ভেনিজুয়েলা কি সিরিয়া হচ্ছে

আন্তর্জাতিক

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

ফরিদুল আলম

আন্তর্জাতিক রাজনীতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ভেনিজুয়েলাকে কেন্দ্র করে। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে পশ্চিমা অবরোধ কঠোরতর হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এবার উঠেপড়ে লেগেছে নিকোলাস মাদুরোর বামপন্থি সরকারকে উৎখাত করে তাদের আশীর্বাদপুষ্ট বিরোধীদলীয় নেতা হুয়ান গুইদোকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসাতে। ভেনিজুয়েলার স্বঘোষিত অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হুয়ান গুইদোকে সমর্থন জানিয়েছে লাতিন আমেরিকা ও কানাডার জোট লিমা গ্রুপ। ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনীর প্রতি গুইদোকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জোটটি। ১৪ সদস্যবিশিষ্ট লিমা গ্রুপের ১১টি সদস্য দেশ শক্তি প্রয়োগ ছাড়া ক্ষমতা পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে মানবিক সহায়তার আহ্বানও জানিয়েছে জোটটি। এই লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছে, যার প্রতি সমর্থন রয়েছে ইউরোপীয় শক্তিগুলোরও। এহেন পরিস্থিতিতে রাশিয়া ও চীন পাল্টা হুঁশিয়ারিতে অশুভ পরিণতির বার্তা দিয়েছে। ব্যাপক অনিশ্চয়তার আশঙ্কা এবং খাদ্য ও ওষুধসহ প্রতিদিনের মৌলিক চাহিদা পূরণে ইতিমধ্যে হাজার হাজার নাগরিক দেশ ত্যাগ করে অন্য দেশে শরণার্থী জীবনযাপন করছে এবং এখনও ছুটছে। ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ লাখ অধিবাসী দেশ ছেড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এহেন পাল্টাপাল্টি অবস্থান, সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তথা দেশের বিরাজমান অস্থিরতা নিরসনে নিকোলাস মাদুরো আগাম সংসদ নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন। মাদুরোর আহ্বান প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং পশ্চিমা শাসকচক্র মাদুরোর শাসন অবসানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পরিস্থিতি যখন এতটাই শোচনীয়, এই অবস্থায় আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কী হবে, তা অনুমান করা দুরূহ।

২০১৩ সালে দেশটির তুলনামূলক জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর সেই সময়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তাকে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে চলতে হচ্ছে। তেল ও হীরক সমৃদ্ধ দেশটির তেল বাণিজ্যের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি যখন টালমাটাল, এমন অবস্থায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের দুর্নীতি, আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, অকল্পনীয় মুদ্রাস্টম্ফীতি ও প্রধান বিরোধী দল কর্তৃক সরকার উৎখাতে পশ্চিমা সমর্থন মোকাবেলায় প্রেসিডেন্ট মাদুরো কতটুকু সক্ষম, সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। হুগো শাভেজ ২০০৯ থেকে ২০১৩ সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে শুধু ভেনিজুয়েলা নয়, গোটা দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর প্রভাব হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন, যা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। শাভেজ দায়িত্ব পালনকালে তার উত্তরসূরি হিসেবে অসমাপ্ত কর্ম সম্পাদনে মাদুরোকে বেছে নিলেও নেতৃত্ব গুণ এবং দক্ষতায় মাদুরো কোনো অবস্থায় শাভেজের ধারে-কাছে যেতে পারেননি। প্রশ্ন হচ্ছে, হুগো শাভেজের ব্যক্তিত্বের বিপরীতে কেন মাদুরোর এই বিপরীতমুখী ভাবমূর্তি? এখানে বিগত বছরগুলোতে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হচ্ছে, শাভেজের ভাবমূর্তির ওপর মাদুরো সরকার দাঁড়িয়ে থাকলেও আদর্শিকভাবে মাদুরো শাভেজের মতো জনসমর্থন ধরে রাখতে পারেননি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতেও শাভেজের মতো পশ্চিমা সরকারের বিরুদ্ধে গঠনমূলক কোনো আশাবাদের ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। সবকিছুকে ছাপিয়ে সর্বস্তরে দুর্নীতি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেওয়া এবং ক্ষমতা হারানোর শঙ্কায় ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে বিতর্কিতভাবে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা আজ গোটা দেশকেই বিশৃঙ্খলার চরমে নিয়ে গেছে। এই সংকটকালে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধাচরণের অর্থ এই নয় যে, তারা মাদুরোর সপক্ষে অবস্থান নিয়েছে, বরং এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাব বিস্তারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাকে তারা বাস্তবায়ন করতে দিতে চায় না।

ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা জোট এবং লিমা গ্রুপের বর্তমান অবস্থান পর্যালোচনা করলে আমরা আশ্চর্যজনকভাবে এর সঙ্গে সিরিয়া সংকটের একটা যোগসূত্র দেখতে পাই। ২০১১ সাল থেকে তথাকথিত আরব বসন্তের জেরে সেখানে আসাদ সরকারকে হটাতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট সফলতার মুখ দেখেনি মূলত ইরান, রাশিয়া ও চীনের বিরোধিতার কারণে। আসাদকে সরিয়ে মার্কিন জোট মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও রাশিয়ার প্রভাব খাটো করতে চেয়েছিল। এদিকে তুরস্কের লক্ষ্য ছিল সাবেক এই অটোমান সাম্রাজ্যভুক্ত এলাকায় তাদের চিরশত্রু কুর্দিদের দমন করা, সৌদি ও ইসরাইলের লক্ষ্য ছিল, ইরানের প্রভাব কমানো এবং কাতার চেয়েছিল, সেখানে শিয়া শাসনের পরিবর্তে তাদের ধারার ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে। এভাবে সিরিয়া থেকে আসাদ সরকারকে হটানোর বিষয়ে মতৈক্য থাকলেও মিত্রদের মধ্যকার উদ্দেশ্যের অমিল থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সিরিয়া অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। তবে এর দীর্ঘকালীন বহুমাত্রিক নেতিবাচক পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে সিরিয়া তথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে, যার অন্যতম হচ্ছে শরণার্থী সংকট, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ সৃষ্টি করে এবং অভিবাসনবিরোধী ব্যাপক জনমত তাদের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে, সেখানে তাদের চিরশত্রু চীন ও রাশিয়ার প্রভাব কমিয়ে দেশটির সম্ভাবনাময় তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী কিছু ডানপন্থি সরকার এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়ে এলেও সার্বিক অর্থে মাদুরোর টিকে থাকা অথবা না থাকার চেয়েও মুখ্য বিষয় হচ্ছে, গোটা অঞ্চলে ডানপন্থি বনাম বামপন্থি রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যকার একটি বিরোধ যদি প্রকাশ্যে ধারণ করে, তবে এর পরিণতি শুধু ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়বে গোটা বিশ্বে। কিছুটা এর নজিরও আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়ে মাদুরো সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার প্রয়াসের মধ্য দিয়ে। তেলের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে শুধু ভেনিজুয়েলার সরকার বা সাধারণ মানুষের জীবনযাপন নয়, গোটা বিশ্বেই এর প্রভাব রয়েছে। এহেন অবস্থায় চীন ও রাশিয়া ভেনিজুয়েলার স্বঘোষিত প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন দান এবং মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে হটাতে যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, চীন ও রাশিয়ার হুমকি থেকে অনুমান করা যায়, এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা শুধু ভেনিজুয়েলা নয়, ছড়িয়ে পড়বে গোটা দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে, যা মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মতো আরেক দীর্ঘকালীন সংকটের জন্ম দেবে।

সত্যিকার অর্থে কী ঘটতে যাচ্ছে ভেনিজুয়েলায়, তা এই মুহূর্তে স্পষ্ট নয়। তবে রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটুকু অন্তত বোঝা যায়, সত্যিকার অর্থে জনগণের মুক্তি বেশ দুরূহ। লাতিন আমেরিকার মুক্তির দূত হিসেবে পরিচিত সিমন বলিভার ১৮২১ সালে স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভেনিজুয়েলাসহ কলম্বিয়া, বলিভিয়া, ইকুয়েডর ও পেরুর স্বাধীনতা এনে দিয়ে পরে এর সবক'টিতেই কর্তৃত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। পঞ্চাশের দশকে রোমলো গালেগস প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হলেও ক্ষমতাচ্যুত হন মার্কোস পেরেজ কর্তৃক। এভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সেখানে মার্কিন সেনা পাঠাবেন বলে যে হুমকি দিয়েছেন, তা যদি শুধু হুমকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে ভালো। এখানে যে কোনোভাবে জোরপূর্বক মাদুরোকে টেনে নামানোর বিষয়টি স্পর্শকাতর হবে। আবার মাদুরোর বিষয়ে যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি ইতিমধ্যে দেশটিতে সৃষ্টি হয়েছে, এই অবস্থায় যদি নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে নিশ্চিতভাবে বামপন্থি সরকারের বিপর্যয় ঘটবে, যা প্রত্যাশিতভাবেই পশ্চিমা গোষ্ঠীর জন্য স্বস্তিদায়ক হবে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বোঝা যাচ্ছে, দেশটির চীন ও রাশিয়াপন্থি প্রভাব বেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাই চাইবেন বিকল্প নেতৃত্ব খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত মাদুরোর ওপর ভরসা রাখতে। তবে এই সংকটকালে এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট মাদুরোর সবচেয়ে বড় ভরসা দেশটির সেনাবাহিনী। সরকারের প্রতি সেনাবাহিনীর এই আনুগত্যের ভিতও রচনা করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট শাভেজ। সংবিধান অনুসারে রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিষিদ্ধ হলেও শাভেজের শাসনামলে তাদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করা হতে থাকে। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট মাদুরো সরকারের মন্ত্রিসভায়ও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সেনাবাহিনীর সাবেক বা বর্তমান কর্মকর্তা রয়েছেন। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট সেনা তথা প্রতিরক্ষা বাহিনীকে মাদুরোর প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন পর্যন্ত মাদুরো সেনাবাহিনীতে তার আনুগত্য ধরে রাখলেও বাহিনীর অভ্যন্তরে রয়েছে চাপা অসন্তোষ। গত কয়েক বছর ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টার অভিযোগে অনেককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং বেশ কিছু কর্মকর্তা পালিয়ে গিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এখন তাদের গতিপ্রকৃতির ওপরেই নির্ভর করছে ভেনিজুয়েলার সার্বিক পরিস্থিতি।

সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]