বইমেলা মিলন মেলা

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

ড. কানন পুরকায়স্থ

দার্শনিক এ সি গ্রেইলিং তার 'The Meaning of Things' গ্রন্থে উল্লেখ করেন, কোনো কোনো ডাক্তার বিষাদগ্রস্ত, উদ্বিগ্ন বা মানসিক চাপে আছে এমন রোগীকে ওষুধের পরিবর্তে বই পড়ার পরামর্শ দেন এবং তাদেরকে বই সম্বন্ধীয় চিকিৎসকের (Biblio therapist) কাছে পাঠান। রোগীর মধ্যে বইমনস্কতা বাড়ানোর মাধ্যমে রোগ নিরাময় করার পদ্ধতি ইউরোপে এখন চালু হয়েছে। দার্শনিক এলেন ডি বটন বইকে 'একাকিত্ব নিরাময়কারী' হিসেবে চিহ্নিত করেন। একটি বই কী করতে পারবে বলে মনে করে, তা আমরা পর্তুগালের লেখক হোসে জর্জ লেটেরিয়ার কবিতা 'If I were a Book' থেকে জানতে পারি। লেটেরিয়া লিখেছেন- 'আমি যদি বই হতাম, তাহলে অনেক গভীর গোপন বিষয় পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতাম;/ আমি যদি বই হতাম, তাহলে আমি জ্ঞান দিয়ে সহিংসতাকে প্রতিহত করতাম;/ আমি যদি বই হতাম, তাহলে আমি শব্দের শহরে এক গগনচুম্বী ইমারত হতাম;/ আমি যদি বই হতাম, তাহলে আমি অজ্ঞতাকে দূর করতাম;/ আমি যদি বই হতাম, তাহলে আমি শুনতে ভালোবাসতাম;/কেউ একজন বলছে এই বই আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে।' বইয়ের উল্লিখিত স্বগত উক্তির পাশাপাশি আমরা লক্ষ্য করি, কীভাবে বই একজন সমরনায়ককে অনুপ্রাণিত করে। বই কেমন করে এলো? যতদূর জানা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে দক্ষিণ ইরাকে প্রাচীন লেখার শুরু। প্রত্নতত্ত্ববিদরা কচ্ছপের শেলে চীনা ভাষায় লেখা দেখতে পান। ইতিহাসবিদরা সাপের চামড়ায় হোমারের ওডিসি ও ইলিয়াড লেখা বই পেয়েছেন। প্রাচীন রোমানরা গাছের ছালে লিখতেন, যাকে বলা হতো 'liber'। এই শব্দ থেকেই আমরা পাই 'libre', 'libro' এবং 'library' শব্দ। প্রাচীন গ্রিকরা পশুর চামড়ায় এবং মিসরীয়রা প্যাপিরাস নামক পাতায় লিখত। চীনাদের আবিস্কার কাগজ। ১৪৫০ সালে য়োহান গুটেনবার্গ জার্মানিতে ছাপাখানা তৈরি করে বইয়ের প্রকাশকে সহজতর করেন। সেই সময় হাত দিয়ে বই লেখা হতো। কিন্তু গুটেনবার্গের আবিস্কারের ফলে হাত দিয়ে বই লিখে প্রকাশ করার প্রচলন উঠে গেল। কিন্তু এর প্রতিবাদে অনেক বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফ্লোরেন্সের এক বিখ্যাত বই বিক্রেতা মনে করেন, গুটেনবার্গের ছাপাখানার ফলে বই শিল্পের মৃত্যু ঘটেছে। বই বাণিজ্যের পথ মসৃণ নয়। এর মধ্যে রয়েছে অনিশ্চয়তা এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার আশঙ্কা। বই নিষিদ্ধ হওয়ার উদাহরণ অনেক আছে। যেমন ১৯৩১ সালে লুইস ব্যারোলের 'এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড' গ্রন্থটি জেনারেল হো চি মিন চীনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। কারণ তিনি মনে করেন, একটি প্রাণীকে মানুষের মতো কথা বলার মাধ্যমে এই গ্রন্থে মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। শেকসপিয়র অ্যান্ড কোম্পানিকে নিয়ে আরও অনেক গল্প শোনা যায়। যেমন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, নাৎসি বাহিনীর কাছে কোনো বই বিক্রি করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর এক সৈন্য জেমস জয়েসের 'ফিনেগান উইক' বইটি কিনতে এসেছিল। সিলভিয়া বই বিক্রি করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। সৈন্যটি তখন বলে, সে তার সেনাবাহিনীকে নিয়ে আসবে আবার বইটি নিতে। সিলভিয়া তখন তার বন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে দোকান থেকে সমস্ত বই সরিয়ে ফেলেন এবং দোকান বন্ধ করে দেন। এ রকম একজন বইয়ের ব্যবসায়ী প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে। বই চুরি একটি শাশ্বত বিষয়। এটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। প্যারিস বা লন্ডনে কোনো কোনো বইয়ের দোকানে বই চুরির বিষয়ে সতর্কবাণী প্রকাশ করা হয়। যেমন প্যারিসের একটি বইয়ের দোকানে যা লেখা আছে, তা বাংলায় এই রূপ- 'আমার বন্ধু এই বইটিকে চুরি করো না,/এই বইয়ের দিকে এগিয়ে গেলে দেখবে/ফাঁসির দড়ি তোমার অপেক্ষায় আছে।/এই দড়ি তোমাকে শ্বাসরুদ্ধ করে ঝুলিয়ে রাখবে।/ আমি তখন তোমার কাছে জানতে চাইবো যে বইটি/তুমি চুরি করেছ, সেটি কোথায়?' অবশ্য নিরাপত্তা ক্যামেরা চালু হওয়ার কারণে এ রকম সতর্কবাণী দেখা যায় না। পৃথিবীর অর্ধশত দেশের শতাধিক বিখ্যাত বইয়ের দোকান ঘুরে দেখেছি, বই কীভাবে একটি জাতির সঙ্গে আরেক জাতির, এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের এবং একজন লেখকের সঙ্গে আরেকজন লেখক বা পাঠকের মিলনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বইয়ের দোকান ও বইয়ের লাইব্রেরি দুটি ভিন্ন সত্তা। লাইব্রেরি সংরক্ষণ করে, বইয়ের দোকান বিতরণ করে। লাইব্রেরি পৃষ্ঠপোষকতা পায়; কিন্তু বইয়ের দোকান ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপিত। বইয়ের মেলার চরিত্র একটি স্বতন্ত্র বইয়ের দোকান থেকে ভিন্ন। বইয়ের মেলা পাঠক, লেখক, প্রকাশক, বিক্রেতা ও সরবরাহকারীর মিলন মেলা। কোনো কোনো বইমেলায়, যেমন লন্ডনের বইমেলায় বইয়ের ছাপা, মুদ্রণ, প্রচ্ছদ ইত্যাদি প্রযুক্তিগত দিকের মেলাও বসে। সর্বোপরি, বই পড়া আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে এবং বই লেখা  আমার জীবনকে বাঁচিয়েছে। একজন বিক্রেতা পাঠক ও প্রকাশকের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি  করেন। আর একটি বইমেলা হতে পারে এসবেরই মিলন মেলা।

অধ্যাপক ও পরিবেশবিজ্ঞানী, যুক্তরাজ্য