিষয়। তাই বিত্তবান, শিক্ষিত নাগরিক ও মধ্যবিত্তের মধ্যে পরিকল্পিত পরিবার বা কম সন্তানের ধারণা যেমন ক্রমেই প্রবল হয়ে উঠছে এবং সমাজের এ অংশে দেখা যাচ্ছে কম সন্তানের বাস্তবতা; তেমনি শিক্ষা ও উপযুক্ত চেতনার অভাবে সমাজের পিছিয়ে থাকা অংশে যারা দরিদ্র, বিত্তহীন ও শিক্ষাবঞ্চিত, তাদের মধ্যে অধিক সন্তানের সনাতন চিন্তার বিশেষ কোনো পরিবর্তন ঘটছে বলে মনে হয় না। সমাজের যে অংশে যত গরিব, সে অংশেই অধিক সন্তান তথা জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা তত বেশি। উন্নত সমাজেই এ চেতনা অধিক ফলপ্রসূ ও কার্যকর। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন। এ চেতনা ও উপলব্ধি যত বিস্তৃত হবে, ততই এ সমস্যা সমাধানের পথ বেরিয়ে আসবে।

পরিবেশ গবেষক